বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান, যার মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে এমন এক কারণে, যা কার্যকর উদ্যোগে অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য।
আজ শনিবার আন্তর্জাতিক পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই।’
২৫ জুলাইকে এ দিবস হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে দিবসটি উপলক্ষে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো জাতীয় কর্মসূচি চোখে পড়েনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৫ সালের জুনে ‘বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু ও অসুস্থতা হ্রাসের জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৫–২০৩০)’ প্রণয়ন করে। লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। পরিকল্পনায় আঁচল (কমিউনিটি ডে-কেয়ার), সুইমসেফ প্রশিক্ষণ, সিপিআর প্রশিক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে নিরাপত্তা, সমুদ্রসৈকতে লাইফগার্ড বৃদ্ধি এবং ১৬টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলা হলেও এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, জাতীয় কর্মকৌশলটি বর্তমানে প্রচার (ডেসিমিনেশন) পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রস্তাব পাওয়ার পর অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট বাজেট, দায়িত্ব বণ্টন, সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ও নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন ছাড়া ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাদের ভাষ্য, কমিউনিটি-ভিত্তিক শিশু পরিচর্যা, জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা এবং দ্রুত উদ্ধার-পরবর্তী চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে প্রায় ৪০ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যাদের বড় একটি অংশ শিশু। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটে বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা বা জলাশয়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা বাড়ায় বাংলাদেশে এ ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় অভিভাবকেরা কাজে ব্যস্ত থাকায় ছোট শিশুরা অনেক সময় নজরদারির বাইরে চলে যায়। মাত্র কয়েক মিনিটের অসতর্কতাই একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাদের মতে, ছোট শিশুদের একা পানির কাছে না রাখা, জলাশয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা, কমিউনিটি ডে-কেয়ার, জীবনরক্ষাকারী সাঁতার শিক্ষা, সিপিআর প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অধিকাংশ পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচির অংশ করতে হবে। তাদের মতে, প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য, আর প্রতিরোধযোগ্য এই মৃত্যু বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।





