
ছবি: সংগৃহীত
ঘুষমুক্ত পুলিশ, নিরপেক্ষ তদন্ত, ডিজিটাল নজরদারি ও অভিযোগকারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীরা এমনিতেই পালানোর পথ খুঁজবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য নতুন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না। তার বক্তব্যে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা, অপরাধ দমনে কঠোরতা এবং বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অপরাধ দমনের জন্য পুলিশের হাতে আরও কঠোর ব্যবস্থা তুলে দেওয়াই কি প্রধান সমাধান, নাকি পুলিশের বিদ্যমান ক্ষমতার স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি?
আইজিপি মহোদয়ের প্রতি বিনীত অনুরোধ, ক্রসফায়ার নয়, পুলিশের তদন্তব্যবস্থার সংস্কার, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ, অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং তদন্ত প্রতিবেদনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করুন। আইনানুগ তদন্ত ও অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তার রেহাই পাওয়া কঠিন হবে। অপরাধীকে গ্রেপ্তার, বিচারের মুখোমুখি করা এবং আদালতের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার সক্ষমতাই হোক পুলিশের প্রকৃত শক্তির পরিচয়।
ক্রসফায়ারের হুমকি নয়, আইনের শাসনের নিশ্চয়তা চাই
একটি সভ্য রাষ্ট্রে অপরাধ দমনের দায়িত্ব পুলিশের, আর অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। পুলিশ অপরাধী শনাক্ত করবে, নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করবে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করবে এবং আইন অনুযায়ী আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে অপরাধের বিচার করবেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই আইনের শাসনের ভিত্তি।
ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অপরাধ দমনের কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা বিপজ্জনক। এতে তাৎক্ষণিক কঠোরতার বার্তা দেওয়া সম্ভব হলেও নিরপরাধ ব্যক্তির জীবন, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন সামনে আসে। অপরাধী সন্দেহে কাউকে হত্যা করা আর আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধী সাব্যস্ত করা এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয়, আইনানুযায়ী আচরণ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে বিচার ও দণ্ড সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা রয়েছে। অতএব, সরকারের অনুমতি থাকলেও কোনো পদক্ষেপ সংবিধান ও প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমোদন নয়, বরং আইনসম্মত গ্রেপ্তার, তদন্ত, বিচার ও শাস্তির নিশ্চয়তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা দিতে হবে। তবে ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অপরাধ দমনে সাহসী হবেন, তাকে সুরক্ষা দিতে হবে; আর যে সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন, তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ঘুষ বন্ধ হলে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় সংকুচিত হবে
অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে পুলিশের আন্তরিকতা ও দক্ষতার পাশাপাশি একটি বড় প্রশ্ন হলো অপরাধী কি অর্থ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব খাটিয়ে আইনের হাত থেকে রেহাই পেতে পারে? কোনো অপরাধী যদি ঘুষের বিনিময়ে তদন্ত থেকে সুবিধা পায়, অভিযোগের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ আড়াল করা হয় কিংবা নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হয়, তাহলে কঠোর বক্তব্য দিয়েও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

পুলিশের সব সদস্যকে একইভাবে অভিযুক্ত করা ন্যায়সংগত নয়। দায়িত্বশীল ও সৎ পুলিশ সদস্যদের অবদান স্বীকার করেই বলতে হয়, বাহিনীর ভেতরে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। থানায় অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে অনিয়ম প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির অনুরোধে অপরাধের তদন্তের গতিপথ পরিবর্তন করা যাবে না। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় তার অপরাধের দায় থেকে মুক্তির সনদ হতে পারে না। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোও চলবে না।
পুলিশের কাছে আমার অনুরোধ, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করুন; দলীয় পরিচয়ে নয়। অভিযোগকারী কোন দলের, অভিযুক্ত কোন দলের, কে কত ক্ষমতাবান কিংবা কার সঙ্গে কার সম্পর্ক এসব নয়, তদন্তের ভিত্তি হোক তথ্য-প্রমাণ। কোনো নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি তদন্তে বেআইনি হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে তার নথিভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।
এভাবে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়, আর্থিক লেনদেন কিংবা প্রভাব খাটিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ কম পাবে। তখন অপরাধীরা সত্যিকার অর্থেই আইনের ভয়ে সতর্ক থাকবে।
সাধারণ ডায়েরি ও অভিযোগের তদন্তে স্বচ্ছতা চাই
পুলিশি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাধারণ ডায়েরি (জিডি), লিখিত অভিযোগ, এজাহার এবং বিভিন্ন ধরনের অনুসন্ধান ও তদন্ত। একজন নাগরিক কোনো ঘটনা সম্পর্কে থানায় অভিযোগ জানালে তিনি প্রত্যাশা করেন, পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
কিন্তু অভিযোগ গ্রহণের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, কোন তথ্য যাচাই করা হলো, কার বক্তব্য নেওয়া হলো, কী প্রমাণ পাওয়া গেল এবং তদন্তের সিদ্ধান্ত কীভাবে নির্ধারিত হলো, এসব বিষয়ে অভিযোগকারী অনেক সময় যথেষ্ট তথ্য পান না। অভিযোগের নিষ্পত্তি কী পর্যায়ে রয়েছে, সেটি জানার জন্যও তাকে বারবার থানায় যেতে হয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন
সব জিডি ফৌজদারি মামলার তদন্তের সমতুল্য নয় এবং প্রতিটি অভিযোগ থেকেই মামলা হয় না। অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী পুলিশকে আইন নির্ধারিত পদ্ধতিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে যে ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান বা তদন্ত করা হয়, সেগুলোর অগ্রগতি ও নিষ্পত্তির বিষয়ে অভিযোগকারীকে যথাযথভাবে অবহিত করার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
আমি প্রস্তাব করছি, থানায় গৃহীত জিডি, অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হোক। অভিযোগকারী একটি ইউনিক নম্বরের মাধ্যমে অনলাইনে জানতে পারবেন তার অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে কি না, কোন কর্মকর্তা দায়িত্বে রয়েছেন, তদন্ত কোন পর্যায়ে আছে, কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত কী।
তদন্ত শেষ হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রকাশযোগ্য তদন্ত-সারাংশ বা প্রতিবেদনের অংশ অভিযোগকারীর জন্য অনলাইনে উন্মুক্ত করা যেতে পারে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যক্তিগত তথ্য, সাক্ষীর নিরাপত্তা, তদন্তের গোপনীয়তা, তৃতীয় পক্ষের অধিকার এবং বিচারাধীন মামলার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ না করেও অভিযোগের নিষ্পত্তির যুক্তি, প্রাসঙ্গিক পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া সম্ভব।
কোনো অভিযোগ নিষ্পত্তি না হলে তার কারণ এবং পরবর্তী করণীয় জানাতে হবে। অভিযোগকারী তদন্তের ফলাফলে অসন্তুষ্ট হলে কোন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পর্যালোচনার আবেদন করতে পারবেন, সেটিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত।
এতে একদিকে অভিযোগকারী তার অভিযোগের অগ্রগতি জানতে পারবেন, অন্যদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাজের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়বে। ফাইল আটকে রাখা, অযৌক্তিক বিলম্ব, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কিংবা প্রভাব খাটিয়ে প্রতিবেদন পরিবর্তনের সুযোগও সংকুচিত হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য থাকলে প্রতিকার কোথায়?:
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন একটি মামলা বা অভিযোগের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রতিবেদনে ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ অনুসন্ধান, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপেক্ষা কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্তের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একটি তদন্ত প্রতিবেদন কেবল তদন্তকারী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মতামতের দলিল হতে পারে না। সেখানে অভিযোগের মূল বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ, সাক্ষীদের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই এবং সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে হবে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ সত্য বা অসত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে, তার ব্যাখ্যাও যথাসম্ভব সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি অভিযোগকারীর বক্তব্য গ্রহণ না করেন, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সঙ্গে কথা না বলেন, প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই না করেন কিংবা পরস্পরবিরোধী তথ্যের ব্যাখ্যা না দিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন, তাহলে প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তবে কোনো অভিযোগকারী তদন্তের ফলাফলে অসন্তুষ্ট হলেই প্রতিবেদনকে অসত্য বলা যাবে না। একইভাবে পুলিশের প্রতিবেদন দাখিলের অর্থও এই নয় যে তার প্রতিটি বক্তব্য প্রশ্নাতীত। প্রয়োজন হলো, প্রতিবেদনটি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রস্তুত হয়েছে কি না, তা যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থা। এ জন্য কয়েকটি সংস্কার জরুরি।
প্রথমত, প্রতিটি তদন্তের জন্য একটি মানসম্মত চেকলিস্ট থাকা উচিত। অভিযোগের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করা হয়েছে কি না, সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, নথিপত্র পরীক্ষা করা হয়েছে কি না এবং প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, এসব বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নথিভুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তদারকি কার্যকর করতে হবে। গুরুতর অভিযোগ, জমি দখল, জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীন বা পৃথক তদারকি নিশ্চিত করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, অভিযোগকারী যদি নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ তদন্তের ত্রুটি তুলে ধরেন, তাহলে তার আবেদন গ্রহণ করে তা পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পুনঃতদন্ত, অধিকতর তদন্ত বা অন্য আইনসম্মত প্রতিকারের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে পারেন। আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে আদালতের নির্দেশ ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করতে হবে।
চতুর্থত, তদন্তে ইচ্ছাকৃত অসত্য তথ্য দেওয়া, ঘুষ গ্রহণ, প্রমাণ নষ্ট করা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রযোজ্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী বা সাক্ষীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ ঠেকানোর ব্যবস্থাও জরুরি।

মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল তথ্যের ব্যবহার হোক আইনসম্মত:
বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন, ডিজিটাল যোগাযোগ, সিসিটিভি, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য অনেক অপরাধের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই অপরাধের সত্যতা যাচাইয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
কোনো অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়, স্থান ও ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী আইনসম্মতভাবে মোবাইল নেটওয়ার্কের তথ্য, কল ডিটেইল রেকর্ড, অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল আলামত প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এসব তথ্যের মাধ্যমে কোনো ঘটনার সময়রেখা যাচাই, বক্তব্যের অসংগতি শনাক্ত অথবা অন্য প্রমাণের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব।
তবে মোবাইল নেটওয়ার্কের তথ্যকে এককভাবে অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো ফোনের নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকার তথ্য সব সময় নির্দিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান বা অপরাধে তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে না। প্রযুক্তিগত তথ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে; তাই অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে তা মূল্যায়ন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে আইনসম্মত অনুমোদন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। নাগরিকের ব্যক্তিগত যোগাযোগে নির্বিচার নজরদারি নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয়, আনুপাতিক ও জবাবদিহিমূলক প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কে কখন কোন অনুমোদনে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা হয়েছে এবং তথ্যের অপব্যবহার হয়েছে কি না, এসবেরও নিরীক্ষাযোগ্য রেকর্ড থাকা উচিত।
ডিজিটাল প্রযুক্তি যেন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানির হাতিয়ার না হয়; বরং সত্য উদ্ঘাটনের নির্ভরযোগ্য সহায়ক হয়, সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সংস্কারের দাবি
পুলিশের তদন্ত ও জবাবদিহিতার বিষয়ে আমার বক্তব্য কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের কারণে ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই আমি এ বিষয়ে কথা বলছি।
আমার জমিসংক্রান্ত একটি বিরোধে ডেমরা থানার সাধারণ ডায়েরি, পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগের নিষ্পত্তি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। এ বিষয়ে আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়েছি। পুলিশের তদন্তের নিরপেক্ষতা ও প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি পুনরায় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার প্রয়োজন অনুভব করেছি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেও ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের (ডিসি ওয়ারী) কাছ থেকে আমার প্রত্যাশিত সাড়া পাইনি।
আমি এখানে কাউকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করতে চাই না। আমার অভিযোগের সত্যতা ও তদন্তের যথার্থতা যাচাই করা হোক, এটাই প্রত্যাশা। কোনো তদন্ত কর্মকর্তা ভুল করে থাকলে তা সংশোধন করা হোক; ইচ্ছাকৃত অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আবার আমার অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত না হলে সেটিও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে স্পষ্ট করে জানানো হোক।
একজন নাগরিকের ন্যায়বিচার চাওয়ার অধিকার আছে। অভিযোগকারী যদি মনে করেন তদন্তে তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি, তাহলে সেই অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার সুযোগ থাকা উচিত। অভিযোগকারীর পরিচয়, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর তাঁর প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করতে পারে না।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা যদি অন্য নাগরিকেরও হয়ে থাকে, তাহলে তা ব্যক্তিগত অভিযোগের সীমা ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযোগের নিষ্পত্তির পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কাউকে একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হতে না হয়।
আইজিপির কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব
পুলিশের মহাপরিদর্শক মহোদয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আমার বিনীত প্রস্তাব-
১. ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা: থানায় অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, প্রতিবেদন দাখিল ও মামলা নিষ্পত্তি-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পর্যায়ে অনিয়ম প্রতিরোধে অভিযোগ গ্রহণ ও স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
২. ডিজিটাল অভিযোগ ট্র্যাকিং: প্রতিটি জিডি ও অভিযোগের জন্য ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর দিতে হবে। অভিযোগকারী অনলাইনে অগ্রগতি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিচয় এবং নিষ্পত্তির অবস্থা জানতে পারবেন।
৩. তদন্ত প্রতিবেদনের জবাবদিহিতা: তদন্তের সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ভিত্তি নথিভুক্ত করতে হবে। আইনসম্মত সীমার মধ্যে অভিযোগকারীকে প্রতিবেদন বা তার প্রকাশযোগ্য সারাংশ দিতে হবে।
৪. পুনঃপর্যালোচনার কার্যকর সুযোগ: তদন্তে নির্দিষ্ট ত্রুটি বা নতুন প্রমাণের উল্লেখ করে আবেদন করা হলে তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী অধিকতর তদন্ত বা অন্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ: কোনো দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তির অনুরোধে তদন্তের ফল পরিবর্তন করা যাবে না। বেআইনি হস্তক্ষেপের অভিযোগ যাচাইয়ের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
৬. প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত: প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল নেটওয়ার্ক, সিসিটিভি, ডিজিটাল নথি ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য আইনসম্মতভাবে সংগ্রহ ও যাচাই করতে হবে। তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে গোপনীয়তা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হবে।
৭. তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ: সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ডিজিটাল ফরেনসিক, মানবাধিকার, ফৌজদারি আইন এবং নিরপেক্ষ প্রতিবেদন তৈরির বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৮. অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা: অভিযোগের প্রকৃতি ও জটিলতা অনুযায়ী যুক্তিসংগত সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হলে বিলম্বের কারণ নথিভুক্ত করে অভিযোগকারীকে জানাতে হবে।
৯. অভিযোগকারী ও সাক্ষীর সুরক্ষা: তদন্তে সহযোগিতা করার কারণে কেউ যেন হুমকি, হয়রানি বা প্রতিশোধের শিকার না হন, সে জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা রাখতে হবে।
১০. প্রাতিষ্ঠানিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন: শুধু কতজন গ্রেপ্তার হলেন, কতটি মামলা হলো কিংবা কতটি অভিযান পরিচালিত হলো, এসব দিয়ে পুলিশের সাফল্য নির্ধারণ করা যাবে না। অভিযোগ নিষ্পত্তির মান, তদন্ত প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা, দুর্নীতির অভিযোগের নিষ্পত্তি, নাগরিকের আস্থা এবং আইনসম্মত আচরণকেও মূল্যায়নের অংশ করতে হবে।
১১. স্বাধীন অভিযোগ পর্যালোচনা: পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে পক্ষপাত, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের বাইরে উপযুক্ত ঊর্ধ্বতন বা স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী বিদ্যমান আইনগত ও প্রশাসনিক প্রতিকার কার্যকর করতে হবে।
১২. জনসম্মুখে জবাবদিহিতার প্রতিবেদন: ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করে কতটি অভিযোগ পাওয়া গেল, কতটি নিষ্পত্তি হলো, কতটি তদন্ত প্রতিবেদন পুনর্বিবেচিত হলো এবং অনিয়মের অভিযোগে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, এসব বিষয়ে নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করা যেতে পারে।

পুলিশের মর্যাদা রক্ষার পথ জবাবদিহিতার মধ্যেই
পুলিশকে অকার্যকর করার চেষ্টা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি পুলিশের কোনো সদস্যের অনিয়মের সমালোচনা করলেই সেটিকে বাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলা যায় না। গঠনমূলক সমালোচনা, তথ্যভিত্তিক অভিযোগ এবং নিরপেক্ষ পর্যালোচনা একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের উন্নতির সহায়ক। পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে; পাশাপাশি নাগরিকের অধিকারও সমান গুরুত্বে নিশ্চিত করতে হবে।
পুলিশ ও জনগণ পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। অপরাধী ও অপরাধের বিরুদ্ধে উভয়ের অবস্থান হওয়া উচিত দৃঢ়। জনগণ পুলিশের ওপর আস্থা রাখবে, পুলিশ জনগণের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেবে এবং অপরাধ দমনে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়বে, এটাই কাম্য।
আইজিপি মহোদয় বলেছেন, পুলিশ কঠোর হলে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’ বলা হয়, আবার নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। বাস্তবে পুলিশের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার আইনসম্মত আচরণ, তদন্তের নিরপেক্ষতা, অপরাধ দমনের কার্যকারিতা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার ভিত্তিতে। অযথা বলপ্রয়োগ কঠোরতার প্রমাণ নয়; আর আইনসম্মত সংযম দুর্বলতার লক্ষণ নয়।
একজন নিরপরাধ মানুষ যেন মিথ্যা অভিযোগে হয়রানির শিকার না হন, আবার একজন প্রকৃত অপরাধীও যেন ঘুষ, দলীয় পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে না যান, এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের প্রতি অনুরোধ, পুলিশকে শক্তিশালী করুন; তবে সেই শক্তির ভিত্তি হোক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, পেশাগত দক্ষতা, সততা ও আইনের শাসন। আইজিপি মহোদয়ের প্রতি আহ্বান, পুলিশের তদন্তব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিন। সাধারণ ডায়েরি থেকে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে এমনভাবে সাজান, যাতে নাগরিক তার অভিযোগের অগ্রগতি জানতে পারেন, তদন্তের সিদ্ধান্তের যুক্তি বুঝতে পারেন এবং অসংগতি থাকলে প্রতিকার চাইতে পারেন।
ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করেই অপরাধীদের দৌড়ের ওপর রাখা সম্ভব। ঘুষ বন্ধ করুন, তদন্তে স্বচ্ছতা আনুন, অপরাধীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করুন এবং অভিযোগকারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন।
পুলিশের প্রকৃত শক্তি কতজনকে ভয় দেখানো হলো, তাতে নয়; বরং কতজন অপরাধীকে আইনসম্মতভাবে বিচারের মুখোমুখি করা গেল, কতজন নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি থেকে রক্ষা করা গেল এবং কতজন নাগরিক পুলিশের কাছে ন্যায়বিচারের আশা নিয়ে এসে আস্থা ফিরে পেলেন, তার মধ্যেই নিহিত।
এই সংস্কারই পারে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সেতু গড়ে তুলতে এবং একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…




