জ্বালা, জ্বালা, জ্বালা এ মন জুড়ে | চ্যানেল আই অনলাইন

জ্বালা, জ্বালা, জ্বালা এ মন জুড়ে | চ্যানেল আই অনলাইন

সংস্কৃত ‘জ্বল্’ ধাতু থেকে প্রাকৃত হয়ে বাংলায় স্থান পেয়েছে ‘জ্বালা’। শব্দটি কোনো শান্ত-শিষ্ট বিষয় নয়।

এর আক্ষরিক অর্থ আগুন বা চরম উত্তাপ হলেও, বাঙালি সমাজ এটিকে রান্নার চুলার বাইরে এনে মানুষের মনের ভেতর স্থায়ীভাবে বসিয়ে দিয়েছে।

এটি একই সাথে একটি শারীরিক অনুভূতি, একটি সামাজিক মহামারি এবং একটি ভৌগোলিক সত্য।

শব্দটির ব্যবহারিক বহুমুখিতা যেমন আছে, তেমনি সামাজিক রূপ আছে। দৈনন্দিন জীবনের টনিকের বিপরীতের মতো কাজ করে জ্বালা।

বাজারে কাঁচামরিচের কেজি ডাবল সেঞ্চুরি পার হলে পকেটে যে অনুভূতি হয়, কিংবা মধ্যবিত্তের মাসের শুরুতে বেতন না হলে বাড়িওয়ালার নোটিশ দেখে যা অনুভব হয়, তা-ই হলো আসল ‘জ্বালা’।

এর আবার পরশ্রীকাতরতার দিকও আছে। তখন এর নাম জ্বলুনি। পাশের ফ্ল্যাটের ভাবির নতুন আইফোন বা অফিসের কলিগের প্রমোশন দেখলে আমাদের বুকে যে চোরা এসিডিটি বা অম্বল শুরু হয়, আধুনিক পরিভাষায় তাকেই ‘জ্বালা’ বা জ্বলুনি বলে।

এটি এমন এক অদৃশ্য আগুন যা নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস নয়, বরং বাজারে অন্য কোনো দামি ব্র্যান্ডের পণ্যের আগমন দরকার হয়।

সাহিত্যে কি জ্বালা আছে? আছে। প্রকৃতির মেলবন্ধন সাহিত্যের বিরহগাথার মধ্যে লেপ্টালেপ্টি করে আছে জ্বালা।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ উপন্যাসে পার্বতীর জন্য দেবদাসের যে চিরন্তন ছটফটানি, কিংবা গানে ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে’র অন্তহীন হাহাকার; এসবই আসলে মনস্তাত্ত্বিক জ্বালার রোমান্টিক সংস্করণ।

লেখকরা একে ‘বিরহ’ বলে চালিয়ে দিলেও পাঠক বোঝেন এর পেছনে লুকানো আসল যন্ত্রণা।

সাহিত্যে কল্পিত জ্বালার বিপরীতে পৃথিবীর গঠনের মধ্যেও আছে জ্বালা। মানুষের মনের এই আগুন যখন প্রকৃতিতে রূপ নেয়, তখন তাকে আমরা বলি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ।

ভূগর্ভস্থ উত্তপ্ত লাভা, ছাই আর গ্যাস যখন পৃথিবীর বুক চিরে তীব্র আক্রোশে বের হয়ে আসে, তখন বোঝা যায় প্রকৃতিরও নিজস্ব কিছু ‘জ্বালা’ রয়েছে। প্রকৃতির এই আগ্নেয় রূপ মানবহৃদয়ের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই যেন এক ভৌগোলিক এবং মহাজাগতিক প্রতিচ্ছবি।

রাজনীতিবিদদের কাছ থেকেও সময় সময় আমরা জ্বালা নিয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ পাই। অন্যের জ্বালার দিকে ইঙ্গিত করে উচিত কথায় টেকনিক্যালি নিজের জ্বলুনির প্রকাশ করে দেন বিদেশ-বিভূঁই থেকে আসা কোনো কোনো রাজনীতিক।