কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী | চ্যানেল আই অনলাইন

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী | চ্যানেল আই অনলাইন

রোববার (১৯ জুলাই) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার সৃষ্টি আজও সমানভাবে পাঠক, দর্শক ও অনুরাগীদের হৃদয়ে বেঁচে আছে।

এবারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে বিভিন্ন স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে হুমায়ুন আহমেদের জন্মস্থান নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভক্ত, পাঠক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে।

এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। এর মধ্যে চ্যানেল আইয়ে হুমায়ূন আহমেদের গান, নাটক এবং তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারের সূচি রাখা হয়েছে।

হুমায়ুন আহমেদের প্রয়ান দিবস উপলক্ষে চ্যানেল আই আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রোববার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ‘গান দিয়ে শুরু’র বিশেষ পর্ব প্রচার করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে হুমায়ূন আহমেদ-এর গানের বিশেষ পরিবেশনা ছিল। দুপুর ১টা ৫ এ ‘এবং সিনেমার গান’ অনুষ্ঠানেও হুমায়ূন আহমেদের গানের বিশেষ পরিবেশনা থাকবে। বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে ইফতেখার মুনিমের প্রযোজনায় হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও উপন্যাসের জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর অংশগ্রহণে থাকছে বিশেষ বিতর্ক অনুষ্ঠান ‘প্রয়াণের একযুগ পর আমরা’।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তার ডাকনাম ছিল কাজল। জন্মের সময় তার নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান। পরে বাবা ফয়জুর রহমান আহমদ নাম পরিবর্তন করে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। পরবর্তীতে এই নামেই তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।

তার বাবা ফয়জুর রহমান আহমদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দায়িত্ব পালনকালে তিনি শহীদ হন। সাহিত্যচর্চার প্রতি বাবার আগ্রহ পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করেছিল। অন্যদিকে মা আয়েশা ফয়েজও পরবর্তী সময়ে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবন যে রকম’ রচনা করেন। পরিবারে সাহিত্যচর্চার এই আবহেই বেড়ে ওঠেন হুমায়ূন আহমেদ। তার ছোট দুই ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীবও নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতিমান লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। তবে সাহিত্য ও চলচ্চিত্র নির্মাণে পুরোপুরি মনোনিবেশ করার জন্য একসময় অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে দেন। লেখালেখির পাশাপাশি নাটক, চলচ্চিত্র ও গান-সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র সৃজনশীলতার স্বাক্ষর।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’-ই তাকে পাঠকমহলে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় উপন্যাস, ছোটগল্প ও নাটক রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দেয়াল’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘কবি’, ‘লীলাবতী’সহ অসংখ্য গ্রন্থ এখনও সমান জনপ্রিয়।

তার সৃষ্ট চরিত্র হিমু, মিসির আলী এবং শুভ্র বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে পরিচিত কাল্পনিক চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠকের কাছে এই চরিত্রগুলো কেবল গল্পের অংশ নয়, বরং একেকটি জীবনদর্শনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

টেলিভিশন নাটকেও হুমায়ূন আহমেদের অবদান অসামান্য। আশির দশকে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ তাকে নাট্যকার হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। পরে ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’সহ একাধিক নাটক দর্শকমনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।

চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও তিনি সফল ছিলেন। তার পরিচালিত ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ এবং ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ বাংলা চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হুমায়ূন আহমেদ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার এবং হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।

মৃত্যুর ১৪ বছর পরও হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের আবেদন এতটুকু কমেনি। নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছেও তিনি সমান জনপ্রিয়। তার সৃষ্টি, চরিত্র এবং গল্প বলার সহজ অথচ গভীর ভাষাশৈলী বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তাকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।