
শিশু-কিশোরদের প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ‘ছোটকাকু’। বইয়ের পাতা পেরিয়ে ১৫ বছর ধরে টেলিভিশনের পর্দায়ও দর্শকদের আনন্দ দিয়ে আসছে চরিত্রটি। এবার ছোটকাকুকে ঘিরেই শুরু হলো দুই দিনব্যাপী ‘ছোটকাকু উৎসব ২০২৬’।
আনন্দ র্যালি, উচ্ছ্বাস আর শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সোমবার রাজধানীর আলোকি কনভেনশন হলে শুরু হয়েছে এই আয়োজন।
সকাল ১১টায় শতাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আনন্দ র্যালির মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। র্যালিতে অংশ নেন ছোটকাকু চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা আফজাল হোসেনও। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর আনন্দের মধ্য দিয়ে র্যালিটি উৎসবস্থলে গিয়ে শেষ হয়।
পরে অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের উদ্বোধনী আয়োজন। এতে উপস্থিত ছিলেন ছোটকাকুর স্রষ্টা ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, অন্যপ্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলামসহ আরও অনেকে।
উদ্বোধনী আয়োজনে শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে মাজহারুল ইসলাম বলেন, ছোটকাকুর প্রতিটি বই একেকটি জেলা ও শহরকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে। ছোটকাকুর মতো শিশুদেরও দেশকে ভালোবাসার আহ্বান জানান তিনি।
উৎসবের আয়োজন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বই পড়ার গুরুত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘শুরু থেকে যাঁরা এখানে (আলোকি মিলনায়তনে) প্রবেশ করবেন, এখানে যে বিষয়গুলো দেখবেন চারদিকে, সবই বইকেন্দ্রিক। বই নিয়ে এখন আমরা কথা বলি? আমরা বলি না। কিন্তু বই আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পড়া আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু স্কুলের বই পড়ে মানুষ বড় হয়নি, হতে পারে না। তাহলে পৃথিবীতে অসংখ্য লেখক জন্ম নিতেন না, পৃথিবীতে অসংখ্য বইঘর থাকত না। বইঘরে বাচ্চা থেকে বুড়োরা সবাই ভিড় করে সারা দিন কাটাত না।’
বই পড়ার সঙ্গে একটি দেশ ও দেশের মানুষের মেধা–মননের উন্নয়ন এবং অগ্রগতির সম্পর্কের কথাও বলেন আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বইয়ের কাছে মানুষ যত আসবে, সেই দেশ, সেই মানুষ তত উন্নত হবে। আমরা অনুভব করেছি, পড়ার ওপর জোর দেওয়া দরকার।’
তাহলে ‘ছোটকাকু’ কেন—এই প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা দেন তিনি। আফজাল বলেন, ‘হয়তো অনেকে বলবেন, তাহলে ছোটকাকু কেন? আমরা তো ছোটকাকুকে একটা আন্দোলন হিসেবেই শুরু করেছি। একটা অভিযানের মধ্য দিয়ে, একটা রহস্য উন্মোচনের মধ্য দিয়ে মানুষকে দেশপ্রেমের কথা বলব, মানুষকে বুদ্ধিমত্তার কথা বলব, মানুষকে কৌতূহলী হওয়ার কথা বলব।’
শিশুদের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের মনে যখন প্রশ্ন জাগবে, একটা শিশুর মনে যখন প্রশ্ন জাগবে, তখন কেবল সে উত্তর পাবেই। যে উত্তর খোঁজে না, সে আসলে কখনো উত্তর পাবে না। আর পুরো জীবনটাই কিন্তু প্রশ্ন আর উত্তরের। সেই প্রশ্ন আর উত্তরের জন্যই ছোটকাকু উৎসব।’
উৎসবে থাকা বিভিন্ন প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য নিয়েও কথা বলেন আফজাল। তিনি বলেন, ‘দুই দিনব্যাপী এখানে অনেক খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। সেই খেলায় অনেক পুরস্কার আছে। কিন্তু এই খেলা কি শুধুই খেলা, শুধুই উপভোগের জন্য? না, এটা নিজেকে পরীক্ষা করার একটা কেন্দ্র। আমার কতটুকু সাহস আছে, আমার মাথায় কতটুকু বুদ্ধি আছে। আমি কতটুকু পারি, আরেকজনের তুলনায় আমি কতটা এগিয়ে—এই প্রতিযোগিতাগুলো আছে।’
তবে প্রতিযোগিতাকে জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখানে হেরে যাওয়া নেই, আছে আনন্দ। আনন্দ নিয়ে এখানে আসা, নতুন আনন্দের সঙ্গে এখানে সাক্ষাৎ এবং আনন্দ নিয়েই ঘরে ফিরে যাওয়া।’
উৎসবের আয়োজন নিয়ে নিজের অনুভূতি জানিয়ে আফজাল হোসেন বলেন, ‘এখানে ছোটরা হচ্ছে মূল দর্শক, যাঁরা উপভোগ করতে এসেছেন এই উৎসব। যদিও এটা শুধু ছোটদের জন্য, এটা ছোট-বড় সবার উৎসব। আমরা বলছি, এটা নতুন অভিজ্ঞতার উৎসব। যে অভিজ্ঞতা আমরা দাবি করতে পারি, আগে হয়নি।’
শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে প্রথম দিনের আয়োজন নিয়ে সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেন আফজাল। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ভালো লাগছে। আজকের আয়োজনে আমরা আশা করেছিলাম, স্কুল থেকে বাচ্চারা আসবে, শিক্ষকেরা আসবেন, অভিভাবকেরা আসবেন—তাঁরা এসেছেন। তাঁদের আসাতে উৎসব উৎসবমুখর হয়েছে। অনেক ছোট বাচ্চা এসেছে, ওরা ওদের মতো উপভোগ করুক।’
এর আগে শনিবার চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আলোকি, গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডে বসছে ‘ছোটকাকু উৎসব ২০২৬’। দুই দিনের এ আয়োজনে রয়েছে নানা মজার প্রতিযোগিতা, পুরস্কার, আড্ডা, আলোচনা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি পুরো পরিবার নিয়েও উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকছে।
বইয়ের পাতার ছোটকাকুকে টেলিভিশনের পর্দায় প্রাণ দিয়েছেন আফজাল হোসেন। চরিত্রটির সঙ্গে নিজের ১৫ বছরের পথচলার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ছোটকাকুতে অভিনয় শুরুর সময় তিনি অভিনয় থেকে প্রায় দূরেই সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু শিশুদের জন্য কিছু করার দায়বোধ থেকেই চরিত্রটির সঙ্গে যুক্ত হন।
উৎসবের দুই দিন শিশু কিশোরদের সাথে তিনি থাকবেন। সেই সাথে উপস্থিত থাকবেন ১৫ বছর ধরে ‘ছোটকাকু’তে অভিনয় করা শিল্পীরাও।
২০০৪ সালে ‘কক্সবাজারে কাকাতুয়া’ লেখার মধ্য দিয়ে ছোটকাকুর যাত্রা শুরু হয়। শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলাকে গল্পের পটভূমি করে ছোটকাকুকে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত ছোটকাকুর ৪৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি বইয়ের গল্পে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ৪৫টি জেলা।
ছোটকাকুকে বইয়ের পাতা থেকে টেলিভিশনের পর্দায় আরও জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে আফজাল হোসেনের অবদানের কথাও স্মরণ করেন ফরিদুর রেজা সাগর। চরিত্রটিকে পর্দায় প্রাণ দেওয়ার জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
রহস্য, রোমাঞ্চ ও বিনোদনের পাশাপাশি সাহস, আত্মবিশ্বাস, পর্যবেক্ষণশক্তি এবং অন্যকে সহযোগিতা করার মতো ইতিবাচক বার্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে রয়েছে ছোটকাকু। এবার সেই প্রিয় চরিত্রকে ঘিরেই আয়োজিত উৎসব হয়ে উঠেছে শিশু-কিশোরদের মিলনমেলা। দুই দিনের এই আয়োজনে তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে অংশ নিচ্ছে পুরো পরিবারও।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…




