
তিরানা, ১৬ অক্টোবর – মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প ও তাঁর স্বামী জ্যারেড কুশনারের একটি মেগা বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আলবেনিয়ায় শুরু হওয়া অসন্তোষ এখন সরকার পতনের একদফায় রূপ নিয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) টানা চতুর্থ দিনের মতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে রাজধানী তিরানা। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীরা সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া, ককটেল ও পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করছে দাঙ্গা পুলিশ।
শিক্ষাব্যবস্থার জঘন্য অবস্থা, তরুণদের বেকারত্ব এবং ট্রাম্প পরিবারের বিলাস বহুল রিসোর্ট প্রজেক্ট ঘিরে সরকারের দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগে রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী এদি রামার (Edi Rama) ১২ বছরের শাসনামলে এটিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সহিংস গণঅভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিক্ষোভের নেপথ্যে: ইভাঙ্কা ট্রাম্পের মেগা প্রজেক্ট ও ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’
সংরক্ষিত উপকূল বিক্রির অভিযোগ: দক্ষিণ আলবেনিয়ার সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকা, উপহ্রদ ও সৈকত বেষ্টিত জনবসতিহীন দ্বীপে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে বিলাসবহুল মেরিনা এবং পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করেছে সরকার। এলাকাটি হাজার হাজার ফ্লেমিঙ্গো পাখির প্রাকৃতিক আবাস্থল। প্রকৃতির এই ভারসাম্য রক্ষায় পরিবেশবাদীদের হাত ধরে শুরু হওয়া আন্দোলনকে নাম দেওয়া হয় ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’।
স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতি: বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের মূল্যবান সম্পদ ট্রাম্প পরিবারের হাতে তুলে দিতে সরকার আইনের পরিবর্তন এনে চরম গোপনীয়তা রক্ষা করেছে। দেশের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বাজেট না দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের তোষামোদ করা হচ্ছে।
“আমাদের দেশ এর আগে কখনো এত চরম দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার দেখেনি। এই পুরো শাসনব্যবস্থার ওপর দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ, সবকিছু বদলে ফেলতে হবে!” — ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারী আরবার লেশি।
মন্ত্রণালয়ে আগুন, ভাঙচুর ও অগ্নিগর্ভ রাজপথ
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও চলতি সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আন্দোলনের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আগুন: বুধবার (১৪ অক্টোবর) ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
তোলপাড় রাজধানী: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাসস্টপ ও ট্রাফিক লাইটে ভাঙচুর চালানো হয়। রাস্তায় ময়লার পাত্রে আগুন দিয়ে বেরিকেড সৃষ্টি করা হয়।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন: রাজধানী তিরানার গণ্ডি পেরিয়ে দক্ষিণ অঞ্চলের শহর কোরচেসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বর্জন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।
পদত্যাগ প্রত্যাখ্যান প্রধানমন্ত্রীর: সরকারের কঠোর বার্তা
আলবেনিয়ার অর্থনীতিমন্ত্রী দেলিনা ইব্রাহিমাজ এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে জনজীবনের জন্য হুমকি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে রাজপথে তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হলেও প্রধানমন্ত্রী এদি রামা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি কোনো অবস্থাতেই পদত্যাগ করবেন না।
ফেসবুক ভিডিও ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রামা দাবি করেন, “গত বছর দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন হয়েছে, কোনো বিপ্লব নয়! প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালিয়ে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের সাথে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির সম্পর্ক নেই। আলবেনিয়াকে সামনে এগিয়ে নিতে আমি সব আলোচনা করতে প্রস্তুত, তবে কোনো ধ্বংসাত্মক এজেন্ডার কাছে মাথানত করা হবে না।” — প্রধানমন্ত্রী এদি রামা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) সদস্যপদ পাওয়ার দৌড়ে থাকা আলবেনিয়ার এই অভ্যন্তরীণ আন্দোলন এখন ইভাঙ্কা-কুশনার কানেকশনের কারণে গোটা বিশ্ব রাজনীতির নজর কেড়েছে।
এনএন/ ১৬ অক্টোবর ২০২৬




