ডেইরি ফার্মে আবেদ আলীর ‘অপরাধ সাম্রাজ্য’ চাঁদা না দেওয়ায় মাছ ছিনতাই, বাঁধা দেয়ায় বাবা-ছেলেসহ তিনজনকে মারধর

ডেইরি ফার্মে আবেদ আলীর ‘অপরাধ সাম্রাজ্য’ চাঁদা না দেওয়ায় মাছ ছিনতাই, বাঁধা দেয়ায় বাবা-ছেলেসহ তিনজনকে মারধর

আবুল কালাম আজাদ (বিপ্লব): সাভারের আশুলিয়ায় কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের (ডেইরি ফার্ম) ভেতরে বহিরাগতদের দাপট ও নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগের মধ্যেই চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে মাছ ছিনতাইয়ের চেষ্টায় বাঁধা দেয়ায় বাবা-ছেলেসহ তিনজনকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আবেদ আলী (৪২)-এর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনকে হামলায় জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে।

আবেদ আলীর সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলায় ডেইরী ফার্মের কর্মচারী জয়নাল মিয়া (৪৮) গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁর অণ্ডথলির চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ায় মুমুর্ষ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এছাড়া তার দুই ছেলেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আবেদ আলী দীর্ঘদিন ধরে ডেইরি ফার্মের ভেতরে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ঘাস চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার ও নারীদের হয়রানিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আবেদ আলীর সঙ্গে কলমা উত্তরপাড়ার আমিনুল এবং পাথালিয়ার আমবাগান এলাকার কোরবান আলী মাস্টারের ছেলে মারুফ ওরফে ‘সাইকো মারুফ’সহ কয়েকজনের একটি চক্র রয়েছে। এই চক্রের ভয়ে ফার্মের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আশপাশের অনেক বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরে মুখ খুলতে সাহস করেননি।

লিখিত অভিযোগ সুত্রে জানা গেছে, অভিযোগের বাদি সজিব শেখ ও তাঁর বাবা জয়নাল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে ডেইরি ফার্মে কর্মরত। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আবেদ আলী তাঁর বাবার কাছে ফার্ম এলাকায় ব্যবসা করার জন্য ২০ হাজার টাকা চাঁধা দাবি করছিলেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। গত ৯ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে আবেদ আলীসহ পাঁচ-ছয়জন ডেইরি ফার্মের কর্মস্থলে ঢুকে আবারও টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে পুকুর থেকে মাছ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে জয়নাল বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে মারধর করা হয়। হামলার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ফার্মের মালেক বায়ার শাখার কর্মচারী মকবুল, মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী জলিলসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বলে অভিযোগকারীরা জানান।

ভুক্তভোগী সজিবের অভিযোগ, হামলাকারীরা তাঁর বাবাকে হত্যার উদ্দেশ্যে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। একপর্যায়ে জয়নালের অণ্ডথলির চামড়া ছিঁড়ে গুরুতর জখম হয়। বাবাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে সজিব ও তাঁর বড় ভাই রাসেল মিয়া (২৯)-কেও মারধর করা হয়। পরে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা চলে যায়। তবে ঘটনার পর বিষয়টি প্রকাশ করলে মিথ্যা মামলা এবং জানমালের ক্ষতির হুমকি দেয় হামলাকারীরা।

সজিব শেখ বলেন, “চাঁদার টাকা না দেওয়ায় আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। আমার বাবাকে গুরুতরভাবে আহত করা হয়েছে। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চাই।”

‘ফার্মের ভেতরেই অপরাধের ঘাঁটি’

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীর ভাষ্য, ডেইরি ফার্মের বিশাল এলাকা ও আবাসিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আবেদ আলী দীর্ঘদিন ধরে সেখানে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফার্মের ঘাস চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার, নারীদের হয়রানি ও শ্লীলতাহানিসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে আবেদ আলী ও তাঁর সহযোগীদের নাম জড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী বলেন, “পতিত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আবেদ আলী ও তাঁর সহযোগীরা ফার্মের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাঁর সঙ্গে তাঁদের কোনো না কোনো বিরোধ হয়নি। সাইকো মারুফ’ নামে পরিচিত মারুফ রাজনৈতিকভাবে আবেদ আলী ও তাঁর সহযোগীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন। ৫ আগস্টের আগে সরকার পতনের আন্দোলনের সময়ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আবেদ আলীর বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের আরও দাবি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সময় অস্ত্রধারী একটি দলের সঙ্গে আবেদ আলী ও তাঁর সহযোগীদের সম্পৃক্ততা ছিল। আন্দোলনকারীদের ধাওয়া খেয়ে ওই দলের কয়েকজন ডেইরি ফার্মের ভেতর দিয়ে পালিয়ে যায় বলেও তাঁদের দাবি করেন স্থানীয়রা।

২০২৪ এর ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকায় আবেদ আলী ও তাঁর সহযোগীদের প্রকাশ্য তৎপরতা কমে যায়। সম্প্রতি তাঁরা আবার এলাকায় সক্রিয় হয়েছেন। যার ফলে আবারও ফার্মের ভেতরে মাদক সেবন ও বেচাকেনাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

আহত জয়নাল মিয়ার ছেলে ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাজিব বলেন, “আমার বাবার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই চক্রের বিরুদ্ধে শুধু হামলার অভিযোগ নয়, ডেইরি ফার্মের ভেতরে মাদকসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

কর্তৃপক্ষের অবস্থান

কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত আবেদ আলীর চাচা মো. শহর আলীকে শোকজ করা হয়েছে। ফার্মের আবাসিক এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থান ঠেকাতে সবাইকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাসায় অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত লোকজন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জুয়েল রানা বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছি। ঘটনার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আবেদ আলী, আমিনুল ও মারুফের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তাধীন; অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তাঁদের দায়ী বলা যাচ্ছে না ।