
ঢাকা, ২৮ অক্টোবর – দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা কেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের আকস্মিক ধর্মঘটে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন ও হৃদয়বিদারক মানবিক সংকট। নিজস্ব পার্কিং সুবিধার দাবিতে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি গাড়ি চালানো বন্ধ রাখায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা সংকটাপন্ন রোগী ও মৃত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। পিকআপ ভ্যান, অটোরিকশা কিংবা সিএনজিতে করে লাশ নিতে বাধ্য হওয়ার মতো চরম করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এ ধর্মঘটের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন।
যে কারণে হঠাৎ এই ধর্মঘট:
অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানান, ঢামেক হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতাল চত্বর থেকে সব বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের আশ্বাস পেয়ে নিজেদের খরচে জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, সিসি ক্যামেরা, লাইট ও গেট স্থাপন করা হলেও সেখান থেকেও তাঁদের গাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, “রাস্তায় গাড়ি রাখলে ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট মামলা দেয়। পার্কিংয়ের অবকাঠামো তৈরিতে আমরা লাখ লাখ টাকা খরচ করেছি। প্রয়োজনে প্রতি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে নিয়মিত রাজস্ব দিতেও আমরা রাজি। তবে সুনির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা না পাওয়া পর্যন্ত ঢামেক থেকে সব ধরনের অ্যাম্বুলেন্স চলাচল বন্ধ থাকবে।”
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্বজনদের আর্তনাদ ও দুর্ভোগ:
অ্যাম্বুলেন্স না মেলায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও লাশ নিয়ে স্বজনদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে:
লাশ বহনে ৩ ঘণ্টার অপেক্ষা: নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা মো. শাহীন জানান, দুপুরে নতুন ভবনে তাঁর ৭০ বছর বয়সী দাদি হালিমা বেগম মারা যান। ৩ ঘণ্টা হন্যে হয়ে ঘুরেও একটি অ্যাম্বুলেন্স মেলাতে পারেননি তিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সুযোগও পাননি।
ভ্যানে করে লাশ নেওয়ার পরামর্শ: যাত্রাবাড়ীর মো. মনির হোসেন জানান, মেডিসিন বিভাগে মারা যাওয়া ২২ বছর বয়সী ভাগ্নে রাসেলের মরদেহ নেওয়ার কোনো গাড়ি না পেয়ে অসহায় অবস্থায় বসে ছিলেন। এক পর্যায়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের ভ্যানে করে মরদেহ নিয়ে যেতে বলেন।
সঙ্কটাপন্ন রোগীদের জীবনঝুঁকি: খুলনা থেকে শাশুড়িকে নিয়ে আসা আব্দুল আহাদ জানান, তাঁকে কিডনি হাসপাতালে রেফার করা হলেও দুপুর থেকে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় ঢামেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে।
অনেকে শেষমেশ লাশ ও মুমূর্ষু রোগীকে অটোরিকশা ও খোলা পিকআপ ভ্যানে করে নিজ নিজ গন্তব্যে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও সমাধান দাবি:
হাসপাতালের সাধারণ কর্মচারী ও ভুক্তভোগীদের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিচালকের উচিত ছিল দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করা।
তবে ধর্মঘট ও এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে জানতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এনএন/ ২৮ অক্টোবর ২০২৬




