আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসানীতি পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার লেবার সরকার। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আসা প্রকৃত ও যোগ্য শিক্ষার্থীরা যাতে কঠোর শর্তের কারণে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে না যান, সে লক্ষ্যে আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের নিয়ম পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কায় এ উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা বিভাগ। নতুন নির্দেশিকায় ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি অর্থের উৎস, স্পনসরের আয় ও পড়াশোনার ব্যয় বহনের সামর্থ্য যাচাইয়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে ভিসা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্য আবেদনকারীদের জন্য অনুমোদনের নিশ্চয়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার সিডনিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের এক সম্মেলনে এসব সংস্কার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল। তিনি বলেন, ভিসা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে আর্থিক যোগ্যতার মানদণ্ড বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও সরকারের লক্ষ্য কেবল আবেদন কমানো নয়, বরং যোগ্য শিক্ষার্থীদের ভিসা অনুমোদনের হার বাড়ানো।
মন্ত্রী আরও বলেন, এমনকি এর ফলে যদি আর্থিক মানদণ্ড উন্নত করতে হয় এবং সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমেও যায়, তবুও আমি চাই ভিসা অনুমোদনের হার বাড়ুক এবং সবার জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরও নিশ্চিত ও পূর্বানুমানযোগ্য হোক। অর্থাৎ, আর্থিক শর্ত কঠোর হলেও প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে চায় সরকার। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবেদনকারীদের প্রস্তুতি ও কাগজপত্রের ধরনেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
ব্যাংকে টাকা থাকলেই আর নয়
প্রস্তাবিত সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক আর্থিক সক্ষমতা যাচাই। শুধু ব্যাংক হিসাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা থাকার প্রমাণ নয়, সেই অর্থের উৎস, মালিকানা, প্রাপ্যতা ও ধারাবাহিকতা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আসতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীর বাবা-মা কিংবা অন্য কোনো স্বজন স্পনসর হলে তাদের আয়ের উৎস, শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং অর্থের প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। ব্যাংক লেনদেনের ইতিহাসের মাধ্যমে অর্থের স্থায়িত্ব ও বৈধতা যাচাইয়ের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের আদলে একটি ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে অস্ট্রেলিয়া। ওই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের অর্থ নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় জমা রেখে আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে পারেন। তবে অস্ট্রেলিয়ায় এমন পদ্ধতি চালু হলে তা দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হবে বলে জানিয়েছেন হিল। এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বদলাতে পারে এমডি ১০৬
শিক্ষার্থীর প্রকৃত পড়াশোনার উদ্দেশ্য যাচাইয়ে বর্তমানে কার্যকর রয়েছে মন্ত্রিপর্যায়ের নির্দেশনা ১০৬। এর আওতায় আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, নির্বাচিত কোর্সের যৌক্তিকতা, পূর্ববর্তী পড়াশোনার সঙ্গে নতুন বিষয়ের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনা করা হয়। সরকারি পর্যালোচনায় এই নির্দেশনার পরিবর্তে নতুন মিনিস্টেরিয়াল ডিরেকশন প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র বিভাগ ও শিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে এ বিষয়ে কাজ করছে। নতুন কাঠামোয় প্রকৃত শিক্ষার্থী মূল্যায়ন আরও স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এমডি ১০৬ এখনো বাতিল হয়নি। নতুন নির্দেশনাও কার্যকর হয়নি। ফলে প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে বর্তমান ভিসা বিধির অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রত্যাখ্যানের চাপে দক্ষিণ এশিয়া
দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হার অস্ট্রেলিয়া সরকারের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অফশোর স্টুডেন্ট ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৪ শতাংশে। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল মাত্র ৩.৭ শতাংশ। এবং নেপালের অফশোর স্টুডেন্ট ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫১ শতাংশের বেশি এবং ভারতের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। উচ্চ প্রত্যাখ্যানের কারণে প্রকৃত শিক্ষার্থীরাও অস্ট্রেলিয়ায় পড়ার পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও আর্থিক সক্ষমতা ও শিক্ষাগত উদ্দেশ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশকে এভিডেন্স লেভেল ২ থেকে লেভেল ৩-এ উন্নীত করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ৩০ সেপ্টেম্বর নিয়মিত হালনাগাদ হলেও বাংলাদেশের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে দেশ ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তর। এভিডেন্স লেভেল কোনো আবেদনকারীর স্বয়ংক্রিয় ভিসা প্রত্যাখ্যানের নির্দেশনা নয়, ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও প্রমাণপত্রের ভিত্তিতেই আবেদন মূল্যায়ন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়েও ধাক্কা
ভিসা নীতির কঠোরতার প্রভাব পড়ছে অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতেও। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ভর্তি প্রায় ১৮ শতাংশ কমতে পারে। এতে আগামী তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় প্রায় দুই বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। ফলে শিক্ষার্থী বাছাইয়ে কঠোরতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ধরে রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশিদের প্রস্তুতিতে বাড়তি সতর্কতা
প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু ব্যাংক ব্যালান্স নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা প্রমাণের প্রয়োজন হতে পারে। স্পনসরের আয়ের বৈধ উৎস, অর্থের মালিকানা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং পড়াশোনার ব্যয় বহনের সক্ষমতার পাশাপাশি নির্বাচিত কোর্সের যৌক্তিকতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে। এদিকে গত ২ অক্টোবর ২০২৬ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসা-সংক্রান্ত আরও কিছু বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে। অধিকাংশ অস্থায়ী ভিসাধারীর অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে থেকে শিক্ষার্থী ভিসায় পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ভিসায় যুক্ত করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ এসেছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য রয়েছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
প্রস্তাবিত সংস্কার নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত দেওয়ার সময়সীমা ২৩ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। মতামত পর্যালোচনা শেষে সরকার প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করবে। নতুন মন্ত্রিপর্যায়ের নির্দেশনা কিংবা আর্থিক সক্ষমতা কাঠামো কার্যকরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থী ভিসা নীতিতে প্রস্তাবিত পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রত্যাশীদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। একদিকে আর্থিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছতার কঠোর যাচাই, অন্যদিকে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের আবেদন যথাযথভাবে মূল্যায়নের বিষয়টি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই এখন অস্ট্রেলিয়া সরকারের অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।




