চলতি বছর ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও একের পর এক বন্যায় দেশের প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, ময়মনসিংহসহ হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে বোরো ধান, আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি। ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে সরকার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বেসরকারি খাতকেও আমদানির অনুমতি দিয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় দেশের হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। মোট আর্থিক ক্ষতি প্রায় এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা। হাওরের মোট কৃষিজমির ১০.৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়, যাতে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে প্রায় দুই লাখ ১৩ হাজার টন। আকস্মিক এই দুর্যোগে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
হাওরের বন্যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় যে ধাক্কা দিয়েছিল সেই ক্ষতির রেশ না কাটতেই চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যায় কৃষি আরো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তলিয়ে যাওয়া ফসল, ভেসে যাওয়া হাজারো মাছের ঘের আর গবাদি পশুর ক্ষতি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। চলতি মাসে চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে এই বিভাগের জেলাগুলোসহ মোট ৪৩ জেলার কৃষি ক্ষতির মুখে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের এক লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলি জমি বানের পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সংকটে পড়েন পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৪ জন প্রান্তিক কৃষক।
সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৬ লাখ টন চাল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ক্ষতি শুধু একটি মৌসুমের ফলন সংকট নয়—এর প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্যস্ফীতি, কৃষকের আয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে এখন প্রয়োজন দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও কৃষকদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জেলাভিত্তিক প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দ্রুত সম্পন্ন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করতে হবে, যাতে প্রণোদনা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছায়। তাৎক্ষণিকভাবে আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য বিকল্প বীজতলা তৈরি ও ধানের চারা সরবরাহ করা জরুরি। যেহেতু আমনের বীজতলার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই স্বল্প মেয়াদি ও বন্যা-সহনশীল ধানের জাতগুলোর চারা জরুরি ভিত্তিতে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করতে হবে, যাতে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পুনরায় রোপণ সম্ভব হয়।
কৃষি ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় একাধিক মূল সংকট চিহ্নিত করে সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, আমন মৌসুমের শেষ মুহূর্তে নতুন বীজতলা তৈরি করা অসম্ভব। অন্য জেলা থেকে চারা এনে সরবরাহ করা না গেলে বিশাল জমি অনাবাদি থেকে যাবে। কৃষক-খামারিরা ব্যাংক বা এনজিওর ঋণে বিনিয়োগ করেছিলেন। পুঁজি হারিয়ে তাঁরা এখন নিঃস্ব। তাঁদের বিষয়টি ভাবতে হবে।
খাদ্য মজুত ও আমদানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনায়ন করা অন্যতম করণীয়। সরকারি-বেসরকারি আমদানি প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা দরকার, যাতে সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে একটি চক্র বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে না পারে। খোলা বাজারে বিক্রয় (ওএমএস) কার্যক্রম বন্যাকবলিত ও দুর্বল আয়ের এলাকায় সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। কৃষিমন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে শস্যবীমা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। শস্যবীমা দ্রুত চালুর বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নে গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতিতে কৃষকের আর্থিক ধাক্কা অনেকটাই সামলানো সম্ভব হবে।
মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে আগামি বোরো মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। আমন মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আসন্ন বোরো মৌসুমে উচ্চফলনশীল জাত, সার ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পরিকল্পনা এখনই নিতে হবে। বিআরআরআই ও বিএডিসির মাধ্যমে মানসম্পন্ন বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, নালা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা দ্রুত মেরামত না করলে পরবর্তী বৃষ্টির মৌসুমেও একই ক্ষতি পুনরাবৃত্তি হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বিত মেরামত পরিকল্পনা প্রয়োজন। উৎপাদন ঘাটতির সময় চালের বাজারে কৃত্রিম মজুতদারি ঠেকাতে বাজার পর্যবেক্ষণ ও মজুত সীমা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সীমিত থাকে।
তৃতীয়ত দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে কাঠামোগত সংস্কারে। বারবার বন্যা ও অতিবৃষ্টি এখন ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিত বাস্তবতা। বন্যা-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবনে বিআরআরআই ও বারির গবেষণা বাজেট বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষি বাজেটের অংশ গত এক দশকে ক্রমাগত কমে আসা প্রবণতা উল্টে দিতে হবে। শুধু ধানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ভাসমান কৃষি, মাচাং পদ্ধতি বা স্বল্পমেয়াদি সবজি ও ডালজাতীয় ফসলের সমন্বয় ঘটানো গেলে একটি ফসল নষ্ট হলেও কৃষকের সামগ্রিক ক্ষতি কমে আসবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাসকে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যাতে বন্যার পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষককে ফসল কাটা বা সুরক্ষার পরামর্শ দ্রুত পৌঁছে যায়।
ঘন ঘন আমদানিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বরং একটি স্থিতিশীল কৌশলগত মজুত নীতি (strategic reserve policy) থাকা দরকার, যা স্বাভাবিক সময়ে পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলে এবং দুর্যোগকালে দ্রুত বাজারে সরবরাহ দিতে পারে।
পরিশেষে বলা দরকার-৬ লাখ টন চাল উৎপাদন ক্ষতির আশঙ্কা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্রমবর্ধমান বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও আমদানির পাশাপাশি কৃষি গবেষণা, অবকাঠামো ও পূর্বাভাসভিত্তিক প্রস্তুতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট প্রতি বছর ফিরে আসতে থাকবে। শুধু বর্তমান ঘাটতি পূরণে ব্যস্ত না থেকে ভবিষ্যতের জন্য একটি সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





