প্রকল্প নেওয়ার আগে সক্ষমতা যাচাই হয়নি, এমনকি জমির দখলও নিশ্চিত করা যায়নি। তিন দফা সময় বাড়িয়েও লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (এনএইচএ)। ২০১৮ সালে রাজধানীর ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরে ৬টি প্লটে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। কিন্তু পরিকল্পনার দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আট বছরেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
বিগত সরকারের সময়ে নেওয়া প্রকল্পটি এখন সংস্থাটির ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২২৪ কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৭ কোটি ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকায়। ব্যয় বাড়লেও কমেছে ফ্ল্যাট ও গ্যারেজের সংখ্যা। নকশায় আনা হয়েছে একাধিক পরিবর্তন। এ সময়ে প্রকল্প পরিচালকও কয়েকবার বদলানো হয়েছে। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। তদারকির জন্য তিনটি মোটরসাইকেল কেনায় ব্যয় হয়েছে ৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সরকারি স্থাপত্য অধিদপ্তরকে পাশ কাটিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নকশা প্রণয়নে খরচ হয়েছে ২ কোটি ৬ লাখ টাকা।
অডিট আপত্তিতে আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। এজি অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অনুমোদিত ডিপিপি বা বাজেট ছাড়াই ৭৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়াই এই ব্যয় করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৬টি প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও এখনো ৩টি প্লট গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দখলে আসেনি। ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সভার তথ্য অনুযায়ী, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ ৮১ কোটি টাকার মধ্যে ২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
নথিপত্র বলছে, মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের একটি বাড়ি অধিগ্রহণে ২০১৮ সালে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো জমির দখল পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। একইভাবে ইকবাল রোডের একটি বাড়ির জন্য ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয় করেও পুরো দখল নিশ্চিত করা যায়নি। আংশিক দখল নেওয়া হলেও বাকি অংশ এখনো ব্যক্তিমালিকানায় রয়েছে। এ নিয়েও মামলা চলছে।
মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউয়ের একটি প্লটে কিছু অগ্রগতি হলেও কাজ থেমে গেছে। ২০২৩ সালের মার্চে প্রথম তলার ছাদ ঢালাইয়ের পর দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকে। পরে কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ধানমন্ডির তিনটি প্লটের মধ্যে একটি এখনো দখলে আসেনি। একটি প্লট দখলে নেওয়া হলেও সেখানে নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। ধানমন্ডির ৬/এ সড়কের একটি প্লটে ১৪ তলা ভবনের কাঠামো দাঁড়ালেও তা এখনো বসবাসের উপযোগী নয়। টাইলস, দরজা-জানালা, পানি, স্যানিটেশন ও বৈদ্যুতিক কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে।
এই ভবনের নকশায়ও শেষ পর্যায়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে সাধারণ ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০২২ সালে চুক্তি হলেও কাজের গতি সন্তোষজনক না হওয়ায় প্রথম ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল করা হয়। পরে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে ২০২৪ সালের জুনে আবার কাজ শুরু হয়। বর্তমানে লিফটসহ অন্যান্য কাজের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে।
সরকারের পাওনা আদায়ে গাফিলতির অভিযোগও রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জরিমানা বাবদ ৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা এখনো আদায় করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থ আদায়ের জন্য মামলা করা হয়েছে।
মামলার দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে পড়ছে। যদিও আইন কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তদারকি করা হচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আইএমইডি প্রকল্পটি দুই ভাগে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। দখলে থাকা প্লটগুলোতে দ্রুত কাজ শেষ করা এবং দখলহীন প্লটগুলো আলাদা পর্যায়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অনিশ্চিত প্লট বাদ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে গণপূর্ত ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখার যুগ্মসচিব আবুল বাকের মো. তৌহিদ জানিয়েছেন, যেসব জমি এখনো বুঝে পাওয়া যায়নি, সেগুলো বাদ দিয়ে প্রকল্প সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দখলে থাকা জমিতে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।






