নবীজি ও ফাতেমা: পিতা-কন্যার অতুলনীয় ভালোবাসা

নবীজি ও ফাতেমা: পিতা-কন্যার অতুলনীয় ভালোবাসা

নবীকন্যা ফাতেমা (রা.) একজন আদর্শ কন্যা, আদর্শ স্ত্রী ও আদর্শ মায়ের প্রতিচ্ছবি। তিনি আজও মুসলিম নারী সমাজের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।

কঠিন সময়ে আল্লাহর বিশেষ সান্ত্বনা

নবুয়ত লাভের পর আল্লাহর নির্দেশে রাসুল (সা.) প্রথম তিন বছর প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে পারেন নি। যেদিন থেকে প্রকাশ্যে আত্মীয়স্বজন ও মক্কার মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান, শুরু হয় তীব্র বিরোধিতা।

কোরাইশ নেতারা এমনকি তাঁর নিজ চাচা আবু লাহাব পর্যন্ত ইসলামবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে তাঁকে নানা নির্যাতন, নিপীড়ন, অপমান ও কটূক্তি করতে থাকে।

এ সময় রাসুলের জীবনে আরেকটি গভীর বেদনা নেমে আসে। তাঁর পুত্রসন্তানেরা শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুশরিকরা তাঁকে বিদ্রূপ করতে শুরু করে। বিশেষ করে আস ইবনে ওয়ায়েল তাঁকে ‘আবতার’ অর্থাৎ নির্বংশ বলে কটাক্ষ করত।

তাদের ধারণা ছিল, তাঁর কোনো পুত্রসন্তান নেই, তাই মৃত্যুর পর তাঁর নাম-নিশানও বিলীন হয়ে যাবে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৬/৫০৮, দার আল-কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ১৪৩২ হিজরি)

এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতে আল্লাহ সুরা কাউসার অবতীর্ণ করে তাঁর প্রিয় রাসুলকে সান্ত্বনা দেন এবং ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আপনার শত্রুই নির্বংশ।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ৩)

আল্লাহর এ ঘোষণা পরবর্তী ইতিহাসে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে। যারা রাসুলকে ‘আবতার’ বলে বিদ্রূপ করেছিল, তারাই প্রকৃত অর্থে কল্যাণ ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে আল্লাহর ইচ্ছায় ফাতেমার মাধ্যমেই রাসুলের পবিত্র বংশধারা পৃথিবীতে অব্যাহত রয়েছে।

জান্নাতি নারীদের প্রধান

ফাতেমা (রা.) ছিলেন রাসুলের সবচেয়ে প্রিয় কন্যা। তাঁর ইবাদত, তাকওয়া, আত্মমর্যাদা ও চারিত্রিক সৌন্দর্য তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিল। রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘ফাতেমা জান্নাতি নারীদের প্রধান হবেন।’ (সুয়ুতি, জামেউস সাগির, হাদিস: ৫৮১৭)

তিনি নারীদের জন্য তো অবশ্যই, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য অনন্য আদর্শ। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় মানুষকে ধৈর্য, ত্যাগ, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার শিক্ষা দেয়।

সাদাসিধে জীবনের অনন্য দৃষ্টান্ত

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বহু খ্যাতিমান সাহাবি তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে দ্বিতীয় হিজরিতে রাসুল (সা.) তাঁর চাচাতো ভাই আলীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন করেন। মোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় চার শ আশি দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা)। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১২৬)

এই বিয়ে ছিল সরলতা ও বরকতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নবীজি তাঁর কন্যাকে বিদায়ের সময় যে সামগ্রী দিয়েছিলেন, তা ছিল একটি চাদর, খেজুরগাছের আঁশভর্তি একটি বালিশ, চামড়ার তৈরি একটি বিছানা, একটি দড়ির খাট, একটি মশক এবং একটি জাঁতা। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৮৫৩)

এতে বোঝা যায়, ইসলামে দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য বিলাসিতায় নয়, বরং তাকওয়া, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় নিহিত।

পিতা-কন্যার অতুলনীয় ভালোবাসা

ফাতেমার সঙ্গে নবীজির সম্পর্ক ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পিতা-কন্যার সম্পর্ক। তিনি তাঁকে এতটাই ভালোবাসতেন যে বলে দিয়েছেন, ‘ফাতেমা আমারই একটি অংশ। যে তাকে কষ্ট দিল, সে আমাকে কষ্ট দিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭১৪)

রাসুলের জীবনের শেষ সময়ে তাঁর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র জীবিত ছিলেন ফাতেমা। মৃত্যুশয্যায় তিনি কন্যাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই প্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে।’ (বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৭২৫)

নবীজির এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়। ১১ হিজরিতে রাসুলের ইন্তিকালের ছয় মাসের মধ্যেই ফাতেমা (রা.) ইন্তিকাল করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০৯২)

পিতার কষ্টে ব্যথিত একজন আদর্শ কন্যা

মক্কাজীবনের একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। একদিন নবীজি কাবা শরিফের পাশে সেজদারত ছিলেন। এ সময় অভিশপ্ত উকবা ইবনে আবি মুআইত একটি উটের পচা নাড়িভুঁড়ি এনে তাঁর পবিত্র পিঠে ফেলে দেয়। দূরে দাঁড়িয়ে কোরাইশ নেতারা এ দৃশ্য দেখে হাসাহাসি করছিল।

নবীজি সেজদা থেকে মাথা তুলতে পারছিলেন না। খবরটি ছোট্ট ফাতেমার কাছে পৌঁছতেই তিনি দৌড়ে সেখানে চলে আসেন। নিজের হাতে পিতার পিঠ থেকে নোংরা নাড়িভুঁড়ি সরিয়ে দেন।

নবীজি সেজদা থেকে মাথা তুলতে পারছিলেন না। খবরটি ছোট্ট ফাতেমার কাছে পৌঁছতেই তিনি দৌড়ে সেখানে চলে আসেন। নিজের হাতে পিতার পিঠ থেকে নোংরা নাড়িভুঁড়ি সরিয়ে দেন। এরপর তিনি মুশরিকদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪০)

সফর থেকে ফিরে প্রথমে কন্যার কাছে

রাসুল (সা.) কোনো সফর থেকে ফিরে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। এরপর তিনি সবার আগে তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতেমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। এটি ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস। (ইবনে হাজার আসকালানি, হিদায়াতুর রুওয়াত, ৪/২৪৭, দারে ইবনুল কায়্যিম, দাম্মাম, ১৪২২ হিজরি)

এ থেকেই বোঝা যায়, ব্যস্ততম জীবন, রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা দাওয়াতি কাজের মাঝেও পরিবারকে সময় দেওয়া এবং সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা সুন্নতের অংশ।

একবার সফর থেকে ফিরে এলে রাসুলকে স্বাগত জানাতে ফাতেমা (রা.) এগিয়ে এলেন। পিতার ক্লান্ত চেহারা ও সাধারণ জীর্ণ পোশাক দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। রাসুল জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাঁদছ কেন?’

তিনি নিজের কষ্টের কথা জানালে নবীজি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘কেঁদো না, ফাতেমা। আল্লাহ তোমার পিতাকে এমন এক ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন, যা একদিন পৃথিবীর প্রতিটি কাঁচা-পাকা ঘরে পৌঁছে যাবে।’ (তাবরানি, আল-মুজামুল কাবির, ২২/২২৫, মাকতাবাতু ইবনে তাইমিয়া, কায়রো)

আজ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই ইসলামের উপস্থিতি এবং কোটি কোটি মানুষের ইমান এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করছে।

পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান একজন সন্তানের সর্বোচ্চ গুণগুলোর একটি। আজকের সমাজে, যেখানে পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, সেখানে ফাতেমার জীবন প্রতিটি পরিবার, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর চরিত্র, ইবাদত, আত্মত্যাগ এবং পিতার প্রতি অগাধ ভালোবাসা আমাদের পারিবারিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে উদ্বুদ্ধ করে।

  • নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

    nahidasultana753375@gmail.com