আমি কেন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম

আমি কেন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম

আসসালামু আলাইকুম, শুভ সকাল। আমি খুব একটা ভালো বক্তা নই। তবে চেষ্টা করব তোমাদেরকে বলতে আমি কী কারণে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলাম। আমার বয়স ছিল তোমাদের মতো। ১৫ বছর বয়স তখন। পড়তাম শাহীন স্কুলে। শাহীন স্কুলে পড়াকালীন আমি কোনো বড় মারামারি বা এ ধরনের কোনো কিছুতে…৭ মার্চ যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বক্তৃতা হয়, তখন আমি গিয়েছিলাম। আব্বা বাসা থেকে বলেছিলেন, তুমি যদি যাও, তাহলে সাবধানে যেয়ো; কারণ যেকোনো সময় গন্ডগোল লাগতে পারে। ইয়ের ভিতরে যেয়ো না। মানে ইয়েটা হচ্ছে তোমার সমাবেশটা হচ্ছে যেখানে, সেখানে যেয়ো না, বাইর থেকে দেখো। তো আমি বাংলা একাডেমিতে যাই। তোমরা বাংলা একাডেমি চেনো তো?

তখন কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একেবারে খোলা ছিল। তো আমি বক্তৃতা শুনি। বক্তৃতা শুনে বুঝতে পারি যে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। হয়তোবা একটা স্বাধীন দেশের জন্য অস্ত্র হাতে নেবে লোকজন। কিন্তু চিন্তা করিনি যে আমি অস্ত্র হাতে নেব। ২৫ তারিখ ঘুমাতে যাই। আমি তখনো হাফপ্যান্ট পরতাম। ২৬ তারিখে আম্মা বলে যে যাও। আমরা সকালবেলায় তখন রুটি ও মাখন দিয়ে নাশতা করতাম। আম্মা বলল, ‘মাখন শেষ হয়ে গেছে নিয়ে আসো।’ তোমাদের মতো এখন যে রকম বড় মাখন পাওয়া যায়, তখন ছোট ছোট মাখন এনে দিতাম। তো আমি মাখন আনতে গেলাম।

তোমাদের আগেই একজন বলেছেন যে আমি চানখাঁরপুলে থাকতাম। বাসা থেকে বের হয়ে দেখি একেবারেই থমথমে পরিবেশ। যেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। দেখি চানখাঁরপুলের…তোমরা যদি দেখে থাকো সব সময় মোড়ে রিকশা, অটোরিকশা এগুলো থাকে। কিন্তু সেদিন দেখি একটা রিকশা বা একটা মানুষও নেই। এর আগে তো কয়েক দিন হরতাল হলো, অসহযোগ আন্দোলন হলো, কিন্তু রিকশা থাকত। ওই দিন রিকশা, মানুষ কিচ্ছু নেই। তা–ও আমি সাহস করে আস্তে আস্তে বাইরে গিয়ে…চানখাঁরপুলের, আগে ফুলবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনটা ছিল। এখন যে রকম আমরা কমলাপুরে যাই, তখন ছিল ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন। ট্রেন লাইনটা ছিল চানখাঁরপুলের ওদিক দিয়ে।

আমি রেললাইনের কাছাকাছি গিয়েছি, ঠিক এই সময় কার্জন হলের ওদিক থেকে একটা থ্রি টন গাড়ি বলে যেটা আর্মিদের; ওটার ওপরে একটা এলএমজি ফিট করে ফায়ার করতে করতে পাকিস্তানি আর্মি আসছে। সত্যি কথা, আমি জীবনে তখনো গুলির আওয়াজ শুনিনি। শুনছি অনেক দূরে, হয়তো আওয়াজ হতে পারে। কাছাকাছি এলএমজির আওয়াজ যে কী জিনিস, তোমরা যদি না শোনো, তাহলে বুঝতে পারবা না। ভীষণ আওয়াজ। আমি আমার স্যান্ডেল ফেলে কোনোমতে ওয়ালের পেছনে ওয়াল ছিল, ওয়াল দিয়ে দৌড়ে ঘরের মধ্যে ঢুকি। আর হাঁপাতে থাকি। এরপর আম্মা–আব্বা আমাকে বলল যে ফ্লোরে শুয়ে থাকো। আমরা সবাই ফ্লোরে শুয়ে থাকলাম। চারদিকে এলএমজির ফায়ারিং হচ্ছে। পরে জানতে পারলাম ওই গাড়িটা ফায়ারিং করতে করতে ওদিক দিয়ে ঘুরে তোমার ইউনিভার্সিটি এরিয়াটা…জগন্নাথ হল ঘুরে আবার ওদের একটা নির্দিষ্ট কোনো জায়গা ছিল, ওই জায়গায় চলে গেছে।

তখন আমার মনে এল একটাই কথা যে আচ্ছা, সেনাবাহিনী তো আমাদের রক্ষা করার জন্য। আমাদেরকে তো মারার জন্য নয়। আমার দেশের সেনাবাহিনী আমাকে কীভাবে মারে? প্রথম জিনিসটাই আমাকে স্ট্রাইক করল যে আমরা কি মানুষ না তাহলে? আমরা কি এই দেশের নাগরিক না? মানুষকে হত্যা করে কীভাবে? আর কী কারণে আমাকে হত্যা করবে? কী কারণে আমার ওপরে গুলি চালাবে? এ কথাগুলো কনস্ট্যান্টলি আমার মাথায় ঘুরতে থাকল।

যাহোক, কিছুক্ষণ পরে আব্বা–আম্মা যখন নরমাল হয়ে গেল, তারা ফায়ারিং করে চলে গেল; আমি আবার বাসার সামনে গেলাম। সামনে গিয়ে দেখি…আমাদের বাসার সামনে যে টংদোকানটা ছিল, টংয়ের মধ্যে দুটি ছেলে থাকত। ওরা সিগারেটের ব্যবসা করত। ওদের বোধ হয় খুব সম্ভব বরিশালের দিকে বাড়ি। দুই ভাই চালাত। এক ভাই যখন দোকানে থাকত, আরেক ভাই দেশে থাকত। তো দেখলাম যে ওই টংদোকানটা বন্ধ। আমি আস্তে আস্তে মেডিকেল কলেজের গেট দিয়ে…ওই পাশ দিয়ে…পাশ দিয়ে…ছোট তো, কেউ দেখতেও পারে না। আশপাশে কোনো লোকও নেই।

ছোট থাকলেও সাহস কিন্তু বেশি হয়। তখন ভয় জিনিসটা কী, কত মারাত্মক হতে পারে, সেগুলো বোঝার ক্ষমতাও আমার নেই। তো আমি আস্তে আস্তে গেলাম। প্রথমে গেলাম শহীদ মিনারে। শহীদ মিনারে দেখলাম কয়েকটা শেল ফায়ার করা। কিন্তু ওরা তখনো পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। শেল ফায়ার করেছে। আমি শেল বলছি কেন? পরে আমি আর্মিতে জয়েন করেছিলাম। তাই আমি শেল, মর্টাল এগুলো বুঝি। এরপর হাঁটতে হাঁটতে গেলাম জগন্নাথ হলের দিকে। ওখানে গিয়ে দূরে থেকে আমি আর কথা বলতে পারি না। জীবনে প্রথম মৃতদেহ দেখি। দেখি শিক্ষার্থীদের লাশ পড়ে আছে। কারও মাথায় গুলি লেগেছে, কারও বুকে গুলি লেগেছে, কারও রানে গুলি লেগেছে। সব মৃত, একেকজন একেকভাবে পড়ে আছে। এটা দেখেই আমার হাত–পা কাঁপা শুরু করল। আমি কাঁপতে থাকলাম। কয়েক সেকেন্ডের জন্য নড়তে পারি না ভয়ে। এরপর একটা গন্ধ। কখন মেরেছে আমি জানি না, একটা গন্ধ। যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম, তখন আমি দৌড়ানো শুরু করলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে…বদরুন্নেসা কলেজ রোড দিয়ে দৌড়াতে থাকলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে রেললাইন দিয়ে এসে আমি চানখাঁরপুলে বাসায় এসে কাঁপতে থাকলাম।

আমার দাদি বেঁচে ছিলেন তখন। আমার দাদি…তোমরা জানো কিনা…এখন ইয়ে আছে কি না জানি না, খুব বেশি ভয় পেলে পরে শরবত আছে না? শরবতে একটু লবণ দিয়ে লবণ খাওয়ায়। বলে ভীষণ ভয় পেয়েছে, আমাকে লবণ খাওয়াল। সেই রাত ঘুমাতে পারিনি। এর আগে সন্ধ্যার সময় আরেকটা ঘটনা ঘটে গেল। রেললাইনের পাশে বস্তি ছিল। বস্তিতে এসে পাকিস্তানি আর্মি ফসফরাস গ্রেনেড থ্রো করে। চিন্তা করতে পারো? ওই বস্তির মধ্যে বাচ্চা, বয়স্ক নারী, তারা যাতে পুড়ে মরে, কেউ যদি দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে, তাদের গুলি মারছে। এটা দেখার পরে আমি আর ঘুমাতে পারি না। আমার মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ওই মৃতদেহগুলো, জগন্নাথ হলের মৃতদেহগুলো ভাসতেছে। যে এদের বাপ–মা কোথায়? বাপ–মা কি এদের মৃতদেহ পাবে? দেখতে পারবে কোনো দিন? এরা কী অন্যায় করেছিল? এরপর এই যে বস্তি, বস্তিতে যখন আগুন লাগানো হলো, ওদিক থেকে পুরো ধোঁয়া আমাদের বাসার দিকে এল। এই যে একটা গন্ধ, এটা কনস্ট্যান্টলি আমি খেতে পারি না, আমার বমি আসে, কয়েক দিন। পরের দিন সকালবেলায় যাই বাইরে।

যদিও জিনিসটা ভালো না, আমি ক্লাস টেনে থাকতে স্মোক করতাম। মাঝেমধ্যে। জিনিসটা ভালো না, তোমরা কোরো না। ওই দোকানে আমার একটা খাতা ছিল। আগে সব সময় কিন্তু খাতায় লিখে রাখত। লম্বা একটা খাতা থাকত, নাম লিখে ওই একটা সিগারেট বা দুইটা সিগারেট। খুব বেশি খেতাম না। দু–তিন টাকা হয়তো দিতাম। তো আমি ওই দোকানে যখন গেলাম, গিয়ে দেখি শাটারটা তালা মারা নেই। দোকান কিন্তু খোলা নেই। টংয়ের দোকান তো তোমরা দেখেছ। ওটা লাগানো। ওটা খুলে দেখি…দুই ভাইই ওই দিন রাতে ছিল, দুই ভাইয়ের মাথায় গুলি করে ওরা কাঁথা দিয়ে কভার করে চলে গেছে। এটা দেখার পরে যে কতগুলো শক…আমি বাসায় চলে গেলাম। আমি আর ঘুমাতে পারি না। তখন বন্ধুবান্ধব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিই, আর যা–ই হোক না হোক, আমি এই হত্যার প্রতিশোধ নেব। আমি অস্ত্র হাতে তুলে নেব।

অনেককে বললাম, আমার চার বন্ধু রাজি হলো, ওরা যাবে। ছয়জনের যাওয়ার কথা ছিল, দুজন ধরা পড়ে গেছে রাস্তায়। আমরা বাসা থেকে পালিয়ে যাই। পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাই। এ বিষয়ে বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আমি তোমাদেরকে আজকে পাকিস্তান আর্মির এই পার্টটা বললাম। কেন জানো? আমার খালি একটাই কষ্ট হয়, আর কোনো কষ্ট নেই। কেউ যদি পাকিস্তানের কথা বলে, তখন ভীষণ কষ্ট হয়। আমি নিজের চোখে দেখেছি যে এরা কী, মানুষ না অমানুষ। তো এই পাকিস্তানের কোনো ধরনের কথা আমি সহ্য করতে পারি না। তোমরা এ জন্য আমাকে দোষ দিতে পারো।

আমি বলব, এই যে আমি অস্ত্র হাতে নিয়েছি, এই অস্ত্র হাতে নিতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। ভীষণ কষ্ট হয়েছে। তুমি চিন্তা করো, তোমার বয়সে যদি কারও রাইফেল নিয়ে ট্রেনিং করতে হয়, তুমি সাত দিন থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে ট্রেনিং করো এবং পরে ফায়ার করো। দেখো যে এটা কত কঠিন কাজ। আমাদেরকে যখন ট্রেনিং দেওয়া হলো, ট্রেনিংয়ের পরে যখন আমরা ঢাকায় এলাম; না, ট্রেনিংয়ের পরে শুরুতে আমরা মন্দবাগে ক্যাপ্টেন গাফফারের অধীনে এবং ওখানে সুবেদার ওহাব ছিলেন, তাঁর সঙ্গে ফোর ইস্ট বেঙ্গলে আমরা যুদ্ধ করেছি। এরপরে আমরা যুদ্ধ করেছি ঢাকায় এসে; প্রথম ক্যাম্প করি মানিকগঞ্জে। আমাদের ক্যাম্পের একটা জিনিস ছিল, আমরা এক জায়গায় কখনো ক্যাম্প করতাম না। আমার মনে হয় দেড় মাসে আমরা ১২টা ক্যাম্প চেঞ্জ করেছি। কারণ, ক্যাম্পের লোকেশন যদি পাকিস্তান আর্মি জেনে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওরা সৈন্য পাঠাবে।

অনেকটা জিনিস আছে, যেটা বলে শেষ করা যাবে না। তবে শুধু এটুকু তোমরা জানবা যে আমরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিলাম, যাতে একটা ভালো দেশ পাই, সুন্দর দেশ পাই। দেশ নিয়ে খারাপ বলবা না। বলবা না যে আমরা পারিনি। আমরা পেরেছি। আমি তো আমার দেশকে কখনো আমেরিকার সঙ্গে তুলনা করব না। কখনো অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তুলনা করব না। ইউকের সঙ্গে তুলনা করব না। আমি আমার দেশকে তুলনা করব কোন দেশের থেকে স্বাধীনতা পেয়েছি। পাকিস্তানের সঙ্গে আমি আমার দেশের তুলনা করব। ভুটানের সঙ্গে আমার দেশের তুলনা করব। নেপালের সঙ্গে আমার দেশের তুলনা করব। তো আমরা যা পেরেছি, যা করেছি, তাতে হয়তো মানুষের হিংসা হয়। অনেক হিংসা হয়। এই যে তোমাদের স্কুলটাই দেখো না, কীভাবে গড়ে উঠেছে। আমি তো এই স্কুল দেখেছি, একেবারে শুরুতে দেখেছি। স্কুলটা কী সুন্দরভাবে গড়ে উঠেছে। প্রত্যেকটা ছাত্রকে দেখে আমার কাছে ভালো লাগছে। খুবই ভালো লাগছে তোমাদের ডিসিপ্লিন দেখে। এটা কি আমাদের অর্জন না? অবশ্যই অর্জন। তোমরা কখনো দেশকে ছোট মনে করবা না। তবে তোমাদের দায়িত্ব আছে এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটোর শহীদ হওয়া
টিটোর কথা বলতে বললেন। আসলে মানিকগঞ্জের একটা পরিবারকে পাকিস্তান আর্মি ধরে। টিটোর দুই ভাইকে পাকিস্তান আর্মি মেরে ফেলে। এটা দেখে ও আমার মতো চিন্তা করে যে প্রতিশোধ নিতে হবে। তো আমরা এটা শেষের দিকে, এটা বোধ হয় খুব সম্ভব ১৪ ডিসেম্বর ’৭১ সালে। টিটো আসত, আমরা ট্রেনিং করতাম। টিটো কিন্তু এখানেই লোকালি ট্রেইনড। আর আমরা মেলাঘরে ট্রেনিং নিয়েছি। মেলাঘরে, আগরতলায় ট্রেনিং নিয়েছি।

প্রতি রাতে আমরা অপারেশনে যেতাম। দিনের বেলায় আমরা ঘুমাতাম। একটু দেরি করে উঠতাম। আর আশপাশে গ্রামবাসী, আমাদের চোখ–কান ছিল এই গ্রামবাসী। তোমরা চিন্তা করতে পারবা না যে গ্রামবাসী আমাদের কীভাবে সহায়তা করেছে। আমি তো এটাকে মুক্তিযুদ্ধ বলি না, ছিল জনযুদ্ধ। জনগণের সাহায্য না থাকলে আমরা এতটা করতে পারতাম না। সকালবেলায় যখন আমরা দাঁত ব্রাশ করছি, ওই চাপকল ছিল, কলের পাশে বসে আমরা দাঁত ব্রাশ করছি। তো হঠাৎ করে গ্রামের থেকে লোকজন এসে বলতেছে যে পাকিস্তান আর্মি আসতেছে, পাকিস্তান আর্মি আসতেছে। আমরা তো অবাক! এত দূরে থেকে আমরা প্রায় এক মাস ধরে ইনসাইড পুরো রাজাকার, আলবদর সব ক্লিয়ার করে ফেলেছি। তো এখানে কোত্থেকে আসতেছে? তখন আমাদেরকে বলল যে একটা রিং রোড আছে, যেটা তোমার টাঙ্গাইল থেকে…ওরা পালাচ্ছে ঢাকার দিকে আসছে। তাড়াতাড়ি আমরা কী করলাম..আমাদের অস্ত্রগুলো নিয়ে, আমরা অস্ত্র একটা টিনের ঘরে রাখতাম। আর ওই ঘরের নিচে আমরা শুয়ে থাকতাম। তো ওই ঘরটা থেকে অস্ত্র নিয়ে সবাইকে দেওয়া হলো। মিনিমাম অর্ডার যেটা দেওয়া হলো, আমাদের ওই সময় নেতৃত্বে ছিল নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। তো বাচ্চু ভাই অর্ডার দিল, সে–ও গেল একটা এলএমজি নিয়ে সামনে। আমরা একটা লাইনে পজিশন নিলাম। পজিশন নিয়ে যেটা হয়, এটা বলতে গেলে আসলে একটু সময় লাগবে। তোমাদের ওই সময় আছে? বলা যাবে?

আর্মি যখন মুভ করে, যে রকম পাকিস্তান আর্মি, একসঙ্গে সব মুভ করে না। সামনে থাকে দুইটা স্কাউট। স্কাউট একজন ডানে থাকে রাস্তায়, একজন বাঁয়ে থাকে। তারা সিগন্যাল দিবে, তাদের কাছে ওয়্যারলেস সেট থাকে। তারা সিগন্যাল দেয়। পেছনে তাদের থাকে পয়েন্ট সেকশন। তারপরে থাকে পয়েন্ট প্লাটুন। এরপর থাকে ভ্যানগার্ড কোম্পানি। তো স্কাউট যখন দেখে, স্কাউট হলো চোখ–কান। ওরা সামনে দেখে দেখে একজন ডানে দেখতে থাকে, একজন বাঁয়ে দেখতে থাকে; যে শত্রু আছে কি না। কারণ, ওরা তো পালাচ্ছিল। কিন্তু যেহেতু তারা রেগুলার আর্মি, ওদের ডিসিপ্লিন বা ইয়ে বলো ওই দিক দিয়ে কোনো কিছু ছিল না। কারণ, ওরা জানত যে এখানে কোনো কম্প্রোমাইজ মানে মৃত্যু, নির্ঘাত মৃত্যু।

যাহোক, ওরা কী করল? ওরা ওদের ফরমেশনে আসছে। ভ্যানগার্ড কোম্পানির পরে ভ্যানগার্ড ব্যাটালিয়ন। এই যে একটা লম্বা…ছয়–সাত কিলোমিটার হয়ে যায়। আমি নিশ্চিত তোমরা জানো যে কোম্পানি কী, ব্যাটালিয়ন কী, এটা তো জানো না? তোমরা জানো। তো ওখানে যখন ওরা আসতেছে, আমাদের তো সব ভালো ট্রেইনড না। যারা এই যে ধরো লোকালি ট্রেইনড, আর আমরা এই ৫২ বা ৫৩ জন ইন্ডিয়াতে ট্রেইনড। আমাদের ক্যাম্পের শক্তি ছিল সব গ্রামবাসীর ছেলে, ইয়াং ছেলে সব জয়েন করেছিল। তো এই সংখ্যাটা আমাদের ৬০০–এর মতো হয়ে গেছে। যখন ফায়ার করেছে, বলা ছিল যে আমরা সবাই মাথা নিচু করে থাকব, যখন মেইন বডিটা চলে আসবে, তখন আমরা ফায়ার ওপেন করব। তো এর মধ্যেই যখন এই ওয়ান থার্ড স্কাউট আর পয়েন্ট সেকশন চলে এসেছে, তখন ফায়ার ওপেন করে দিয়েছে আমাদের মধ্য থেকে একজন। একবার ফায়ার ওপেন করার মানে সারপ্রাইজ লস্ট। তখন সবাই ওপেন করে, ওপেন আপ করেছে।

যাহোক, পাকিস্তান আর্মির অ্যাডভান্টেজ হলো ওদের কাছে মেশিনগান ছিল, ভারী মেশিনগান। ভারী মেশিনগান ৮০০ গজের মতো ফায়ার করতে পারে। আমাদের কাছে কোনো ভারী মেশিনগান ছিল না। ওরা করেছে কী, প্রথম কয়েকজন মারা গেছে, মারা যাওয়ার পরে ওরা আখখেত, ধানখেতের ভেতরে ঢুকে গেছে। ঢুকে গিয়ে বসে আছে। ওরা আফটার অল একটা ট্রেইনড আর্মি। ওরা বসে ছিল। আমরাও ফায়ার করছি, ওরাও ফায়ার করছে। কিন্তু ওদের ফায়ারটা আস্তে আস্তে কমে যায়। ওরা বসেই ছিল দেখার জন্য যে কোথা থেকে ফায়ারগুলো আসছে। টিটো করেছে কী, এ রকম একটা পজিশনে ছিল, লাইন পজিশনে, টিটো এ রকমভাবে উঠেছে। আমি কিন্তু ওই জায়গায় ঠিক পেছনে। এ জায়গায় ওঠার পরে সে একটি মেশিনগান নিয়ে বসেছিল। সে ঠিক ওখান থেকে পয়েন্ট করেছে। সে মুভমেন্ট দেখছে আগে, মাথা ওঠানো দেখেছে, সে ওই জায়গায় দিয়ে ফায়ার করছিল। যেই ও চেস্টটা পেয়েছে, চেস্ট যখন ক্লিয়ার হয়েছে, একদম স্ট্রেট ফায়ার করছে মেশিনগান। ওর পেটের এদিক দিয়ে গুলি ঢুকে ওদিক দিয়ে বের হয়ে গেছে।

আমার কাছে তখন একটি ইনজেকশন থাকত ব্লিডিং বন্ধ করার জন্য। এটা কিন্তু আমাদেরকে অনেক বিদেশি কোম্পানি দিয়েছিল। ভালো ইনজেকশন। আমাকে শেখানো হয়েছিল কীভাবে ইনজেকশন পুশ করতে হয়। ইনজেকশন পুশ করলাম, কিন্তু এত বড় ইয়ে…বুলেট ইনজুরিত ইনজেকশন দিয়ে বন্ধ করা যায় না। ওখানে তুলা টুলা দিয়ে ব্যান্ডেজের ব্যাপার আছে। আমাদের কাছে অত জিনিস ছিল না। টিটোর এত বেশি ব্লিডিং হচ্ছিল যে সে শুয়ে ছিল। একটা মানুষ মারা যাওয়ার আগে যে কী শক্তিশালী হয়, সেটা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। ওকে আমরা তিনজন ধরে রাখছি। যে টিটো তুমি নড়াচড়া করবা না, নড়াচড়া করলেই ব্লিডিং হবে। ও একেকটা মোচড় দেয় আর আমাদের তিনজনকে ফেলে বসে পড়ে। আবার আমরা তিন–চারজন মিলে ধরি। তখন সে আমাকে বকা দিচ্ছিল যে তুই কিসের ডাক্তার? কিসের কী? রক্ত বন্ধ করতে পারিস না কেন? মানে আবোলতাবোল বলছিল। শেষে দুইটা কি তিনটা মোচড় দিয়ে মারা গেল হাতের ওপরে। এটা ভোলা সম্ভব নয়। এই যে এরা প্রাণ দিয়েছে, যার জন্য তোমরা একটা দেশ পেয়েছ। আজকে যে তোমরা মেয়েরা কত আরামে ঘুরে বেড়াচ্ছ।

’৭১–এ তোমরা চিন্তা করতে পারবা না। আমরাও একজনকে মেরে ফেলেছিলাম। তখন আমাদের সঙ্গে রেজাউল করিম মানিক ভাই ছিলেন। মানিক ভাই একমাত্র ছেলে, উনি মারা গিয়েছেন এই জায়গায়। একটাই ছেলে। মানিক ভাই একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তার নাম গামা। কেন জানো? তার একমাত্র কাজ ছিল কোন বাসায় মেয়ে আছে, সে পাকিস্তান আর্মিকে খবর দিত এবং সে পরে একেকটা বাড়ি পাকিস্তান আর্মিকে দেখিয়ে দিত। তখন পাকিস্তান আর্মি সব মেয়েদের তুলে নিয়ে যেত।

আরেকটা নারীর কথা বলে আমি শেষ করব। এটা আসলে কঠিন হয়ে যায়। আমরা যখন মন্দবাগে যুদ্ধ করছি, একদিন দেখি ওই বাসায়…কোনো বাসায় কিন্তু লোক থাকত না। কারণ, এই জায়গায় ইন্ডিয়ান এমব্যাংকমেন্ট, পাকিস্তান আর্মি…এদিকে আমরা। আমরা যুদ্ধ করছি মাঝখানে যে জায়গা, এই জায়গায় বাড়িতে কেউ থাকত না। কারণ, অনবরত গোলাগুলি হচ্ছে। একদিন একটা গাছের নিচে বসে ছিলাম। অফ টাইমে তো কিছুটা রিক্রিয়েশন হয়, গল্প করছি, বন্ধুবান্ধব যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা, গল্প করছি। একদিন সেই গাছের ওপর থেকে হঠাৎ দেখি যে এক বাসায় একটা মহিলা যাচ্ছে। এরপর আমরা কয়েকজনের সঙ্গে গেলাম যে কী ব্যাপার একটা মহিলা যাচ্ছে কেন? গিয়ে দেখি সে একা একা কথা বলছে। সেই মহিলাকে পাকিস্তান আর্মি বাংকারে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ওখানে তাদের সঙ্গে রেখেছিল এবং তাঁকে পরে ছেড়ে দেয়। তো মহিলাটা কিছু বোঝেন না, পুরোপুরি শেষ। পাগল হয়ে গেছেন। তিনি খালি একটা জিনিস চেনেন, তাঁর বাড়ি। ওই বাড়িতে এসে তিনি ঘুমান।

তো দেখো, কোন জায়গা থেকে আমরা কোথায় এসেছি। দেশ নিয়ে গর্ব করো। ভুলে যাও ওই টেন পারসেন্ট লোকদের, যারা আমাদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ করেছিল, রাজাকার ছিল, আলবদর ছিল। ওদের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ো না। অনেক কষ্ট, অনেক দুঃখে থাকতা তোমরা। আজকে কোথায় থাকতা চিন্তা করা যায় না। চিন্তাও করা যায় না। তোমরা মেয়েরা, আমার মেয়ে আছে। আমার তিন মেয়ে। আমি আমার তিন মেয়ে, ওরা জানে। ওরা তো পাকিস্তানের কথাই শুনতে পারে না। ওদেরকে আমি পুরো ঘটনাগুলো বলেছি। আমি বলি নাই যে তুমি ঘৃণা করো অথবা পছন্দ করো, এটা তোমার ব্যাপার। কিন্তু তোমরা, তোমাদেরকে আমি অনুরোধ করছি, তোমাদের অনেক দায়িত্ব। প্রথম দায়িত্ব হলো দেশকে ভালোবাসা। দেশকে ভালোবাসো, দেশ উন্নতি করবে। কোনো বাধাই বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তোমরা ভালো থাকো, তোমাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।