বাংলাদেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং যাতায়াত ব্যবস্থার প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে আছে নদীগুলোর বুকে। কিন্তু বিগত ৫৪ বছরে দেশের বিভিন্ন নৌপথে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এবং ঈদের মতো উৎসবগুলোতে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের আনন্দযাত্রা রূপ নেয় গণকবরে। নদীপথের এই অনিরাপত্তা এবং অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে লড়াই করে আসছে সামাজিক সংগঠন নোঙর।
এই প্রেক্ষাপটে, ২০০৪ সালের ২৩ মে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক লঞ্চ ট্র্যাজেডিকে স্মরণ করে প্রতিবছর ২৩ মে-কে সরকারিভাবে জাতীয় নদী দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়েছে সামাজিক সংগঠন ‘নোঙর ট্রাস্ট’।
গত শনিবার (২৩ মে) সকাল ৯টায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত একটি বর্ণাঢ্য বাইসাইকেল র্যালির আয়োজন করে নোঙর ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদ।
সকাল ১০ টা ৩০ মিনিটে নোঙর ট্রাস্ট আয়োজিত আলোচনা সভায় দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা অংশ নেন। আলোচনা সভায় জনসম্পৃক্ত নদী ব্যবস্থাপনার উপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিভারাইন পিপরৈ মহাসচিব শেখ রোকন। সেখানে এসব কথা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, নদী বাঁচলে বাঁচবে এ দেশের কৃষি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। কারণ বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ-নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে।
২৩ মে ২০০৪ সালে মেঘনা নদীতে মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে নোঙর-এর জাতীয় নদী দিবস ঘোষণার আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, জনসম্পৃক্ত নদী ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করে জনগণকে সাথে নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে একটি বাস্তব ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। কারণ নদীর সাথে দেশের ভাগ্য জড়িত। দেশে ছোটো-বড় প্রায় ১৪১৫টি নদী রয়েছে, এসব নদী একএকটি জীবন্ত সত্তা। নদী ব্যবস্থাপনায় জনসম্পৃক্ততা আরও বাড়ানো প্রয়োজন মন্তব্য করেন তিনি।
এসময় তিনি আরও বলেন, ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাবের কারণে দেশের ২৪টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সর্বোচ্চ জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিচ্ছেন। আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। খাল খননের সাথে খাল ও নদীর অবৈধ দখল ও দূষণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী উদ্যোগ। নদী রক্ষায় জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে জাতীয় নদী দিবস ঘোষণার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
পরিবেশবিদদের মতে, নদী রক্ষা শুধু আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করার একটি জাতীয় দায়িত্ব। কারণ নদী বাঁচলে, বাঁচবে বাংলাদেশ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিছুর রহমান খোকন বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ- এ কথাটি যেমন আমাদের জন্য গৌরবের, তেমনি এক চরম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। নদী বেঁচে থাকলে এ দেশের কৃষি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষ বাঁচবে। নদী রক্ষা এবং নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার খাল খনন কর্মসুচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দখলকৃত খাল ও নদী উদ্ধার কার্যক্রম আরও বেগবান করতে সরকারে আন্তরিক প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় তিনি নদী বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে তাদের সংগ্রাম অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরও বাস্তবসম্মত নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। নৌ-দুর্ঘটনায় নিহত হাজারো মানুষ কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, তারা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার শিকার। নদীপথের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, নদী গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী আইরিন সুলতানা, কসমস সমাজ উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী মেহনাজ পারভীন মালা, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পরিবেশ শাখা), পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) মোহাম্মদ আলমগীর, অগ্রযাত্রা নারী ফোরাম ও সমন্বয়ক, হাওরঅঞ্চলবাসী’র আহ্বায়ক জাকিয়া শিশির, এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী এবং চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী, মেরিন হাউজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং নৌ স্থপতি ও সামুদ্রিক পরামর্শক প্রকৌশলী মো. শামসুল আলম, জাইকা বাংলাদেশের উপদেষ্টা প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান, সেন্টার ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ড. মাহমুদুল ইসলাম, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার প্রেসিডেন্ট বদিউজ্জামান বাদল, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া, সাবেক রাষ্ট্রদূত মসয়ুদ মান্নান, চ্যানেল আই-এর বার্তা সম্পাদক মীর মাশরুর জামান।
২৩ মে-কে জাতীয় নদী দিবস ঘোষণার যৌক্তিক কারণসমূহ:
বর্তমানে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার ‘বিশ্ব নদী দিবস’ পালিত হলেও বাংলাদেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে একটি ‘জাতীয় নদী দিবস’ থাকা আবশ্যক বলে মনে করে নোঙর ট্রাস্ট। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ তুলে ধরা হয়:
• ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির স্মারক: ২০০৪ সালের ২৩ মে চাঁদপুরের মেঘনায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে এমভি লাইটিং সান এমভি দিগন্ত এবং এমভি মজলিমপুর ডুবে দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে সন্তানকে বাঁচিয়ে তলিয়ে যাওয়া মা আছিয়া খাতুন আজ বাংলার নদীমাতৃক ট্র্যাজেডিতে ত্যাগের প্রতীক। এই ভয়াল দিনটিকে স্মরণ করেই দিবসটির দাবি জানানো হচ্ছে।
• ‘নৌ-শহীদ’ স্বীকৃতি ও স্মৃতিস্তম্ভ: নিহতদের নৌ-শহীদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, চাঁদপুর দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় আধুনিক ওয়াচ টাওয়ার এবং নৌ-শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে, যা বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ-এর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে।
• নিরাপত্তা সচেতনতা ক্যাম্পেইন: ২৩ মে জাতীয় দিবস ঘোষিত হলে প্রতিবছর বর্ষা ও উৎসবের মৌসুমে ফিটনেসবিহীন নৌযান, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং চালকদের অসচেতনতার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বড় ধরনের ক্যাম্পেইন চালানো সম্ভব হবে।
• পদ্মাকে ‘জাতীয় নদী’র স্বীকৃতি: বাংলাদেশের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে প্রমত্তা নদী পদ্মাকে নোঙর ট্রাস্ট ইতোমধ্যে জাতীয় নদী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২৩ মে-কে জাতীয় নদী দিবস করলে এই গৌরবময় অবস্থানটি রাষ্ট্রীয়ভাবে সিলমোহর পাবে।
নদী ও সমুদ্রসম্পদ মন্ত্রণালয় গঠনের জোরালো দাবি
বর্তমানে নদী, সমুদ্র এবং জলাশয় রক্ষার কাজগুলো পানিসম্পদ, নৌ-পরিবহন এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে খণ্ডিতভাবে বিভক্ত। সঠিক সমন্বয়ের অভাবে নদী দখল, দূষণ এবং নৌ-দুর্ঘটনা রোধে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্লু-ইকোনমি (নীল অর্থনীতি) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নোঙর ট্রাস্ট একটি সমন্বিত নদী ও সমুদ্রসম্পদ মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানাচ্ছে। এই দাবি আদায়ে এবং নদী-সমুদ্রের আইনি অধিকার রক্ষায় নোঙর ট্রাস্ট উচ্চ আদালতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করছে বলে জানানো হয়। একটি পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলে নদীভাঙন রোধ, নাব্যতা বৃদ্ধি এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে একক ও শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জনসম্পৃক্ত নদী ব্যবস্থাপনা’।






