চৈত্রসংক্রান্তি: রীতি মেনে শত বছর ধরে পালন হয়ে আসছে যে গ্রামে | বাংলাদেশ

চৈত্রসংক্রান্তি: রীতি মেনে শত বছর ধরে পালন হয়ে আসছে যে গ্রামে | বাংলাদেশ

<![CDATA[

বিশেষ রীতি মেনে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চৈত্রসংক্রান্তি অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর ইউনিয়নের মহারাজপুর-বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা।

তাদের বিশ্বাস, শত বছরের রীতি অমান্য করলেই অমঙ্গল দেখা দেবে তাদের গ্রামে। বছরের পর বছর ধরে এ বিশ্বাস লালন করে আসছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।

বৃহস্পতিবার (১৩ এপ্রিল) রাত ৯টার দিকে মহারাজপুর-বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের তরুণ সংঘ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দেখা যায়, সোয়া কেজি চালে এক মণ দুধ মিশিয়ে বড় সিলভারের ডেকচিতে রান্না করা হচ্ছে পায়েস। পাশেই ছোট্ট একটি মাটির হাঁড়িতেও রান্না করা হচ্ছে অল্প পরিমাণ পায়েস। খোলা মাঠে পায়েস খেতে ভিড় করেছেন নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ সকল ধর্মের নানা বয়সী তিন শতাধিক মানুষ।

উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাদের কাছে এ পায়েস সাধারণ কোনো পায়েস নয়। এ পায়েসে বিশেষ কোনো শক্তি আছে এমন বিশ্বাস তাদের। যে কারণে এ পায়েসকে তারা স্থানীয় ভাষায় সিন্নি বলেন। এ সিন্নি রান্নাও করা হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। সিন্নি রান্নার ধান ভানেন যে নারীরা, তাদের রোজা রেখে পবিত্র হয়ে ভেজা কাপড়ে ধান ভানতে হয়। যিনি রান্না করেন তাকেও রোজা রেখে পবিত্র হয়ে রান্না করতে হয়। রান্না শেষে মাটির ছোট্ট হাঁড়ির ঢাকনা খুলেই ওপর থেকে থেকে এক চামচ সিন্নি কলাপাতায় করে খোলা মাঠের মধ্যে নির্দিষ্ট পাকুড় গাছের নিচে ভোগ হিসেবে দিয়ে আসা হয়। মাটির হাঁড়িতে রান্না না করলে নাকি ভোগ শুদ্ধ হয় না। যে কারণে ডেকচির পাশাপাশি হাঁড়িতে আলাদা করে রান্না করা হয় সিন্নি। তবে কার উদ্দেশে দেয়া হয় এ ভোগ তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউই।

 

আরও পড়ুন: আজ পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন

ভোগ দেয়ারও রয়েছে বিশেষ নিয়ম। যে ব্যক্তি রান্না করবেন, তাকেই অন্ধকারে গিয়ে ভোগ দিয়ে আসতে হবে। ভোগ দিয়ে আসার সময় পেছন ফিরে তাকানো যাবে না। পেছনে তাকালেই নাকি তার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা। রান্নার শুরু থেকে ভোগ দেয়া পর্যন্ত ওই ব্যক্তি কারো সঙ্গে কথা বলেন না, এমনকি থুতু পর্যন্ত ফেলেন না। ভোগ দিয়ে ফিরে উপস্থিত সবার মধ্যে সিন্নি বিতরণ করে তবেই কথা বলেন তিনি।

সিন্নি খাওয়ার জন্যও রয়েছে কঠোর নিয়ম। উপস্থিত সকলেই গোল হয়ে মাঠের মধ্যে বসতে হবে। মাঝখানে জ্বালানো হবে বাঁশ কিংবা কাঠ দিয়ে আগুন। তারপর সবার মধ্যে কলাপাতা কিংবা বাটিতে সিন্নি বিতরণ করা হবে। এরপর সবাইকে একসঙ্গে সিন্নি মুখে দিতে হবে। কেউ আগে মুখে দিলে তার অমঙ্গল হবে বলে বিশ্বাস এখানকার মানুষজনের। খাওয়া শেষ হয়ে গেলেও যতক্ষণ পর্যন্ত আগুন জ্বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত বসে থাকতে হবে এখানেই।

আগুন নিভে গেলে সবাই চলে যাওয়ার পর সিন্নি রান্না করা মাটির হাঁড়িটি গাছের সঙ্গে বেঁধে দেবেন রান্না করা ব্যক্তি। গাছে হাঁড়ি না বাঁধলে সবাইকে ভোগ করতে হবে কঠিন অমঙ্গল।

অনুষ্ঠানে সিন্নি রান্না করা সত্তোর্ধ্ব আরশাদ মোল্লা সময় সংবাদকে জানান, বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই গ্রামে এই অনুষ্ঠান দেখে আসছেন তিনি। এমনকি নিজেরাও তা পালন করে আসছেন।

আরও পড়ুন: সুরের মূর্ছনায় রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলছে

হিন্দু-মুসলমানসহ সকল ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এমন আয়োজনের কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মুরব্বিরা বলে গেছেন, অনেক বছর আগে আমাদের গ্রামে এক সময় অমঙ্গল লেগে কলেরা ও বসন্ত রোগ হয়ে অনেক মানুষ মারা যায়। তখন হঠাৎ কোথা থেকে যেন এক পীর এসে চৈত্র মাসের শেষ দিনে বিশেষ রীতি মেনে গ্রামের লোকদের এই অনুষ্ঠান করতে বলে। পীরের নির্দেশে অনুষ্ঠান করার পর এই গ্রাম কলেরা ও বসন্ত রোগ থেকে মুক্তি পায়। তারপর থেকে প্রতিবছরই একই রীতি মেনে গ্রামবাসী এই অনুষ্ঠান পালন করে। আমার ধারণা ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে এই অনুষ্ঠান পালন হয়ে আসছে। এ অনুষ্ঠানে হিন্দু-মুসলমানসহ সব ধর্মের মানুষই অংশ নেন।’

ভোগ কাকে দেয়া হয় জানতে চাইলে এই বৃদ্ধ বলেন, ‘আল্লাহর নামে দিই। আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই করেন। আমাদের মুরব্বিরা দিয়ে এসেছেন, তাই আমরাও দিই। এই অনুষ্ঠান না করলে অমঙ্গল হবে আমাদের গ্রামে।’

আব্দুর রহমান নামে স্থানীয় এক যুবক বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এই অনুষ্ঠান দেখে আসছি। গ্রামের সবাই মিলে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা দিয়ে এই অনুষ্ঠান পালন করি। আমি চাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যেন এই অনুষ্ঠান পালনের ধারা অব্যাহত রাখে।’

]]>