উত্তম কুমারের জন্মশত বর্ষে অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় নাম রঞ্জিত মল্লিক। বিকল্পধারার সিনেমা থেকে মূলধারার বাণিজ্যিক ছবি- দুই ক্ষেত্রেই সাফল্যের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ১৯৭০ সালে মৃণাল সেনের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ইন্টারভিউ’ দিয়ে নায়ক হিসেবে তার চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু। পরে সত্যজিৎ রায়ের ‘শাখা প্রশাখা’তেও অভিনয় করেছেন।
পাঁচ দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে রঞ্জিত মল্লিক কাজ করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গেও। ‘মৌচাক’ (১৯৭৪), ‘দুই পৃথিবী’ (১৯৮০) ও ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ (১৯৮১)সহ মোট পাঁচটি সিনেমায় একসঙ্গে দেখা গেছে তাদের। উত্তম কুমারের শতবর্ষে তার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা, অভিনয়ের প্রতি মহানায়কের নিষ্ঠা এবং আজও তার জনপ্রিয়তার রহস্য নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফ্রন্টলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন রঞ্জিত মল্লিক। সেই সাক্ষাৎকারটি চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করে প্রকাশিত হলো:
মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও উত্তম কুমার কীভাবে এত বড় সাংস্কৃতিক ঘটনা হয়ে আছেন?
গত ১০০ বছরে বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় অভিনেতা উত্তম কুমার। তিনি ৪৬ বছর আগে চলে গেছেন, কিন্তু এই ৪৬ বছরেও বাঙালি সমাজে তাকে এবং তার সিনেমাগুলো নিয়ে আলোচনা থামেনি।
পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় অনেক বড় অভিনেতা আছেন। কিন্তু উত্তম কুমারকে ঘিরে বাঙালির যে ভালোবাসা, সেটি পৃথিবীর আর কোথাও কোনো অভিনেতার ক্ষেত্রে দেখা যাবে না। এর প্রধান কারণ তার স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব- তিনি যেভাবে কথা বলতেন, যেভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অসাধারণ।
উত্তম কুমারের সঙ্গে আপনার প্রথম সিনেমা ‘মৌচাক’। তখন আপনিও জনপ্রিয়তার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আমি তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সত্যি বলতে, উত্তম কুমারের মতো নিজের কাজের প্রতি এতটা সিরিয়াস কোনো অভিনেতাকে আমি দেখিনি। অনেক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছি, তারা সবাই খুব ভালো ছিলেন। কিন্তু উত্তমদার মতো নিষ্ঠা আর কারও মধ্যে দেখিনি।
নিজের কাজ নিয়ে তার খুঁতখুঁতেভাবই তাকে উত্তম কুমার করে তুলেছিল। কোনো কাজেই তিনি সহজে সন্তুষ্ট হতেন না। আর সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। অভিনয়কে আরও ভালো করার জন্য তার মধ্যে প্রবল তাগিদ ছিল। উৎকর্ষের পেছনে ছুটতেন তিনি।
একটি শট দেওয়ার পর পরিচালক, সহকারী পরিচালক এবং সেটের অন্যদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের মতামত জানতে চাইতেন। একদিন একটি শট দেওয়ার পর দুপুরের খাবারের বিরতি হলো। আমরা সবাই খেতে গেলাম। ফিরে এসে দেখি, উত্তমদা আবার শটটি দিতে চাইছেন। পরিচালক বললেন, শট ঠিকঠাক হয়েছে। কিন্তু উত্তমদা সন্তুষ্ট ছিলেন না। নিজের অভিনয় নিয়ে তার যে মানদণ্ড ছিল, সেই জায়গা থেকে শটটি যথেষ্ট ভালো হয়নি। তাই নিজের মনমতো না হওয়া পর্যন্ত তিনি আবার শট দিতে চাইলেন।
উত্তম নিজেকে বারবার নতুন করে তৈরি করেছেন। তার প্রথম দিকের সিনেমা আর পরের দিকের সিনেমাগুলো দেখলেই সেটা বোঝা যায়। শুরুতে তার অভিনয়ে কিছুটা কৃত্রিমতা ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি শিখেছেন, নিজের অভিনয়কে ঘষেমেজে আরও পরিণত করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের পেশার শীর্ষে পৌঁছেছেন।
‘নায়ক’ সিনেমার সেই সংলাপটি মনে আছে- টেবিলে আঘাত করে তিনি বলছেন, ‘দ্য টপ, দ্য টপ, দ্য টপ’। বাস্তব জীবনেও উত্তমের পথটা ছিল ঠিক তেমনই- সবসময় শীর্ষে পৌঁছানোর চেষ্টা।
উত্তম কুমারের কাছ থেকে আপনি কী শিখেছেন?
উত্তমদার সঙ্গে আমার পাঁচটি সিনেমা হয়েছে। প্রথমটি ‘মৌচাক’, আর শেষটি ‘ওগো বধূ সুন্দরী’। যদিও সিনেমাটি শেষ হওয়ার আগেই তিনি মারা যান।
উত্তমদা যখন শট দিতেন, আমি চেষ্টা করতাম সেটে উপস্থিত থাকতে। সাধারণত সহশিল্পীর শটের সময় নিজের কাজ না থাকলে কেউ সেটে দাঁড়িয়ে থাকে না। কিন্তু আমি থাকতাম। শুধু তাকে দেখতাম আর শেখার চেষ্টা করতাম।
তিনি কোথায় বিরতি দিচ্ছেন, কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, কীভাবে সংলাপ বলছেন- খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম সব। তার কাছ থেকে শেখার মতো কিছুই আমি বাদ দিতাম না।
একবার তাকে একটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে হঠাৎ পড়ে যাওয়ার দৃশ্য করতে হয়েছিল। তিনি এমন বাস্তবভাবে পড়ে গেলেন যে পুরো সেটের সবাই চমকে উঠেছিল। পরিচালক ‘কাট’ বলার পর তিনি এমনভাবে উঠে দাঁড়ালেন, যেন কিছুই হয়নি।
আমি গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে এমনভাবে পড়ে গেলেন। প্রথমে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বললেন, ‘এ আর এমন কী!’ কিন্তু আমি জোর করায় তিনি কৌশলটি বললেন। জানালেন, হাঁটুর নিচ থেকে পা শক্ত করে রাখতে হবে, এরপর হঠাৎ পা ছেড়ে দিতে হবে। এতে ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং স্বাভাবিকভাবেই পড়ে যাওয়া সম্ভব হবে। সেদিন উত্তমদার কাছ থেকে সিঁড়ি দিয়ে পড়ে যাওয়ার কৌশলটিও শিখে নিয়েছিলাম!
এভাবেই নানা বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করতাম, আর তার কাছ থেকে শিখতাম। তিনি শুধু অসাধারণ শিল্পী ছিলেন না, একজন ভীষণ ভালো মানুষও ছিলেন। ভদ্র, বিনয়ী এবং মানবিক। কোনো টেকনিশিয়ান আর্থিক সমস্যায় পড়লে সাহায্য করতেন। কাজহীন অভিনেতাদের পাশে দাঁড়াতেন, তাদের কাজের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি সত্যিই একজন দারুণ ও দয়ালু মানুষ ছিলেন।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে উত্তম কুমারের কোনো বিশেষ পদ্ধতি কি আপনি লক্ষ্য করেছিলেন?
অভিনয়ের দুটি আলাদা ধরন হতে পারে। বাণিজ্যিক সিনেমায় একজন অভিনেতা দর্শক ও বক্স অফিসের কথা মাথায় রেখে কিছু নির্দিষ্ট ভঙ্গি বা স্টাইল ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু একই অভিনেতা যখন কোনো বড় পরিচালকের বিকল্পধারার সিনেমায় কাজ করেন, তখন সেই ভঙ্গিগুলো অনেকটাই বাদ দেন।
উত্তমদা এই দুই জগতের মধ্যে অসাধারণভাবে চলাফেরা করতে পারতেন। দুই ধরনের সিনেমায় তার অভিনয় সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যেত না। কিন্তু কোন সিনেমায় কোন ভঙ্গি রাখতে হবে আর কোনটি বাদ দিতে হবে- সেটা তিনি খুব ভালোভাবে বুঝতেন।
আজকের সময়েও উত্তম কুমারের অভিনয় কি প্রাসঙ্গিক?
অবশ্যই। শতভাগ প্রাসঙ্গিক। এত বছর ধরে তিনি প্রাসঙ্গিক ছিলেন কারণ তিনি নিজেকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতেন। প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলাতে পারতেন।
তবে এখন এমন কিছু সিনেমা তৈরি হচ্ছে, যেসব চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। এসব সিনেমার সঙ্গে আমার নিজেরই অনেক সময় সম্পর্ক তৈরি করতে অসুবিধা হয়। উত্তমদা আজ থাকলে এসব সিনেমা কীভাবে নিতেন, তা বলা কঠিন।
তার প্রায় সব সিনেমাই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি প্রচুর ইংরেজি সিনেমা দেখতেন, পরে হিন্দি সিনেমাও দেখতেন। সবসময় নিজের অভিনয়ের পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করতেন। নতুন কিছু শিখতেন এবং তা নিজের অভিনয়ে প্রয়োগ করতেন। এভাবেই তিনি উত্তম কুমার হয়ে উঠেছিলেন এবং আজও প্রাসঙ্গিক।
এখন বাংলা সিনেমায় অনেক জনপ্রিয় তারকা আছেন। তাদেরও বিশাল অনুসারী রয়েছে। কিন্তু কেউই উত্তম কুমারের মতো তারকাখ্যাতি অর্জন করতে পারেননি কেন?
এর উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। বর্তমান সময়ের তারকারা সবাই ভালো অভিনেতা। কিন্তু উত্তমের মধ্যে এক ধরনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল, যেটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। আমি বলব, এটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ। তিনি চুম্বকের মতো মানুষকে নিজের দিকে টানতে পারতেন। একদিকে ছিল তার কঠোর পরিশ্রম, অন্যদিকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ।
সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ তাকে নিজের পরিবারের একজন মনে করত। তাকে দেখলে মনে হতো, তিনি হয়তো আমার বন্ধু, ভাই, ছেলে কিংবা স্বামী হতে পারেন। মানুষের সঙ্গে তিনি এমনভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করতেন।
ভবিষ্যতে কি আরেকজন উত্তম কুমার আসবেন?
ভবিষ্যৎ কী নিয়ে আসবে, তা বলা কঠিন। তবে এখন পর্যন্ত বলতে পারি, গত ১০০ বছরের সবচেয়ে বড় অভিনেতা উত্তম কুমার। ফ্রন্টলাইন
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
