আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’ প্রতিপাদ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে।
গুম একটি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। মৃত্যুর পর স্বজনেরা অন্তত শেষকৃত্য করতে পারেন, প্রিয়জনের কবর জিয়ারত করতে পারেন। কিন্তু গুমের শিকার ব্যক্তির ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা না জানার কারণে পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। স্বজন বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, মারা গেলে মরদেহ কোথায়, এসব প্রশ্নের উত্তর কিছু পরিবার বছরের পর বছর প্রায় পায়, আবার কিছু পরিবার কখনও পায় না।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে সাত শতাধিক মানুষকে গুমের অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরেছেন। তবে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ অনেকে এখনও নিখোঁজ।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করছে। তাদের দাবি, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান প্রকাশ, গুমের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাদের অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে কোনো তথ্য দেওয়া হয় না।
যেভাবে শুরু আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারে পদক্ষেপ নেওয়া, তাদের স্মরণ এবং পরিবারের প্রতি সংহতি জানানোই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এর আগে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ জোরপূর্বক গুম থেকে সব ব্যক্তিকে সুরক্ষার বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সনদ গ্রহণ করে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ কার্যকর হওয়ার পর ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশে ২০১১ সাল থেকেই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন করে আলোচনা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে গুমের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেওয়া প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, তারা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছে। যাচাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে।
কমিশনের সদস্যরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাদের ধারণা, দেশে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। কারণ অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার কমিশনের কাছে অভিযোগ করেননি।
কমিশনের তদন্তে গুমের ঘটনাগুলো মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসব ঘটনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানানো হয়।
আলোচিত যেসব গুম
গুম কমিশনের প্রতিবেদনে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল আমান আজমি, আইনজীবী মীর আহমাদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হন এম ইলিয়াস আলী। তার অবস্থান সম্পর্কে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকায় চৌধুরী আলমকে সাদা পোশাকের নিরাপত্তাকর্মীরা তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তারও কোনো সন্ধান মেলেনি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ২০০৯ সাল থেকে ৭০৮টি কথিত জোরপূর্বক গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে দুই শতাধিক ঘটনায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
‘আয়নাঘর’ নিয়ে ভয়াবহ বর্ণনা
বাংলাদেশে গুমের আলোচনায় ‘আয়নাঘর’ শব্দটি বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে জানালাবিহীন ছোট কক্ষ, সার্বক্ষণিক আলো, বাইরের শব্দ থেকে বিচ্ছিন্ন পরিবেশ এবং নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন সেখান থেকে ফিরে আসা কয়েকজন।
ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, তুলে নেওয়ার পর তাদের শারীরিক নির্যাতন করা হতো। চোখ ও হাত বেঁধে রাখা, নির্যাতনকক্ষে নিয়ে যাওয়া এবং অন্য বন্দিদের কান্নার শব্দ শোনার মতো অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন তারা।
সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান, যিনি দুই দফায় গুমের শিকার হয়েছিলেন, বলেছেন ‘আয়নাঘর’ একটি রূপক নাম। সেখানে বন্দি ব্যক্তি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেতেন না।
শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দীর্ঘদিন গুম থাকা তিনজনকে গোপন বন্দিশালা থেকে মুক্ত করা হয়। তারা হলেন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমি, আইনজীবী আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগঠন ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা। প্রথম দুজন প্রায় আট বছর এবং মাইকেল চাকমা পাঁচ বছরের বেশি সময় গোপন বন্দিশালায় ছিলেন।
গুমের বিচার ও নতুন আইন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে গুমকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামোও করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। বিলটিতে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের কারণে কারও মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে অথবা পাঁচ বছর পরও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুম সংক্রান্ত আলোচনায় উঠে আসা এসব ঘটনা শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিদের নয়, তাদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও ন্যায়বিচারের দাবিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির বিষয়টি আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে।
