কানাডার জনসংখ্যা ১০ কোটি করা কি সম্ভব? – DesheBideshe

কানাডার জনসংখ্যা ১০ কোটি করা কি সম্ভব? – DesheBideshe


কানাডায় একসময় জনসংখ্যা বাড়ত দুই পথে। দেশের ভেতরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা মৃত্যুর চেয়ে বেশি ছিল, পাশাপাশি বিদেশ থেকে আসতেন নতুন অভিবাসীরা। এখন সেই সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধান এতটাই কমে এসেছে যে কোনো কোনো সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা জন্মকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভার ক্রমেই গিয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ওপর।

স্ট্যাটিসটিকস কানাডার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ তা ৪ কোটি ১৩ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এক দশকের কম সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে ৫৫ লাখের বেশি। এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে স্থায়ী অভিবাসী, অস্থায়ী বিদেশি কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, আশ্রয়প্রার্থী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাব সাধারণত দুটি ভাগে দেখা হয়। প্রথমটি স্বাভাবিক বৃদ্ধি, অর্থাৎ জন্ম ও মৃত্যুর সংখ্যার ব্যবধান। দ্বিতীয়টি আন্তর্জাতিক অভিবাসন, যার মধ্যে স্থায়ী অভিবাসীর পাশাপাশি অস্থায়ী বাসিন্দাদের আসা-যাওয়াও অন্তর্ভুক্ত।

২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কানাডায় জন্মের সংখ্যা মৃত্যুর চেয়ে বেশি ছিল। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে স্বাভাবিক বৃদ্ধিরও ভূমিকা ছিল। কিন্তু সে সময়ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন দ্রুত প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছিল। ২০১৯ সালে কানাডার মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রায় চার-পঞ্চমাংশই এসেছিল আন্তর্জাতিক অভিবাসনের মাধ্যমে।

২০২৩ সালে কানাডার জনসংখ্যায় প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ যুক্ত হন। এক বছরে ৩ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধির এই হার ছিল ১৯৫৭ সালের পর সর্বোচ্চ। ওই বৃদ্ধির ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশই এসেছিল আন্তর্জাতিক অভিবাসন থেকে। জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধান থেকে এসেছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন নতুন মানুষের মধ্যে প্রায় ৯৮ জনই যোগ হয়েছিলেন অভিবাসনের মাধ্যমে।

২০২৪ সালেও একই ধারা অব্যাহত ছিল, যদিও বছরের শেষদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমতে শুরু করে। সে বছর কানাডায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৩৭টি শিশুর জন্ম হয়। আগের বছরের তুলনায় জন্ম কিছুটা বাড়লেও প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় জন্ম-মৃত্যুর ব্যবধান খুব বেশি বাড়েনি।

এর পেছনে বড় কারণ কানাডার নিম্ন জন্মহার। কোনো দেশের জনসংখ্যা দীর্ঘ মেয়াদে একই অবস্থানে রাখতে সাধারণত নারীপ্রতি গড়ে প্রায় ২ দশমিক ১টি সন্তান প্রয়োজন। অথচ ২০২৪ সালে কানাডায় এই হার নেমে আসে নারীপ্রতি ১ দশমিক ২৫ সন্তানে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বর্তমান জনসংখ্যা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় হারের তুলনায় এটি অনেক কম।

কম সন্তান জন্ম নেওয়ার পাশাপাশি কানাডায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধান কমতে কমতে কোনো কোনো সময়ে মৃত্যুর সংখ্যাই জন্মকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে কানাডায় যত শিশু জন্ম নেয়, তার চেয়ে ৫ হাজার ৬২৮ জন বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ শুধু জন্ম ও মৃত্যুর হিসাব ধরলে ওই সময়ে দেশের জনসংখ্যা কমেছে। এরপরও মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার বেড়েছিল। এই বৃদ্ধি এসেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের মাধ্যমে।

তবে ২০২৫ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি দ্রুত কমে যায়। অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা কমাতে অটোয়ার নেওয়া পদক্ষেপই ছিল এর প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টাডি পারমিট সীমিত করা, অস্থায়ী বিদেশি কর্মী কর্মসূচিতে কড়াকড়ি এবং অভিবাসন লক্ষ্যমাত্রা কমানোর প্রভাব জনসংখ্যার হিসাবেও পড়তে শুরু করে।

এখানে স্থায়ী অভিবাসী ও অস্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়ী অভিবাসীরা দীর্ঘ মেয়াদে কানাডায় বসবাসের অধিকার নিয়ে আসেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী ও আশ্রয়প্রার্থীদের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশে থাকেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে অস্থায়ী বাসিন্দাদের বড় ভূমিকা ছিল। তাঁদের সংখ্যা কমতে শুরু করায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিও কমেছে।

এই পরিস্থিতিতেই সামনে আসে ২১০০ সালের মধ্যে কানাডার জনসংখ্যা ১০ কোটিতে নিয়ে যাওয়ার আলোচনা। তবে এটি কানাডা সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য নয়। প্রস্তাবটি দিয়েছে ‘সেঞ্চুরি ইনিশিয়েটিভ’ নামের একটি বেসরকারি ও নির্দলীয় সংগঠন। তাদের যুক্তি, বড় জনসংখ্যা কানাডার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে, শ্রমবাজারে নতুন কর্মী যোগ করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির প্রভাব ধরে রাখতে সাহায্য করবে। সংগঠনটির হিসাবে, বর্তমান ধারা চললে শতাব্দীর শেষে কানাডার জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাবে, যা তাদের প্রস্তাবিত লক্ষ্যের প্রায় অর্ধেক।

বর্তমান জনসংখ্যা ১০ কোটিতে নিতে হলে আগামী প্রায় ৭৫ বছরে আরও প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ যুক্ত করতে হবে। জন্মহার বর্তমান অবস্থায় থাকলে শুধু দেশের ভেতরে জন্ম নেওয়া মানুষের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য বহু দশক ধরে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী গ্রহণ করতে হবে। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

তবে শুধু কত মানুষ আনা হবে, সেই হিসাব দিয়ে জনসংখ্যা নীতি নির্ধারণ করা যায় না। তাঁদের জন্য বাড়ি, হাসপাতাল, চিকিৎসক, বিদ্যালয়, গণপরিবহন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে হবে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সময় আবাসন সংকট তীব্র হয়, বাড়িভাড়া বাড়ে এবং স্বাস্থ্যসেবা ও নগর অবকাঠামোর ওপর চাপ পড়ে।

আবার অভিবাসন খুব বেশি কমিয়ে দিলেও শ্রমবাজারে সমস্যা তৈরি হতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে কানাডা অভিবাসী শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে প্রবীণ মানুষের পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখতে পর্যাপ্ত কর্মক্ষম ও করদাতা মানুষের প্রয়োজন।

কানাডার সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু অভিবাসন বাড়ানো বা কমানোর নয়। আসল প্রশ্ন হলো, দেশের আবাসন, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের সামর্থ্যের সঙ্গে মিল রেখে কত মানুষকে গ্রহণ করা সম্ভব এবং তাঁদের কীভাবে সফলভাবে সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা যায়।

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি এখন অভিবাসন। ভবিষ্যতে দেশটির জনসংখ্যা কত হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এ বিষয়ে সরকারের নীতির ওপর। আর ২১০০ সালের মধ্যে ১০ কোটি মানুষের কানাডা গড়তে হলে অভিবাসনই হবে প্রধান পথ।

তথ্যসূত্র:
Statistics Canada
Century Initiative