এই নগরীর ইতিহাস জানতে ১৫০ বছর ধরে খননকাজ চলছে, লাগবে আরও ১৫০ বছর

এই নগরীর ইতিহাস জানতে ১৫০ বছর ধরে খননকাজ চলছে, লাগবে আরও ১৫০ বছর

চানাক্কেলে শহরের মাঝখানে বা সিটি সেন্টারে রয়েছে ট্রয়ের সেই বিখ্যাত ঘোড়ার একটি রেপ্লিকা। গ্রিস-ট্রয়ের যুদ্ধ নিয়ে ব্র্যাড পিট অভিনীত চলচ্চিত্র ট্রয়-এ ব্যবহারের জন্য এই ঘোড়াটি নির্মিত হয়েছিল। সাড়ে ১২ মিটার উঁচু, প্রায় ১২ টন ওজনের স্টিলের তৈরি এই বিশাল ঘোড়া পরে তুরস্ক সরকারকে দিয়ে দেয় ওয়ার্নার ব্রাদার্স। আসল ট্রয় নগরে ঢোকার আগে পর্যটকেরা আগে এই ঘোড়ার সঙ্গে ছবি তুলে নেন। ঘোড়াটার পাশেই প্রাচীন ট্রয়ের একটি সম্ভাব্য নকশা, কীভাবে এই নগরী বহিঃশত্রুদের হাত থেকে নিজেদের সুরক্ষা করত, এই নকশা দেখলে কিছুটা বোঝা যায়। এমনই দুর্ভেদ্য নগরী ছিল ট্রয় যে গ্রিকরা ৯ বছর চেষ্টা করেও নগরীতে প্রবেশ করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত এই বিশাল ঘোড়াটিকে দেবী অ্যাথেনার আশীর্বাদ হিসেবে উপঢৌকন পাঠানো হয় ট্রয়কে, তার আগে শত শত গ্রিক জাহাজ ইজিয়ান সাগর ছেড়ে চলে যায়, যেন যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেছে। যুদ্ধ জেতার আনন্দে ঘোড়াটাকে ভেতরে নিয়ে যায় ট্রয়বাসী। তারপর সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, ঘোড়ার পেট থেকে একে একে বেরিয়ে আসে গ্রিকরা, নগরদ্বার খুলে দেয়, যা দিয়ে প্রবেশ করে ফিরে আসা জাহাজের সব সশস্ত্র সৈন্য। আর নৃশংসভাবে তারা হত্যা করে ট্রয়ের রাজা-রানিসহ সবাইকে, আগুনে পুড়িয়ে দেয় এই অনিন্দ্যসুন্দর নগরীকে। ঘোড়ার মূর্তি থেকে আধঘণ্টা দক্ষিণে গেলেই সত্যিকারের ট্রয় নগরী।

প্রত্নতত্ত্ববিদ হেনরিখ শেইলম্যান খননকাজের সময় বুঝতে পেরেছিলেন যে এখানে কেবল একটি নয়, আছে প্রায় ৯টি ট্রয়। মানে এই নগরী বহুবার আক্রান্ত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে, কখনো শত্রুদের দ্বারা, কখনো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, তারপর আবার পুনর্নির্মিত হয়েছে। ট্রয়ের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হতে এ ধারণার প্রমাণ মেলে। একেবারে ওপরে বা বাইরের দিকে যে পাথরের নির্মিত দেয়াল বা বাড়িঘরের অবশিষ্ট দেখা যাবে, তা আসলে নবম ট্রয়ের। এটি রোমানদের তৈরি। কারণ, রোমানদের ঐতিহ্যবাহী আগোরা, থিয়েটার এবং পাবলিক বিল্ডিংয়ের অবশিষ্ট দেখা যাবে এখানে। এই অংশটুকু, ইতিহাসবিদদের ধারণা, ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তৈরি। তবে যতই ভেতর দিকে যাবেন, স্তরের পর স্তর আবিষ্কৃত হতে থাকবে। এ যেন বৃত্তের বাইরে আরেকটা বৃত্ত, তার বাইরে আরেকটা বৃত্ত। একেবারে ভেতরের স্তরটি হলো প্রাচীন ট্রয়। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় যে এখানকার লাইম স্টোনের তৈরি দেয়াল এবং চারকোনা ঘরের ধ্বংসস্তূপগুলো খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার বছরের পুরোনো। মানে ব্রোঞ্জ সভ্যতার শেষ দিককার কথা। কথিত আছে যে গালপিনার ও কুমতেপে এলাকার কিছু মানুষ এখানে এসে প্রথম বসত গড়ে। প্রথম ট্রয় দুর্ঘটনাবশত আগুনে পুড়ে গেলে এখানকার অধিবাসীরা আরও আধুনিক ও আরও বৃহদাকারে তাদের নগরী গড়ে তোলে, যাকে বলা হয় দ্বিতীয় ট্রয়। অচিরেই এটি হয়ে ওঠে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনস্থল। আনাতোলিয়া ও মেডিটেরিনিয়ান সভ্যতার ঠিক সংযোগস্থলে অবস্থিত এই নগরে খ্রিষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে যে বিশালাকার পাথরের দেয়াল, সামাজিক অনুষ্ঠান পালনের বিরাট চত্বর, ম্যাজারোন আকৃতির ঘরবাড়ি, বিরাট প্রতিরক্ষা দরজা বা গেটের অবশিষ্টের দেখা মেলে তা সত্যি আশ্চর্য করে। ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া নিদর্শন প্রমাণ করে, সেই সময়ও ট্রোজানরা পটারির কাজ করত। পটারিশিল্পে ব্যবহার করার জন্য অ্যাম্বার রং আসত বাল্টিক এলাকা থেকে, ভারত থেকে আসত লাল খনিজ কার্নেলিয়ন আর আফগানিস্তান থেকে আসত ল্যাপিস। সুপ্রাচীন এই জাতি যে ধনী, শৌখিন ও সৌন্দর্যপ্রিয় ছিল, তা এখানকার নিদর্শনগুলো থেকে বোঝা যায়।