আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আইনি সেবা ও সহায়তা দিতে সম্প্রতি গঠন করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ আইন সহায়ক কমিটি’। তবে আত্মপ্রকাশের পরপরই এই কমিটি নিয়ে খোদ দলটির ভেতরেই চরম ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, সরকার পতনের পর চরম বৈরী পরিস্থিতিতে যাঁরা দলের নেতা-কর্মীদের বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দিয়েছেন, তাঁদের অনেককেই কমিটিতে রাখা হয়নি। উল্টো কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের স্থান দেওয়া হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা, সুযোগসন্ধানী আচরণ এবং বিপদে পড়া নেতা-কর্মীদের পকেট কেটে ‘জামিন বাণিজ্যের’ গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
বাদ পড়েছেন দুঃসময়ের কাণ্ডারি আইনজীবী রাখি
দলীয় সূত্রে জানা যায়, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আইনি সেবা দিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন সুপরিচিত আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন (রাখি)। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি এখন পর্যন্ত দলের তিন শতাধিক নেতা-কর্মীকে আইনি সেবা দিয়েছেন।
সম্প্রতি সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের পক্ষে একাধিক রিমান্ড ও ট্রাইব্যুনাল শুনানিতে অংশ নেন তিনি। এছাড়াও গুলশানে ‘গোপন বৈঠকের’ অভিযোগে গ্রেপ্তার যশোর ও মাদারীপুরের আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মী, লালমনিরহাটের শিক্ষক মুকিবসহ পাঁচজন এবং দেড় মাসের শিশুসহ কারাবন্দী যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমকে জামিনে মুক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন। এমনকি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হওয়া এক রিকশাচালকের পক্ষেও আইনি লড়াই করেছেন তিনি।
গত ৪ আগস্ট ঢাকা জজকোর্ট প্রাঙ্গণে নিজ চেম্বারে তিনি বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের হামলার শিকার হন এবং তাঁর চেম্বার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এত কিছুর পরও কমিটিতে তাঁর নাম না থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছে তৃণমূল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফারজানা ইয়াসমিন (রাখি) বলেন, ‘আমি কোনো পদ বা প্রাপ্তির আশায় নেতা-কর্মীদের আইনি সহায়তা দিইনি। দলের চরম দুঃসময়ে নিজের বিবেকের তাড়না থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। কমিটিতে থাকা না–থাকা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। তবে ত্যাগী আইনজীবীদের মূল্যায়ন করা হলে সবার কাজের স্পৃহা আরও বাড়ত।’
‘গুপ্ত জামায়াত’ হিরন ও তাঁর ‘জামিন বাণিজ্য’
অন্যদিকে, এই কমিটিতে কেন্দ্রীয় সদস্য হিসাবে স্থান পেয়েছেন ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান (হিরন)। তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জামিন বানিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ভৈরব কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর চাচা জামায়াত নেতা মাওলানা মিজানুর রহমানের সহযোগিতায় তিনি জামায়াতের অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুগদা শাখায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি সরাসরি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গোপন মিটিং-মিছিলে অংশ নিতেন। শিবিরের ‘কর্মী’ থেকে ‘সাথী’ হওয়ার প্রাক্কালে গোপনে প্রেম করে বিয়ের বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় তাঁর সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
পরবর্তীতে আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার পর তিনি সুচতুরভাবে গুপ্ত হিসাবে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন। তার ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে যশোর-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্যের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে আওয়ামী রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন।
কিন্তু ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আবারও খোলস পাল্টান। ৮ আগস্ট ফেসবুকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক ও উপদেষ্টাদের ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান’ উল্লেখ করে পোস্ট দেন।
দলের একাংশের অভিযোগ, বর্তমানে তিনি আবারও খোলস পাল্টেছেন। বিপদে পড়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি বিএনপিপন্থী জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে আঁতাত করে হাইকোর্টে ‘জামিন বাণিজ্য’ করছেন। নেতা-কর্মীদের রক্তপানি করা এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে প্রভাবশালী আইনজীবীদের পকেটে। এই টাকায় তিনি দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুরো পরিবারই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত
অনুসন্ধানে জানা যায়, হিরনের পুরো পরিবারই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তাঁর বাবা সাবেক সেনাসদস্য ইসমাইল মোল্লা জামায়াতের একজন সক্রিয় কর্মী। তাঁর মেজ চাচা মাওলানা মিজানুর রহমান মোল্লা দীর্ঘ ১০ বছর ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে উপজেলা জামায়াতের রোকন।
তাঁর আরেক চাচা হাবিবুর রহমান মোল্লা ফুলতলা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালীন শিবিরের ‘সাথী’ ছিলেন এবং বর্তমানে ইউনিয়ন জামায়াতের সক্রিয় কর্মী। অপর চাচা সেকেন্দার মোল্লা (জিয়া) ফুলতলা আলিয়া মাদরাসায় পড়াকালীন শিবিরের রাজনীতির হাতেখড়ি॥ পরবর্তীতে দীর্ঘদিন শিবিরের সাথী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে সিদ্ধিপাশা ইউনিয়ন জামায়াতের পেশাজীবী সংগঠনের সভাপতি। এছাড়া তাঁর আরেক চাচা মো. হাসান মোল্লাও জামায়াতের সক্রিয় কর্মী।
এ বিষয়ে আইন সহায়ক কমিটির গঠনপ্রক্রিয়া ও বিতর্ক প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুঃসময়ে দলের নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাদের অবমূল্যায়নের সুযোগ নেই,পর্যায়ক্রমে তাঁদেরও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
গুপ্ত নেতা হিরনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জামায়াত শিবিরের গুপ্ত সদস্যরা বিভিন্ন দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে এখনও রয়েছে এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য সুতরাং যাঁদের বিরুদ্ধে এধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাবে আমরা অবশ্যই তাদের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পারিবারিক রাজনৈতিক আদর্শের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো’।

