
কানাডার কোনো নাগরিকত্ব অনুষ্ঠানে দৃশ্যটি খুব সাধারণ। সামনে ম্যাপল লিফের পতাকা, সারি সারি মানুষ, পাশে পরিবার। শপথের কয়েকটি বাক্য শেষ হওয়ার পর তাঁদের পরিচয়ে যোগ হয় নতুন একটি শব্দ, ‘Canadian’। কিন্তু দেশজুড়ে এমন হাজার হাজার অনুষ্ঠানের হিসাব একসঙ্গে করলে ছবিটি আর ছোট থাকে না। ২০২২ থেকে ২০২৪, মাত্র তিন বছরে কানাডার নাগরিকত্ব পেয়েছেন ১১ লাখ ৩০ হাজার ৫২৫ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নতুন কানাডিয়ান হয়েছেন।
২০২২ সালে নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৯৫ জন, ২০২৩ সালে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৮ জন এবং ২০২৪ সালে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৮৩২ জন। টানা তিন বছর প্রায় পৌনে চার লাখ করে মানুষ নাগরিকত্ব পাওয়ার ঘটনা কানাডার সাম্প্রতিক ইতিহাসে অভিবাসনের বিশাল প্রবাহের পরবর্তী অধ্যায়কেই সামনে আনে।
তবে এই ১১ লাখ মানুষকে নতুন করে কানাডায় আসা ১১ লাখ অভিবাসী ভাবলে ভুল হবে। তাঁদের অধিকাংশই কয়েক বছর ধরে কানাডায় বসবাসকারী স্থায়ী বাসিন্দা। কেউ এসেছেন দক্ষ কর্মী হিসেবে, কেউ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হয়ে পরে স্থায়ী হয়েছেন, কেউ পরিবারের সদস্য হিসেবে, কেউ শরণার্থী হিসেবে। নাগরিকত্ব তাঁদের কানাডা-যাত্রার শুরু নয়, বরং দীর্ঘ পথের শেষ গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক স্থায়ী বাসিন্দাকে নাগরিকত্বের আবেদন করার আগের পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৯৫ দিন কানাডায় শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হয়। আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয় এবং নির্দিষ্ট বয়সের আবেদনকারীদের ভাষা ও নাগরিকত্ব পরীক্ষার শর্তও পূরণ করতে হয়। অর্থাৎ নাগরিকত্বের আজকের সংখ্যা অনেকটাই কয়েক বছর আগে কানাডায় আসা মানুষের স্থায়ী হয়ে যাওয়ার ছবি।
সেই ছবিতে ভারত, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, চীন, ইরান, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশের মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। IRCC-এর ২০২৪–২৫ অর্থবছরের হিসাবে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৫ নতুন নাগরিকের মধ্যে শুধু ভারতেই জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৯১৫, প্রায় ২৩ শতাংশ। এরপর ছিল ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, চীন ও ইরান। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কানাডার নতুন নাগরিকদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্র কত দ্রুত বৈচিত্র্যময় হচ্ছে।
এদিকে কানাডার নাগরিকত্ব আইনেও সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ২০০৯ সালের ‘first-generation limit’-এর কারণে বিদেশে জন্ম নিয়ে বংশসূত্রে কানাডিয়ান হওয়া কোনো ব্যক্তির সন্তানও বিদেশে জন্মালে সাধারণভাবে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পেত না। ২০২৩ সালে Ontario Superior Court এই বিধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর আইন পরিবর্তন করা হয়। নতুন Bill C-3 ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়ার ফলে সেই সীমাবদ্ধতা শিথিল হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে বিদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানের কাছে নাগরিকত্ব দিতে বিদেশে জন্ম নেওয়া কানাডিয়ান পিতামাতাকে সন্তানের জন্মের আগে কানাডায় অন্তত ১ হাজার ৯৫ দিন থাকার প্রমাণ দেখাতে হবে।
এই বিপুল সংখ্যার সবচেয়ে বড় অর্থ অবশ্য শুধু অভিবাসনের পরিসংখ্যানে নেই। স্থায়ী বাসিন্দা নাগরিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন, প্রার্থী হতে পারেন, কানাডিয়ান পাসপোর্ট নিতে পারেন এবং দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ নেওয়ার অধিকার পান। ফলে নাগরিকত্বের প্রতিটি বড় ঢেউ ধীরে ধীরে ভোটার তালিকা, শহরের জনবিন্যাস, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং কানাডিয়ান পরিচয়ের ধারণাকেও বদলে দেয়। তিন বছরে ১১ লাখের বেশি মানুষের নাগরিকত্ব পাওয়া তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি বদলে যেতে থাকা কানাডারও একটি ছবি।
তথ্যসূত্র: Immigration, Refugees and Citizenship Canada (IRCC)
FAQ
১. কানাডার নাগরিকত্ব পেতে কত দিন কানাডায় থাকতে হয়?
সাধারণভাবে আবেদন করার আগের পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ১,০৯৫ দিন বা তিন বছর কানাডায় শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হয়।
২. কানাডার নাগরিকত্বের জন্য কি পরীক্ষা দিতে হয়?
১৮ থেকে ৫৪ বছর বয়সী আবেদনকারীদের সাধারণত নাগরিকত্ব পরীক্ষা দিতে হয়।
৩. নাগরিকত্বের জন্য ভাষার শর্ত কী?
১৮ থেকে ৫৪ বছর বয়সী আবেদনকারীদের ইংরেজি বা ফরাসি ভাষায় প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়।
৪. কানাডার নাগরিকত্ব পেলে কী ভোট দেওয়া যায়?
কানাডার নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্যতা পাওয়া যায়, যদি অন্যান্য নির্বাচনী যোগ্যতাও পূরণ করা হয়।
৫. Bill C-3 কী পরিবর্তন করেছে?
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর কার্যকর Bill C-3 বিদেশে জন্মানো কানাডিয়ানদের সন্তানদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব বংশসূত্রে পাওয়ার নিয়ম পরিবর্তন করেছে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রথম প্রজন্মের পরেও নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ তৈরি করেছে।
৬. বিদেশে জন্মানো কানাডিয়ান বাবা-মায়ের সন্তান কি নাগরিকত্ব পেতে পারে?
নতুন নিয়মে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে পারে। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ বা তার পরে বিদেশে জন্মানো দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষেত্রে কানাডিয়ান বাবা বা মায়ের আগে অন্তত ১,০৯৫ দিন কানাডায় শারীরিক উপস্থিতি থাকার প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে।

