ম্যান্ডেলার এ বক্তৃতার পটভূমি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে অন্ধকার সময়। শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য (যা পরবর্তীকালে ‘আপার্টহেইড’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়) কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকারকে অস্বীকার করেছিল। জমি, শিক্ষা, ভোটাধিকার, চলাচল, কর্মসংস্থান এমনকি বসবাসের অধিকারও বর্ণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। মানুষের জন্মই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিত। রাষ্ট্রের আইন, আদালত, পুলিশ, প্রশাসন—সবকিছুই ছিল সেই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার রক্ষাকবচ।
ম্যান্ডেলা তাঁর বক্তৃতায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে ১৯১২ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকে আফ্রিকার মানুষ বারবার শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানিয়েছে। তারা সভা করেছে, আবেদন করেছে, প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে, যুক্তি দিয়েছে। কিন্তু শাসকের উত্তর ছিল আরও দমন-পীড়ন, আরও বৈষম্য এবং আরও নিষ্ঠুর আইন। এ অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ডিফায়েন্স ক্যাম্পেইন—অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন।
ম্যান্ডেলা অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন, কীভাবে মাত্র তেত্রিশজন স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কারখানার শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ছাত্র, ধর্মযাজক, নারী-পুরুষ, কৃষ্ণাঙ্গ, ভারতীয়, বর্ণমিশ্র জনগোষ্ঠী এমনকি কিছু বিবেকবান শ্বেতাঙ্গও সেই আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা জেনেশুনে অন্যায় আইন ভেঙেছিলেন, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে অন্যায় আইন মানা নৈতিক কর্তব্য নয়।
এ অভিজ্ঞতা ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল নেতাদের সংগ্রাম নয়; এটি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই শক্তিশালী হয়। তাঁর ভাষণে তাই বারবার ফিরে আসে জনগণের সংগঠন, রাজনৈতিক শিক্ষা ও ঐক্যের প্রশ্ন। তিনি বলেন, আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি বক্তৃতায় নয়, মানুষের সংগঠিত চেতনায়।
তবে এ সংগ্রাম সহজ ছিল না। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নির্মম। আন্দোলনের হাজারো কর্মী গ্রেপ্তার হন, চাকরি হারান, কারাবরণ করেন। সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করা হয়, আইন অমান্য করাকে আরও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করা হয়। জননিরাপত্তা আইন, ফৌজদারি আইন সংশোধনী আইন ও কমিউনিজম দমন আইন ব্যবহার করে সরকার কার্যত রাজনৈতিক বিরোধিতার সব পথ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল।
কিন্তু এখানেই ম্যান্ডেলার নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে সংগ্রামকে আত্মঘাতী পথে নিয়ে যেতে চাননি। বক্তৃতায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রাজনৈতিক আন্দোলনকে অবশ্যই বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়। কেবল দীর্ঘ বক্তৃতা, উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ কিংবা আবেগঘন স্লোগান দিয়ে গণ–আন্দোলন পরিচালনা করা যায় না। নতুন পরিস্থিতিতে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হয়, সংগঠনকে পুনর্গঠন করতে হয় এবং জনগণকে আরও দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে হয়। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সমসাময়িক বহু নেতার থেকে আলাদা করেছে।
এ বক্তৃতা পড়লে বোঝা যায়, ম্যান্ডেলা কেবল প্রতিবাদী নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সংগঠক। তিনি বুঝেছিলেন, কোনো আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। তাই মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে, সংগঠনকে টিকিয়ে রেখে, ধাপে ধাপে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর কৌশল। তিনি জানতেন, সাময়িক আবেগ বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে কেবল সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি।
নেলসন ম্যান্ডেলার এ রাজনৈতিক পরিণতির পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাও গভীরভাবে কাজ করেছিল। ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার এমভেজো গ্রামে থেম্বু রাজবংশের এক পরিবারে তাঁর জন্ম। ম্যান্ডেলার জন্মনাম ছিল রোলিহ্লাহ্লা—খোসা ভাষায় যার অর্থ, ‘গাছের ডাল নাড়ানো’, অর্থাৎ প্রচলিত নিয়মে আলোড়ন তোলা মানুষ। বিদ্যালয়ে তাঁর ইংরেজ শিক্ষিকা তাঁকে ‘নেলসন’ নাম দেন, যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে।
শৈশবেই নেলসন প্রত্যক্ষ করেন উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বাস্তবতা। ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বহিষ্কৃত হন। পরে জোহানেসবার্গে এসে নানা ধরনের কাজ করতে করতে আইন অধ্যয়ন শুরু করেন। এখানেই তাঁর পরিচয় হয় ওয়াল্টার সিসুলু, অলিভার ট্যাম্বো এবং আরও অনেক রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে। তাঁদের সান্নিধ্য তাঁর রাজনৈতিক চেতনাকে সুসংহত করে। ১৯৪৪ সালে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুবলীগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুবলীগের লক্ষ্য ছিল, কেবল আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি নয়; বরং জনগণকে সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ন্যাশনাল পার্টি ক্ষমতায় এসে আনুষ্ঠানিকভাবে আপার্টহেইড নীতি কার্যকর করলে ম্যান্ডেলা উপলব্ধি করেন, সামনে অপেক্ষা করছে দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম। কিন্তু তিনি কখনো জনগণকে অবাস্তব আশ্বাস দেননি। বরং তিনি তাঁদের প্রস্তুত করেছিলেন এমন পথের জন্য, যেখানে বিজয়ের চেয়ে ধৈর্য, সাহস ও সংগঠনের প্রয়োজন অনেক বেশি।




