ছোটখাটো কথোপকথনই মানুষকে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে সুস্থ রাখে, বলছে গবেষণা

ছোটখাটো কথোপকথনই মানুষকে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে সুস্থ রাখে, বলছে গবেষণা

ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেক সময় ছোটখাটো কথোপকথন এড়িয়ে চলি, কারণ সেগুলোকে মনে হয় একঘেয়ে বা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, সাধারণ এসব আলাপই মানসিক স্বস্তি, সামাজিক সংযোগ এবং একাকিত্ব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়েও আন্তরিকভাবে কথা বলা মানুষের মন ভালো রাখতে সাহায্য করে।

লিফটে পাশের মানুষের সঙ্গে আবহাওয়া নিয়ে দু’একটা কথা, অফিসের কফি কর্নারে সহকর্মীর সঙ্গে ছোটখাটো আলাপ কিংবা অপেক্ষার সময় অপরিচিত কারও সঙ্গে সাধারণ গল্প। এসবকে আমরা অনেক সময় “বোরিং” বলে এড়িয়ে যাই। মনে হয়, এমন কথাবার্তায় সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, এই সাধারণ আলাপগুলোই আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য হতে পারে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

লিফটে পাশের মানুষের সঙ্গে ছোট্ট আলাপ আপনার দিনটাকে সুন্দর করে তুলতে পারে

সম্প্রতি জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড স্যোসাল সাইকোলজি নামে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সাধারণত যেসব বিষয়কে বিরক্তিকর মনে করে, সেসব নিয়েও কথা বলার পর তারা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এই ছোট ছোট কথোপকথন একাকিত্ব কমাতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণ আলাপগুলোই আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য হতে পারে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ

গবেষণাটি পরিচালিত হয় প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে। সেখানে মানুষকে এমন কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলা হয়, যেগুলো তারা আগে থেকেই “বিরক্তিকর” বলে মনে করত। যেমন গণিত, পেঁয়াজ, শেয়ারবাজার, বিড়াল, দৈনন্দিন রুটিন বা ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা। অংশগ্রহণকারীরা আগে ধারণা করেছিলেন, এসব আলাপ খুবই নিরস হবে। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার পর অধিকাংশই জানান, অভিজ্ঞতাটি তাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি উপভোগ্য ছিল।

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ওহাইও ইউনির্ভাসিটি ওয়েনার মেডিকেল সেন্টারের মনোবিজ্ঞানী নিকোলাস অ্যালেন। তার মতে, কথার বিষয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আলাপে অংশ নেওয়ার আন্তরিকতা। অর্থাৎ, আপনি কী নিয়ে কথা বলছেন সেটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি কতটা মন দিয়ে শুনছেন, অন্যজনকে বোঝার চেষ্টা করছেন এবং সংযোগ তৈরি করতে পারছেন।

অফিসের কফি কর্নারে সহকর্মীর সঙ্গে ছোটখাটো আলাপ

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক প্রাণী। তাই খুব সাধারণ কোনো বিষয় নিয়েও যদি কারও সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলা যায়, সেটিও এক ধরনের মানসিক সংযোগ তৈরি করে। আর এই সংযোগই আমাদের ভালো অনুভব করাতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্ব শুধু মানুষের অভাব নয়; বরং এমন অনুভূতি, যেখানে মানুষ নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। তাই ছোট ছোট আলাপও সেই দূরত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ছোট ছোট আলাপও একাকিত্ব কমাতে সাহায্য করে

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন একাকিত্বে ভোগা মানুষের মধ্যে হৃদরোগ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ডায়াবেটিস এমনকি স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতার সঙ্গেও জড়িত।
তবে সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ যে ভালো হবে, তা নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর যোগাযোগের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তাবোধ এবং আন্তরিকতা। নেতিবাচক বা অসম্মানজনক আলাপ বরং মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
আজকের ব্যস্ত ডিজিটাল জীবনে আমরা অনেকেই ছোটখাটো আলাপ এড়িয়ে চলি। কিন্তু হয়তো সেই “বোরিং” কথোপকথনের মাঝেই লুকিয়ে আছে একটু মানসিক স্বস্তি, নতুন সংযোগ কিংবা ভালো লাগার মুহূর্ত।

নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতার সঙ্গেও জড়িত

তাই পরেরবার অফিসের কফি মেশিনের পাশে কেউ কথা বলতে চাইলে, কিংবা লিফটে দাঁড়িয়ে কেউ হাসিমুখে “দিনটা কেমন গেল?” জিজ্ঞেস করলে উত্তরটা একটু সময় নিয়ে দেওয়াই ভালো। ছোট্ট সেই আলাপ আপনার দিনটাকে আপনার অজান্তেই সুন্দর করে তুলতে পারে।

সূত্র: সেলফ ডট কম

ছবি: এআই