<![CDATA[
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন রিংকু সিং। ইনিংসের শেষ পাঁচ বলে টানা ছক্কা হাঁকিয়ে গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে এনে দিয়েছেন অবিশ্বাস্য জয়। ক্রিকেট বিশ্বে এক রাতে সাড়া ফেলে দেয়া ২৫ বছর বয়সী এ ব্যাটারের ক্রিকেট জীবনের শুরুটা অবশ্য সুখকর ছিল না। রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা করতে একটা সময় তাকে ঝাড়ুদারের কাজও করতে হয়েছে।
কলকাতাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার অনলাইন পত্রিকা রিংকু সিংয়ের জীবনের গল্প নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে তার বেড়ে ওঠা, সংগ্রাম ও ক্রিকেট জীবনের নানা বিষয় উঠে এসেছে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ের একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান রিংকু। ৫ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছোট থেকেই ক্রিকেটের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের যাত্রাপথ মোটেই মসৃণ ছিল না। বরং ক্রিকেটার হওয়াটা তার কাছে একটা সংগ্রাম ছিল।
রিংকুদের অভাবের সংসার। তার বাবা বাড়ি বাড়ি এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার বিলি করতেন। এক দাদা অটোচালক। অন্য এক দাদার কোচিং সেন্টার রয়েছে। পড়াশোনাতেও ভালো ছিলেন না রিঙ্কু। নবম শ্রেণিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর আর স্কুল যাননি।
টানাটানির সংসারে দু’বেলা খাবারের জন্য রিংকুকে ঝাড়ুদারের কাজে লাগিয়েছিলেন তার দাদা। টাকা উপার্জনের জন্য কাজের দরকার ছিল ঠিকই। কিন্তু ঝাড়ুদার হতে চাননি রিংকু। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বুঁদ রিংকু। একদিন কাজ থেকে বাড়ি ফিরে তার মাকে জানিয়েছিলেন যে, কোনো কাজ করার থেকে ক্রিকেটে মন দিতে চান তিনি।
অভাব থাকলেও ক্রিকেট খেলায় কখনো ইতি টানেননি রিঙ্কু। পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকা রিংকুর সুযোগ আসে ১৭ বছর বয়সে। সেই সময় প্রথম বার উত্তরপ্রদেশ রাজ্য ক্রিকেট দলে খেলার সুযোগ পান। ২০১৪ সালে নিজের রাজ্যের হয়ে লিস্ট এ ম্যাচ খেলেন রিংকু। সেখানে ৮৩ রানের ইনিংস খেলে নজর কাড়েন তিনি।
আরও পড়ুন: শেষ ওভারে রিংকুর ৫ ছক্কায় কলকাতার অবিশ্বাস্য জয়
এরপর ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয় রিংকুর। প্রথম ৭টি লিস্ট এর ম্যাচে ৪টি অর্ধশতরান করেছিলেন তিনি, যা দেখে অনেকেই তার প্রতিভা আঁচ করতে পেরেছিলেন। রিংকু নিজের প্রতিভার বড় প্রমাণ দেন ২০১৮ সালে বিজয় হাজারে ট্রফিতে। ত্রিপুরার বিপক্ষে ৪৪ বলে ৯১ রান করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
তার আগের বছরই অবশ্য আইপিএলে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ১০ লাখ রুপিতে তাকে কিনেছিল কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। তবে সে বার টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগই পাননি তিনি। ২০১৮ সালে তাকে ৮০ লাখ রূপি খরচে দলে ভিড়িয়ে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। এরপর থেকে সেখানেই খেলে যাচ্ছেন টানা পাঁচ আসর। তবে মাঠে নামার একটা সুযোগ পান না তিনি। মাঝেমধ্যে অবশ্য ফিল্ডিং করতে দেখা যেত তাকে। প্রথম আসরে মাত্র ৪ ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। পরের বছর এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েন রিংকু।
২০১৯ সালে বিসিসিআইকে না জানিয়েই বিদেশি লিগে খেলেছিলেন। এই জন্য বিসিসিআইয়ের ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিলেন তিনি। ওই আসরে আইপিএলে তিনি ৫ ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। পরের আসরে এক ম্যাচের বেশি তাকে মাঠে নামায়নি কলকাতা। এই তিন আসরে অবশ্য ব্যাট হাতে ব্যর্থ ছিলেন এ ব্যাটার।
রিংকু নিজের জাত চেনাতে সক্ষম হন ২০২২ সালে। ওই আসরে ৭ ম্যাচ সুযোগ পেয়ে ১৪৮.৭২ স্ট্রাইকরেটে করেন ১৭৪ রান। বিশেষ আসরে কলকাতার শেষ ম্যাচে লখনৌ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে তার ১৫ বলে ৪০ রানের ইনিংসটি ছিল অবিশ্বাস্য। যদিও ম্যাচটি ২ রানের জন্য হেরে যায় কেকেআর।
আরও পড়ুন: ১৪ বছর পর আইপিএলে লজ্জার রেকর্ড থেকে মুক্ত মাশরাফী
চলতি আইপিএলে রিংকুকে ৫৫ লাখ রুপিতে দলে ভিড়িয়েছে কলকাতা। এবার অবশ্য শুরু থেকেই দলে গুরুত্ব পাচ্ছেন তিনি। আসর শুরুর তিন ম্যাচেই একাদশে ছিলেন তিনি। আনন্দবাজার জানাচ্ছে, রিংকুর মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি রুপি। তার আয়ের সিংহভাগই আইপিএল থেকে আসা। তবে রিংকু কোটিপতি হলেও তার বাবা খানচন্দ্র সিং এখনো নাকি বাড়ি বাড়ি সিলিন্ডার পৌঁছে দেন। রিঙ্কু এক বার চোট পেয়েছিলেন। সেই সময় নাকি তার বাবা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। রিঙ্কুর বাবা আশঙ্কা করেছিলেন যে, ছেলে বোধহয় আর খেলতে পারবে না। ফলে পরিবারে আর্থিক সমস্যার বহর বাড়বে। এ কথা নিজেই জানিয়েছিলেন রিংকু। তিনি এখনো আলিগড়ে পরিবারের সঙ্গেই থাকেন।
]]>



