কেন রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে | চ্যানেল আই অনলাইন

কেন রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে | চ্যানেল আই অনলাইন

ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থ পরিশোধে জটিলতা তৈরি হওয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, রেমিট্যান্স এবং উন্নয়ন সহযোগিতা ব্যাহত হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে কর্মরত প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের জন্য নেওয়া রুশ ঋণের কিস্তি পরিশোধও আটকে আছে।

কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়া-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনে বিশেষ ছাড় চেয়ে বাংলাদেশ ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়া নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে ঢাকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত এসবার ব্যাংকের একটি শাখা খোলার প্রস্তাবও রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৬৩৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে ২৫৭ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সময়ে রাশিয়া থেকে আমদানি বেড়ে ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ গম ও সার আমদানির অর্থ পরিশোধেও সমস্যায় পড়ছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা রপ্তানির অর্থ দেশে আনতে পারছেন না।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ২০২৪ সালের শুরু থেকে পাঠানো চালানের বিপরীতে অন্তত ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার এখনো বকেয়া রয়েছে। তাঁর মতে, রাশিয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

কর্মকর্তাদের ধারণা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ায় কর্মরত প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দেশে অর্থ পাঠাতে পারছেন না।

সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মস্কো সফরে আগামী এক বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কর্মকর্তাদের মতে, অর্থ লেনদেনের সমস্যার সমাধান ছাড়া এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন।

১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে রাশিয়া।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ব্যাংকগুলো সুইফট ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ডলারে ঋণের কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হচ্ছে না। ২০২২ সালের পর থেকে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি এসক্রো অ্যাকাউন্টে জমা থাকলেও তা রাশিয়ায় পাঠানো যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, রাশিয়া ভারতীয় রুপিতে ঋণ নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে, তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তিনি জানান, বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে এসক্রো অ্যাকাউন্টে কিস্তির অর্থ জমা দিচ্ছে।

২০২২ সালের পর দুই দেশ বিভিন্ন অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি বিবেচনা করলেও কোনোটি কার্যকর হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে এসবার ব্যাংকের একটি শাখা চালুর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন সহজ করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা এখন পণ্যের চাহিদা নয়, বরং অর্থ পরিশোধের সংকট। এই জটিলতার সমাধান না হলে রপ্তানি, শ্রমবাজার এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্প সব ক্ষেত্রেই চাপ অব্যাহত থাকবে।