ডেভিড ইমনের পর এবার রায়হান-ইউসুফকে ধরতে মরিয়া প্রশাসন

ডেভিড ইমনের পর এবার রায়হান-ইউসুফকে ধরতে মরিয়া প্রশাসন

পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ডান হাত ও বাম হাত হিসেবে খ্যাত সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ এবং মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন গ্রেফতারের পর চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্থিরতা অনেকটাই কমেছে। তবে তার আরেক অনুসারী কুখ্যাত সন্ত্রাসী রায়হান এবং ক্যাশিয়ার এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। অক্ষত রয়েছে তাদের অস্ত্রভাণ্ডারও।

পুলিশের এখন টার্গেট এই দুই সন্ত্রাসী গ্রেফতার ও অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার করা। এজন্য গ্রেফতার ডেভিড ইমনসহ তার ৫ সহযোগীকে আনা হয়েছে ১০ দিনের রিমান্ডে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেই অন্য বাহিনীর অন্য সদস্য ও অস্ত্রভাণ্ডারের সন্ধান মিলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই বাহিনীর হাতে একে ৪৭ রাইফেল, চায়নিজ রাইফেলসহ ভারি অস্ত্রের সমাহার রয়েছে। বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে এসব অস্ত্র উঁচিয়ে ব্রাশফায়ার ও গুলি চালাতে দেখা গেছে বাহিনীর সদস্যদের।

গ্রেফতার কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে হত্যা ও অস্ত্র আইনের দুইটি পৃথক মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রোববার দুপুরে চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুস্তাকিম বিল্লাহ এ আদেশ দিয়েছেন।

১০ দিনের রিমান্ডে ডেভিড ইমন

আদালত সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কারাগার থেকে কঠোর নিরাপত্তা মধ্য দিয়ে ডেভিড ইমনকে রোববার আদালতে নেওয়া হয়। আদালত প্রাঙ্গণে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হত্যা ও অস্ত্র আইনের পৃথক দুটি মামলায় ইমনসহ ৫ জনের সাত দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাদের প্রত্যেকের ৫ দিন করে দুই মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডে নেওয়া অন্য চারজন হচ্ছেন- রাউজান উপজেলার কদলপুর এলাকার মৃত নুরুল আমিনের ছেলে মো.মিঠু প্রকাশ ধামা ইলিয়াছ, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মৈয়শাতুয়া এলাকার মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে মো. শামীম, ঢাকার শ্যামপুর থানার করিমুল্লাবাগ পোস্তগোলা এলাকার মো. জাফরের ছেলে আল ইসলাম আলিফ প্রকাশ তমাল এবং নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার সাহারপাড় এলাকার মো. বেলায়েত হোসেনের ছেলে সাফায়েত হোসেন।

হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ফটিকছড়ি থানায় দায়ের করা হত্যা ও অস্ত্র মামলায় আসামি ডেভিড ইমনসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে প্রতিটি মামলায় ৭ দিন করে মোট ১৪ দিন রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। এ আবেদনের ওপর ভিত্তি করে আদালত দুইটি মামলায় তাদের প্রত্যেককে পাঁচ দিন করে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় সংঘটিত বহুল আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। পরে গত ২২ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে গ্রেফতার করে আদালতের অনুমতি নিয়ে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ধামা ইলিয়াছ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের মজুদ এবং সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত গত ২৯ জুলাই যশোর কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের হয়ে তার অনুসারী ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন, রায়হান ও ইউসুফ চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। বড় বড় ব্যবসায়ী, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সাবেক এমপি, শিল্পপতিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছিল তারা। হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার, বিদেশি নাম্বার থেকে ফোন করে তাদের আলটিমেটাম দিয়ে আদায় করা হয়েছে চাঁদা। যারা দেননি তাদের বাসাবাড়িতে গিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলিবর্ষণ করে দেখানো হয়েছে ভয়ভীতি। দেওয়া হয়েছে হত্যার হুমকি।

আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি ঘিরে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গেও তাদের হয়েছে সংঘর্ষ। ঘটেছে খুনোখুনির মতো ঘটনা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ বাণিজ্য, কন্ট্রাক্ট কিলিংয়েও জড়িয়ে পড়ে সাজ্জাদ বাহিনী। চট্টগ্রাম মহানগরী ও উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীতে ৫ আগস্টের পর অন্তত ২৯টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। যার বেশিরভাগের নেতৃত্বেই ছিল এই সন্ত্রাসী বাহিনী।

গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিংমল থেকে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর থেকে কারাগারেই আছে ছোট সাজ্জাদ। তার বিরুদ্ধে ১০টি হত্যাসহ মোট ১৯টি মামলা রয়েছে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বাহিনীর হাল ধরে ডেভিড ইমন ও রায়হান।

গত ২৯ জুলাই যশোর জেলার কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনসহ তার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে। এরপর থেকে সাজ্জাদ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে রায়হান ও ইউসুফ। তবে দুই সন্ত্রাসী গ্রেফতারের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডের অস্থিরতা এখন অনেকটাই কমেছে। বাকি যে দুইজন আছে তারা এখন চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে নিজেদের রক্ষা করতে এবং গ্রেফতার এড়াতেই বারবার স্থান বদল করছে।

এই দুইজনের মধ্যে রায়হান সরাসরি কিলার হিসেবে কাজ করে। ইউসুফ চাঁদাবাজির টাকা সংগ্রহ করে বিভিন্ন বিলি বণ্টনের দায়িত্ব পালন করে থাকে বলে জানা গেছে। তাদের গ্রুপে কিশোর গ্যাং হিসেবে খোরশেদ আলম, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মুবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদসহ বেশ কয়েকজন আছে।

জানা গেছে, রায়হান ও ইউসুফকে এখন হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের গ্রেফতারে চালানো হচ্ছে দফায় দফায় অভিযান। তারা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। রায়হানকে নজিরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৪টি মামলা রয়েছে।

তার কাছে কোনো ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস না থাকায় তাকে গ্রেফতারে বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

এর মধ্যে ২৯ জুলাই রায়হানকে ধরতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে রায়হান একটি বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

এ ঘটনার পর চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেছিলেন, ‘পালিয়ে গেলেও দোজখ দেখে ফেলেছে সন্ত্রাসী রায়হান।’

এসপি আরও বলেন, ইউসুফ সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম সদস্য। চাঁদাবাজির টাকা সংগ্রহ করে হুন্ডি ও বিকাশে বিভিন্ন জায়গায় আদান প্রদান করতেন তিনি। তার বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলায়। তার ছেলেও একজন সন্ত্রাসী। পোশাক কারখানার ম্যানেজারকে অপহরণ মামলায় আকবরশাহ থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল।

দুই দফায় চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাফিজুর রহমান ও এমডি এবং আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে ভারি অস্ত্র থেকে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। প্রথম দফায় ২ জানুয়ারি বাসাটি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারি অস্ত্র দিয়ে মুহুর্মুহু গুলি করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর হাটহাজারীতে এক ব্যবসায়ীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ডেভিড ইমন। ১শ পুলিশ নিয়ে বসে থাকলেও তাকে গুলি করা হবে এবং মরতে হবে বলে হুমকি দেয়। এর একদিন পরই ওই ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ভবনে তার অনুসারীরা হামলা চালায়।

চকবাজার থানার চন্দনপুরা এক্সেস রোড এলাকায় ডিডিএন নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে হামলা ভাঙচুরের ঘটনার ভিডিও ফুটেজও চমকে দিয়েছিল প্রশাসনকে। প্রতিষ্ঠান মালিকের কাছে ২ কোটি টাকা চাঁদা চেয়ে দুই দিনের আলটিমেটাম দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। না পেয়ে মেয়াদ ফুরানোর পরই এ হামলার ঘটনা ঘটানো হয়। এ ঘটনায়ও চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

১৩ জুন এই সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে নির্মমভাবে খুন হন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীর। রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিত রায়হানসহ ১১ জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়।

২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ অন্তত সাতটি ফৌজদারি মামলার আসামি তিনি। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুইজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্তরা রয়েছে বলে মনে করা হয়।

রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র রাখা, হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে অন্তত ৮টি মামলা রয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পাঁচলাইশে একটি গণসংযোগে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রতিপক্ষ গ্রুপের সন্ত্রাসী সারওয়ার বাবলাকে। ওই ঘটনায়ও রায়হান নেতৃত্ব দেয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড অস্থির করে রেখেছিল এই সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের প্রত্যেককে গ্রেফতার এবং অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার করা গেলেই খুন, রাহাজানি, চাঁদাবাজি কমবে। ডেভিড ইমন ও ৫ সহযোগীকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে ভারি অস্ত্রের সন্ধান ও অন্য সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের লক্ষ্য রয়েছে প্রশাসনের। একইসঙ্গে এসব অস্ত্রের উৎস, পরিকল্পনাকারী ও অর্থ জোগানদাতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানা গেছে।