
অতি সম্প্রতি লিবারেল পার্টির একটি প্রচারণা অনুষ্ঠানে আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত ইউসুফ আলী তালুকদারকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী Mark Carney-এর সঙ্গে দেখা করতে দেখা যায়। CBC News-এর ন্যাশনাল নিউজে প্রচারিত ফুটেজে দৃশ্যটি ধরা পড়ে। এছাড়া জননিরাপত্তা মন্ত্রী Gary Anandasangaree এবং একাধিক লিবারেল এমপির সঙ্গে বিভিন্ন প্রচারণা ও কমিউনিটি অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা গেছে। এসব ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি নতুন করে জনসমক্ষে আলোচনায় আসে।
এই আলোচনার কেন্দ্রে থাকা ইউসুফ আলী তালুকদার শুধু কমিউনিটির একজন পরিচিত মুখ নন; তিনি এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার্স ইন অন্টারিও, ABEO-এর বর্তমান সভাপতি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার সক্রিয় উপস্থিতিতে কমিউনিটির অনেকেই বিব্রত বোধ করছেন।
ইউসুফ আলী তালুকদার কোথায় যাবেন বা যাবেন না, তা একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে কমিউনিটির কোনো কর্মকাণ্ডে কেউ যুক্ত হতে চাইলে তাকে কিছু নৈতিক মানদণ্ড মাথায় রাখতে হয়। সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা জনকল্যাণমূলক কোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আসা কেবল পদ-পদবির বিষয় নয়, এটি আস্থা, চরিত্র ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন।
কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কোনো সংগঠনের শীর্ষ পদে দেখতে অনেকে অস্বস্তি বোধ করেন। পেশাজীবী সংগঠনে মানুষ চান সৎ, সংযত ও আদর্শবান নেতৃত্ব। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রেও একই নৈতিক প্রশ্ন প্রযোজ্য। ইউসুফ আলী তালুকদার টরন্টোর স্থানীয় একটি মসজিদ পরিচালনা কমিটিতেও স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে নিয়মিত মুসল্লিদের কয়েকজন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। মসজিদ, মন্দির কিংবা গির্জার মতো পবিত্র প্রতিষ্ঠানে কারা দায়িত্বে থাকবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ তাই অস্বাভাবিক নয়। যে ব্যক্তির পাশে দাঁড়াতে গিয়ে পরিবার নিয়ে মানুষ বিব্রত হন, তিনি কমিউনিটির জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন না।

ইউসুফ আলী তালুকদার। ড্যানফোর্থ ও ভিক্টোরিয়া পার্কের ইন্টারসেকশনের নিকটবর্তী একটি ভবনে ‘ঢাকা লার্নিং সেন্টার’ নামে তিনি একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন টিউটোরিয়াল স্কুল চালাতেন। দিনকাল তার বেশ ভালই যাচ্ছিল। প্রচুর শিক্ষার্থী তার ক্লাসে আসত। কিন্তু স্বভাবের কারণে তিনি একদিন ধরা খেয়ে যান।
২০০৭ সালের নভেম্বরের ঘটনা। স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ইউসুফ আলী তালুকদার তার ক্লাসে ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ক্লাসে তিনি ছাত্রীর ব্রা-এর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একাধিকবার তার স্তন চেপে ধরেন এবং তার প্যান্টের জিপারে হাত দেন। “He was found guilty of putting his hand inside the student’s bra, squeezing her breast on multiple occasions and rubbing the zipper of her pants during class, according to the court decision.” —The Toronto Star (June 24, 2015)।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। ২০১০ সালে আদালত ইউসুফ আলী তালুকদারকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। দণ্ডভোগের পর তার জন্য তিন বছরের প্রবেশন নির্ধারণ করা হয়, অর্থাৎ নির্দিষ্ট শর্ত মেনে আদালতের তত্ত্বাবধানে বাইরে থাকতে হবে এবং সেই শর্ত ভঙ্গ করলে পুনরায় শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
এছাড়া আদালতের আদেশে ইউসুফ তালুকদারের ওপর ১০ বছরের জন্য বিশেষ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিল ১৬ বছরের কম বয়সীদের উপস্থিতিতে পার্ক, সুইমিং এলাকা, স্কুল চত্বর, খেলার মাঠ, ডে-কেয়ার বা কমিউনিটি সেন্টারে যাওয়া নিষিদ্ধ। কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে এমন কোনো পেশা বা স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ ছিল, যেখানে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের ওপর তার কর্তৃত্ব বা তত্ত্বাবধানের সুযোগ থাকে।
এই দণ্ডাদেশের ঘটনায় আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে, তালুকদার প্রায় এক বছর ধরে ভুক্তভোগী শিশুটিকে ধীরে ধীরে প্রভাবিত করেছিলেন। তার বাবার মৃত্যুর পর সৃষ্ট মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানো হয়েছিল এবং একজন শিক্ষক হিসেবে তার ওপর থাকা বিশ্বাসের অপব্যবহার করা হয়েছিল। একই নথিতে আরও বলা হয়, ছাত্রীটির মা তাকে এ ধরনের আচরণ ও যোগাযোগ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষিত হয়।
আদালতের নথির বরাতে টরন্টো স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার পর তিনি ভুক্তভোগীকে একটি নোট দিয়ে বলেন, “কাউকে বলবে না।” পরদিন ভুক্তভোগীর পরিবার তাকে মুখোমুখি করলে তিনি নিজের আচরণ স্বীকার করেন এবং পুলিশের কাছে না যাওয়ার অনুরোধ করেন। এমনকি নিজের জুতা খুলে মেয়েটির মায়ের হাতে তুলে দেন, যেন তিনি তাকে আঘাত করেন।

২০১৩ সালের মার্চ মাসে Ontario College of Teachers তার বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে শুনানি করে এবং তার শিক্ষকতার লাইসেন্স বাতিল করে। শুনানি বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন শিক্ষক হিসেবে তার উচিত ছিল বুঝতে পারা যে, তিনি যা করছেন তা গুরুতর অনৈতিক এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ কারণেই বিষয়টি শুধু অতীতের একটি অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নেতৃত্ব, সামাজিক আস্থা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে পরিণত হয়। মানুষ ক্ষমতা নয়, আস্থা খোঁজে। পদ নয়, চরিত্র খোঁজে। সমাজে ফিরে আসার অধিকার সবার আছে, কিন্তু কমিউনিটির নেতৃত্বের জায়গা আলাদা। এটি ব্যক্তিগত পুনর্বাসনের মঞ্চ নয়; সেখানে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, আত্মসমালোচনা, নৈতিক সংযম এবং মানুষের আস্থা অর্জনের সক্ষমতা।
যারা অতীতে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন, তাদের উচিত নিজ দায়িত্বে সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান, শিশু-কিশোর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র এবং ধর্মীয় বা সামাজিক নেতৃত্বের অবস্থান থেকে দূরে থাকা। এতে ব্যক্তি নিজেও অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক থেকে রক্ষা পান, কমিউনিটিও নিরাপদ ও স্বস্তিকর থাকে।
বি.দ্র: প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে ইউসুফ আলী তালুকদারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ইমেইল ও টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়। প্রথমে তিনি ইমেইল না পাওয়ার কথা জানান। পরে ১২ মে ২০২৬ তারিখে পুনরায় পাঠানো ইমেইল প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এ প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য দেননি।
তথ্যসূত্র:
Juno News (১৩ এপ্রিল ২০২৬)
Todayville (১৩ এপ্রিল ২০২৬)
The Bureau (১০ এপ্রিল ২০২৬)
Toronto Star (২৪ জুন ২০১৫)
Professionally Speaking, Ontario College of Teachers (সেপ্টেম্বর ২০১৩)






