উসমান দেম্বেলে: যাঁকে দেখে সবাই বলছেন ‘হে যুবক, বিয়ে করো’

উসমান দেম্বেলে: যাঁকে দেখে সবাই বলছেন ‘হে যুবক, বিয়ে করো’

ফ্রেঞ্চ ফুটবলার ওসমান দেম্বেলের সব ম্যাচে গ্যালারির কোনো এক কোণে নীরবে তাঁর জন্য প্রার্থনা করেন একজন মানুষ—তাঁর স্ত্রী রিমা এদবুশ। বিয়ের পরে বদলে যাওয়া দেম্বেলেকে দেখে সবাই বলছেন ‘হে যুবক, বিয়ে করো’

বিশ্বকাপের গ্যালারিতে হাজারো দর্শকের উল্লাসের মাঝেও একজন মানুষকে খুব সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। তিনি ক্যামেরার সামনে আসেন না, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চান না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজের মুখ খুব কমই দেখান। অথচ মাঠে যখন ফ্রান্সের জার্সিতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে এগিয়ে যান ওসমান দেম্বেলে, গ্যালারির কোনো এক কোণে নীরবে তাঁর জন্য প্রার্থনা করেন একজন মানুষ—তাঁর স্ত্রী রিমা এদবুশ।

হ্যাটট্রিকের পর দেম্বেলে
দেম্বেলের আত্মবিশ্বাসের উৎস তাঁর স্ত্রী রিমা বসে আছেন বিশ্বকাপের গ্যালারিতে

অনেকেই বলেন, দেম্বেলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো পেরিয়ে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার পেছনে রিমার ভালোবাসা, স্থিরতা ও নিঃশর্ত সমর্থন বড় ভূমিকা রেখেছে। খ্যাতির ঝলমলে পৃথিবীতেও তিনি দেম্বেলের কাছে শুধু একজন জীবনসঙ্গী নন, বরং এমন এক আশ্রয়, যেখানে প্রতিটি জয়-পরাজয়ের পর তিনি খুঁজে পান শান্তি, সাহস আর নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। একজন তারকা ফুটবলারের স্ত্রী হয়েও কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত জীবনকে আগলে রেখেছেন রিমা, সেটি সত্যিই আলাদা। বিয়ে নিয়ে এই প্রজন্মের মাঝে অনেক ধরনের নেতিবাচকতা কাজ করে। বিয়ে করতে ভয় পায় অনেকেই সম্পর্কের টানাপোড়েনের আশঙ্কায়। এর মাঝেই রীতিমতো কাপল গোল দিয়ে চলেছেন দেম্বেলে-রিমা। তাঁদেরকে দেখে বিয়ে করতে অনুপ্রেরণা মেলে। দেম্বেলেকে দেখে এই প্রজন্মের সবাইকে মোটিভেশন দিতে বলা যায়, ‘হে যুবক বিয়ে করো।’

বিয়ের পর রিমার বদলে যাওয়া জীবন

২০২১ সালের ডিসেম্বরে ওসমান দেম্বেলের সঙ্গে বিয়ের পর রিমার জীবন অনেকটাই বদলে গেছে। আগে তিনি ছিলেন প্যারিসের একজন চারুকলার শিক্ষার্থী। শিল্প, বই, নান্দনিকতা আর শান্ত জীবনই ছিল তাঁর জগত।

শিল্প, বই, নান্দনিকতা আর শান্ত জীবনই ছিল তাঁর জগত

এরপর হঠাৎই তিনি প্রবেশ করেন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ফুটবল তারকার জীবনে। কিন্তু সেই পরিবর্তন তাঁকে বদলে দেয়নি। আজও তিনি আলোচনার কেন্দ্রে থাকার চেয়ে পরিবারের পাশে থাকাকেই বেশি গুরুত্ব দেন। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ম্যাচ দেখতে যান, কিন্তু কখনোই নিজেকে মিডিয়ার সামনে আনেন না। বরং তাঁর উপস্থিতি যেন নীরব এক আশ্বাস ‘আমি আছি’।

তাঁর উপস্থিতি যেন নীরব এক আশ্বাস ‘আমি আছি’
ম্যাচের আগে মেয়েকে নিয়ে ধীরে-সুস্থে তৈরি হন রিমা

ভোগ সাময়িকীকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রিমা এদবুশ জানালেন, ম্যাচের দিন তাঁর কাছে শুধু ফুটবলের দিন নয়, এটি মানসিক প্রস্তুতিরও একটি দিন। স্টেডিয়ামে যাওয়ার দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে তিনি ধীরেসুস্থে নিজেকে এবং তাঁদের ছোট্ট মেয়েকে প্রস্তুত করেন। চারপাশে যতই বিশ্বকাপের উত্তেজনা থাকুক, তিনি চান ঘরের ভেতরের পরিবেশটা থাকুক শান্ত ও স্বাভাবিক। আর যখন উদ্বেগ ভর করে, তখন তিনি আশ্রয় নেন প্রার্থনায়। তাঁর বিশ্বাস, প্রার্থনাই তাঁকে ভেতর থেকে স্থির করে, অস্থিরতার মাঝেও এনে দেয় এক ধরনের প্রশান্তি। এই ছোট্ট অভ্যাসেই যেন ধরা পড়ে রিমার আসল পরিচয়। তিনি শুধু বিশ্বখ্যাত এক ফুটবলারের স্ত্রী নন; তিনি একজন স্নেহময়ী মা, গভীর বিশ্বাসে আস্থাশীল একজন মানুষ এবং পরিবারের নীরব শক্তি, যাঁর ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থন মাঠের বাইরেও ওসমান দেম্বেলের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।

মজার বিষয় হলো, ছোটবেলায় ফুটবলের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না। যদিও তাঁর বাবা, ভাই ও চাচারা সবাই ফুটবলপ্রেমী ছিলেন, তবুও তিনি এই খেলার প্রেমে পড়েন প্রথমবার স্টেডিয়ামে গিয়ে। হাজারো দর্শকের একসঙ্গে গলা মেলানো, জাতীয় পতাকার ঢেউ, ম্যাচের উত্তেজনা সব মিলিয়ে সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন বদলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি মানুষের আবেগ। রিমা পড়াশোনা করেছেন ফাইন আর্টসে তাই ফ্যাশন তাঁর কাছে ট্রেন্ড নয়, শিল্প।

সুন্দর পোশাক পরে নিজেকে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করেন রিমা
মরোক্কান সংস্কৃতি তাঁকে শিখিয়েছে নারীর সৌন্দর্য মানে শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য নয়

তাঁর কাছে পোশাক শুধু ফ্যাশন নয়, এটি শিল্পেরই একটি ভাষা। তাঁর বয়ানে, ছোটবেলা থেকেই সৌন্দর্যবোধ ও নান্দনিকতার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। তাঁর মা-ও সুন্দর পোশাক পরতে ভালোবাসতেন, যা তাঁর রুচি গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। মরোক্কান সংস্কৃতিও তাঁকে শিখিয়েছে নারীর সৌন্দর্য মানে শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য নয়; বরং পরিমিতি, সৌন্দর্যবোধ এবং আত্মসম্মান।

তাই নিজের স্টাইলকে তিনি তিনটি শব্দে ব্যাখ্যা করেন সংযত, নারীত্বপূর্ণ এবং স্বতঃস্ফূর্ত। আজকের সময়ে যেখানে জনপ্রিয়তার জন্য ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত প্রকাশ করা যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, সেখানে রিমা একেবারেই ব্যতিক্রম।

ইনস্টাগ্রামে তাঁর লাখো অনুসারী থাকলেও সেখানে নেই বিলাসিতার প্রদর্শনী কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের অতিরিক্ত প্রকাশ
তাঁর ইন্সট্রাগ্রাম পোস্টে দেখা যায় এক কাপ কফি কখনো কিছু ফুল,একটি বই,সুন্দর আলো, আর সুন্দর কোন সময়

ইনস্টাগ্রামে তাঁর লাখো অনুসারী থাকলেও সেখানে নেই বিলাসিতার প্রদর্শনী কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের অতিরিক্ত প্রকাশ। তাঁর ইন্সট্রাগ্রাম পোস্টে দেখা যায় এক কাপ কফি কখনো কিছু ফুল,একটি বই,সুন্দর আলো, আর সুন্দর কোন সময়। নিজের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তিনি প্রায়ই নিজের মুখ আড়াল করে ছবি প্রকাশ করেন। এ যেন নিজের পরিচিতিকে নয়, নিজের অনুভূতিকেই প্রকাশ করার এক শিল্প।

রিমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ কোনটি? উত্তর দিতে এক মুহূর্তও ভাবেননি। পিএসজি প্রথমবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার দিন। তিনি বলেন, সেদিন স্টেডিয়ামের আবহ, মানুষের আনন্দ আর ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ তিনি প্যারিসেই বড় হয়েছেন। শহরের ক্লাবের সেই ঐতিহাসিক সাফল্য তাঁর কাছেও ছিল ব্যক্তিগত আবেগের অংশ। কয়েক বছর আগেও ওসমান দেম্বেলের ক্যারিয়ারকে ঘিরে আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিল চোট, অনিয়মিত পারফরম্যান্স এবং মাঠের বাইরে তাঁর জীবনযাপন। প্রতিভা নিয়ে কখনও প্রশ্ন ছিল না, কিন্তু সেই প্রতিভার ধারাবাহিক ব্যবহার নিয়ে ছিল সংশয়।

পিএসজি প্রথমবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার দিনটি রিমার কাছে স্মরণীয়
ট্র্যাডিশনাল বিয়ের পোশাকে দেম্বেলে ও রিমার ড্রিম ওয়েডিং

২০২১ সালের ডিসেম্বরে রিমা এদবুশকে বিয়ে করার পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। কাছের মানুষদের মতে, সংসার, স্ত্রী এবং পরে কন্যাসন্তানের আগমন দেম্বেলের জীবনে নতুন দায়িত্ববোধ এনে দেয়।

দেম্বেলে তিনি হয়ে ওঠেন আরও শান্ত, পরিণত এবং পরিবারকেন্দ্রিক

মাঠের বাইরে তিনি হয়ে ওঠেন আরও শান্ত, পরিণত এবং পরিবারকেন্দ্রিক। রিমা কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চাননি। বরং নীরবে স্বামীর পাশে থেকে, প্রতিটি ম্যাচের আগে তাঁর জন্য প্রার্থনা করে এবং পরিবারের ভারসাম্য ধরে রেখে তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে দেম্বলে পুরো মনোযোগ দিতে পেরেছেন ফুটবলে।

এরপর থেকেই দেম্বেলের খেলায়ও দেখা যায় নতুন আত্মবিশ্বাস। চোট কাটিয়ে তিনি ধীরে ধীরে ফিরে আসেন নিজের সেরা ছন্দে। ক্লাব পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল, শিরোপা জয়ে অবদান এবং জাতীয় দলের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে আবার বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গীর উপস্থিতি যে একজন ক্রীড়াবিদের মানসিক শক্তি বাড়িয়ে দেয়

অবশ্যই এই সাফল্যের কৃতিত্ব শুধু বিয়ে বা পারিবারিক জীবনের নয়। কঠোর পরিশ্রম, চিকিৎসা, কোচদের আস্থা এবং নিজের অধ্যবসায়ই ছিল সবচেয়ে বড় কারণ। তবে জীবনের কঠিন সময়ে একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গীর উপস্থিতি যে একজন ক্রীড়াবিদের মানসিক শক্তি বাড়িয়ে দেয়, রিমা ও উসমান দেম্বেলের গল্প তারই একটি সুন্দর উদাহরণ।

ভালোবাসা মানে সব সময় সামনে থাকা নয় তারকা ফুটবলারদের জীবন নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কিন্তু রিমা এদবুশ দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন ফুটবলারের জীবনসঙ্গী হওয়ার অর্থ শুধু আলো, ক্যামেরা আর খ্যাতির অংশ হওয়া নয়। ভালোবাসা অনেক সময় গ্যালারির নীরবে বসে প্রার্থনায় থাকে কিংবা সন্তানের হাত ধরে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করার মধ্যেও থাকে। আর থাকে এমন এক সমর্থনে, যা ক্যামেরায় ধরা না পড়লেও একজন খেলোয়াড়কে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করে তোলে।

আলো থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থেকেও দেম্বেলের নির্ভরযোগ্য শক্তি হয়ে আছেন রিমা

উসমান দেম্বেলে গোল করেন, দর্শক করতালি দেন, সংবাদমাধ্যম তাঁর সাফল্যের গল্প লেখে। কিন্তু সেই গল্পের নেপথ্যে একজন মানুষ আছেন, যিনি আলো থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থেকেও তাঁর জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তি হয়ে আছেন। হয়তো এ কারণেই রিমা এদবুশের গল্প শুধু একজন ফুটবলারের স্ত্রীর গল্প নয়; এটি ভালোবাসা, সংযম, আত্মপরিচয় এবং নীরব শক্তির এক অনন্য গল্প।

সূত্র: ভোগ, ইয়াহু স্পোর্টস, ইনসাইড ফিফা

ছবি: ইন্সটাগ্রাম