
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তি, জীবনযাপন কিংবা চিন্তাভাবনায় মানুষ যোজন যোজন এগিয়ে গেছে, কিন্তু নারীর শরীর নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কতটা পরিবর্তন হয়েছে? সেই প্রশ্নই আবার সামনে এনে দিয়েছে বলিউড অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফকে ঘিরে হওয়া সাম্প্রতিক বিতর্ক।
সন্তান জন্মের পর শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে অনলাইনে ট্রলের শিকার হয়েছেন ক্যাটরিনা। আর এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর আগেও ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, কারিনা কাপুর খান, বিপাশা বসু, স্বরা ভাস্কর, সামিরা রেড্ডিসহ বলিউডের একাধিক অভিনেত্রীকে সন্তান জন্মের পর ওজন ও শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছে।
ক্যাটরিনা ও ভিকি কৌশল ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর প্রথম সন্তানের বাবা-মা হন। সন্তান জন্মের পর বেশ কিছুদিন জনসমক্ষে দেখা যায়নি ক্যাটরিনাকে। আগস্টের শেষ দিকে নির্মাতা কুকু কোহলির শেষকৃত্যে ভিকির সঙ্গে প্রথমবার প্রকাশ্যে দেখা যায় তাকে। তখন থেকেই তার চেহারা ও ওজন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য শুরু হয়।
তবে সম্প্রতি গণেশ চতুর্থীর অনুষ্ঠানে মুম্বাইয়ে ভিকির সঙ্গে ক্যাটরিনার উপস্থিতির পর সেই আলোচনা আরও তীব্র হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার ছবি ও ভিডিও। কেউ কেউ তার আগের ও বর্তমান চেহারার ছবি পাশাপাশি রেখে তুলনা শুরু করেন। চলে শরীর ও ওজন নিয়ে নানা কটূক্তি।
অন্যদিকে, ক্যাটরিনার পাশে দাঁড়ান ভক্ত, সহকর্মী ও বিভিন্ন কনটেন্ট নির্মাতা। তাদের বক্তব্য- সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শরীরে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। অথচ তারকা হলেই যেন সেই স্বাভাবিকতার অধিকারটুকুও থাকে না। অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা থাকে, সন্তান জন্মের পরও তারা আগের চেহারায় থাকবেন!
বলিউডের অন্যতম আলোচিত অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনও এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০১১ সালের নভেম্বরে মেয়ে আরাধ্যাকে জন্ম দেওয়ার পর তার ওজন বেড়ে যায়। এরপরই শুরু হয় সমালোচনা ও বডি শেমিং।
সাবেক বিশ্বসুন্দরী হওয়ার কারণে ঐশ্বরিয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যাশাটা যেন আরও বেশি ছিল। তার পুরোনো ছবির সঙ্গে সন্তান জন্মের পরের ছবি মিলিয়ে দেখতে শুরু করেন অনেকে। একজন সদ্য মা হওয়া নারীর শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনকে বোঝার বদলে তাকে দ্রুত আগের চেহারায় ফেরার চাপ দেওয়া হয়!
ঐশ্বরিয়া অবশ্য বিষয়টি নিয়ে বারবার স্বাভাবিকতার কথাই বলেছেন। সন্তান জন্মের পর ওজন বাড়া বা শরীরে পানি জমা স্বাভাবিক বিষয়- এমনটাই তুলে ধরেছেন তিনি। সেই সময় তার কাছে নিজের শরীরের চেয়ে মেয়ের যত্নই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমালোচনা থামেনি। বিমানবন্দর থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসব- বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে এলেই তার চেহারা নিয়ে মন্তব্য করতে দেখা গেছে নেটিজেনদের।
বিপাশা বসুও মাতৃত্বের পর শরীর নিয়ে একই ধরনের সামাজিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে মেয়ে দেবির জন্ম দেন তিনি। সন্তান জন্মের পর তোলা তার বিভিন্ন ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ করা হয়। বিশেষ করে ৪০-এর কোঠায় থাকা একজন নারীর শরীরকে কেন ২০-এর দশকের মতো দেখতে হবে- এই প্রশ্নই সামনে এনেছেন বিপাশা।
ফটোগ্রাফারদের তোলা অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রস্তুত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং সেগুলো নিয়ে মন্তব্য করা- এসব নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। বিপাশার মতে, সমস্যাটা তার শরীরে নয়; বরং সমাজের তৈরি করা অবাস্তব সৌন্দর্য-ধারণায়।
মাতৃত্বের পর শরীর নিয়ে ট্রলের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে কারিনা কাপুর খানেরও। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রথম সন্তান তৈমুরের জন্মের সময় প্রায় ১৮ কেজি ওজন বেড়েছিল তার। এরপর তার পা, উরু ও শরীরের গড়ন নিয়ে শুরু হয় আলোচনা।
দ্বিতীয় সন্তান জেহর জন্মের পরও একই ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালে সন্তান জন্মের মাত্র কয়েক মাস পরই ল্যাকমে ফ্যাশন উইকের র্যাম্পে হাঁটেন কারিনা। কিন্তু সেখানেও তার শরীরের পরিবর্তনই হয়ে ওঠে আলোচনার বিষয়।
পরবর্তী সময়ে কারিনা নিজেই জানিয়েছেন, সন্তান জন্মের পর আবার ওজন কমানোর চাপ কতটা প্রবল ছিল। তবে নিজের শরীরের পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন তিনি।
সন্তান জন্মের পর বডি শেমিংয়ের শিকার হওয়া অভিনেত্রীর তালিকা এখানেই শেষ নয়। স্বরা ভাস্করও ২০২৩ সালে মেয়ে রাবিয়াকে জন্ম দেওয়ার পর শরীর ও চেহারা নিয়ে অনলাইনে নানা কটূক্তির মুখে পড়েন।
সামিরা রেড্ডি বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন, সন্তান জন্মের পর ওজন নিয়ে ক্রমাগত মন্তব্য তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। প্রথম সন্তানের জন্মের পর তার ওজন ৭২ কেজি থেকে বেড়ে ১০৫ কেজি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। সেই সময় নিজের আগের ‘গ্ল্যামারাস’ চেহারা হারানো নিয়ে নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাকে।
অভিনেত্রী ও প্রযোজক পত্রলেখাও সন্তান জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই শরীর নিয়ে কটাক্ষের মুখে পড়েছিলেন। তবে তিনিও সমালোচনার জবাব দিয়েছেন।
ক্যাটরিনা কাইফকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর ওজন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যের ঘটনা নয়। এর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে তারকা নারীদের প্রতি সমাজের দ্বৈত প্রত্যাশা।
একজন নারীর শরীর গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মের আগে-পরে ব্যাপকভাবে বদলে যেতে পারে। সেই পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে যেন দ্রুত ‘বাউন্স ব্যাক’ করার অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়েছে! তাদের মা হওয়ার পরিচয়ের চেয়েও অনেক সময় চেহারা ও গ্ল্যামারকে বড় করে দেখা হয়। এনডিটিভি
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
