ড্রাইভিং পরীক্ষায় ফেলকে পাস, বিআরটিএর মনিষ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ

ড্রাইভিং পরীক্ষায় ফেলকে পাস, বিআরটিএর মনিষ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ

ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষায় ফেল করা প্রার্থীদের ঘুষের বিনিময়ে পাস করানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২-এর মোটরযান পরিদর্শক মনিষ কুমার চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, লিখিত পরীক্ষায় শূন্য নম্বর পাওয়া কিংবা সাদা খাতা জমা দেওয়া প্রার্থীরাও অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স পাচ্ছেন। কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় অবস্থিত বিআরটিএ কার্যালয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব অনিয়ম চলছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষায় ২০ নম্বরের মধ্যে ন্যূনতম ৮ নম্বর পেলে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা দিলে পরীক্ষায় অকৃতকার্য প্রার্থীদের পাস করানোর ব্যবস্থা করা হয়।

মনিষ কুমার চক্রবর্তী ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে এই প্রক্রিয়া পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় ফেল করা এমনকি প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত ও গাড়ি চালানোর দক্ষতা না থাকা ব্যক্তিরাও এই চক্রের মাধ্যমে লার্নার লাইসেন্স এবং পরবর্তী সময়ে হালকা ও ভারী যানবাহনের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন।

কার্যালয়টির কথিত এই অনিয়মকে স্থানীয়ভাবে ‘দুপুরে ফেল, সন্ধ্যায় পাস’ পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তন কিংবা নিয়মবহির্ভূত অনুমোদনের মাধ্যমে অযোগ্য প্রার্থীদের লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

তবে কোন পরীক্ষায় কতজন প্রার্থীর ফল পরিবর্তন করা হয়েছে, এ ধরনের অনুমোদনে কারা জড়িত এবং অর্থ লেনদেনের প্রক্রিয়া কী ছিল, তার সুনির্দিষ্ট দাপ্তরিক নথি পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে পরীক্ষার খাতা, ফলাফল ও লাইসেন্স অনুমোদনের তথ্য যাচাই প্রয়োজন।

শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়, বিআরটিএর ইকুরিয়া কার্যালয়ের প্রায় প্রতিটি সেবাকে কেন্দ্র করে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। গাড়ির নিবন্ধন, রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ এবং মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও দালাল চক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

বিআরটিএ-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি, সেবার ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এই অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালাল চক্রের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, মাসে গড়ে ২০ কার্যদিবসে ইকুরিয়া কার্যালয়ে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়। এসব অর্থের বড় একটি অংশ বণ্টন, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের কমিশন এবং ঊর্ধ্বতন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি মনিষ কুমার চক্রবর্তী তদারকি করেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

তবে কথিত এই বিপুল অর্থ লেনদেনের পক্ষে ব্যাংক হিসাব, নির্দিষ্ট লেনদেনের তথ্য কিংবা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের আর্থিক পরিমাণ নিশ্চিত করতে নথিভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

এদিকে মনিষ কুমার চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির পাশাপাশি ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকাসহ নিজের এবং শ্বশুরবাড়ির এলাকায় তিনি বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার এবং ভারতে দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে সম্পদের দলিল, আর্থিক লেনদেনের নথি কিংবা নাগরিকত্বসংক্রান্ত কোনো সরকারি প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ের জায়গা দখল এবং আশপাশের অবৈধ দোকান ও ট্রাকস্ট্যান্ড থেকেও নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

ইকুরিয়া কার্যালয়ে ঘুষ লেনদেন, অনিয়ম, জায়গা দখল এবং অবৈধ মাসোহারা আদায়ের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সেখানে এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করেছে বলে জানা গেছে।

তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, দুদকের অভিযানের পরও কার্যালয়টিতে ঘুষ ও দালাল চক্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। আগের মতোই বিভিন্ন সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

সড়ক পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়া চালকদের লাইসেন্স দেওয়া হলে সড়ক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ ধরনের অনিয়ম সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

তবে অযোগ্য চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে নির্দিষ্ট সড়ক দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণে পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।

এদিকে মনিষ কুমার চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ড্রাইভিং পরীক্ষার ফলাফল, লাইসেন্স অনুমোদন, গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ এবং রুট পারমিটের কার্যক্রম খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

একই সঙ্গে তাঁর কথিত সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, অর্থ পাচার এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক ও বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদারকি দলের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মোটরযান পরিদর্শক মনিষ কুমার চক্রবর্তীর বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে বিআরটিএর পরীক্ষার মূল খাতা, ফলাফল অনুমোদনের নথি, সংশ্লিষ্ট দিনের লাইসেন্স প্রদানসংক্রান্ত তথ্য এবং দুদকের অভিযানের প্রতিবেদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।