নিভে গেলেন প্রদীপ, নাট্যাঙ্গন কি তাকে মনে রাখবে? | চ্যানেল আই অনলাইন

নিভে গেলেন প্রদীপ, নাট্যাঙ্গন কি তাকে মনে রাখবে? | চ্যানেল আই অনলাইন

ঢাকার নাটকপাড়ায় থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নাটক যারা মঞ্চে দেখেছেন, তাদের মধ্যে হাসনাত প্রদীপকে চেনেন না- এমন কমই আছেন। ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘আমিনা সুন্দরী’, ‘সময়ের প্রয়োজনে’সহ কত কত নাটক, আর তাঁর কী দূর্দান্ত অভিনয়! শেষ দিকে টেলিভিশন নাটকেও নিয়মিত অভিনয় করতেন। তবে মঞ্চেই হাসনাত প্রদীপ ছিলেন অনন্য। গত এপ্রিলেও তিনি মঞ্চে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত শেষ নাটক ছিল ‘বলয়’।

২০০৮ সালের শেষের দিকে থিয়েটার আর্ট ইউনিটে যুক্ত হওয়ার পর যে কজনকে নিয়মিত মহড়া কক্ষে দেখতাম, তাদের অন্যতম ছিলেন হাসনাত প্রদীপ। কয়েক বছর পর জেনেছিলাম, তিনি গাজীপুরের কোনাবাড়িতে থাকেন এবং প্রতিদিন সেখান থেকে ঢাকায় এসে নাটকের মহড়া এবং প্রদর্শনীতে অংশ নেন। আমরা যারা ঢাকা শহরে থেকেও যানজট আর নানা অজুহাতে মহড়ায় ফাঁকি দিতাম, তাদের কাছে হাসনাত প্রদীপ ছিল এক বিস্ময়ের নাম।

মর্ষকাম নাটকে হাসনাত প্রদীপ।

প্রদীপদাকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঘুমান কখন? তিনি মুখে হাসি নিয়ে বলেছিলেন, ‘বাসের মধ্যেই ঘুমাই’।
তিনি তখন মিরপুরে একটা অফিসে চাকরি করতেন। সকালে কোনাবাড়ি থেকে মিরপুরে এসে অফিস করতেন। বিকেলে অফিস শেষ হলে সহকর্মীরা ঘরে ফিরতো। আর হাসনাত প্রদীপ অপেক্ষা করতেন সন্ধ্যায় মহড়ার জন্য। কখনো শিল্পকলায় একা বসে থাকতেন। থিয়েটার আর্ট ইউনিট তখন গুলিস্তানের কর্নেল তাহের মিলনায়তনে মহড়া করতো। সন্ধ্যা ৭টায় মহড়া শুরুর আগেই উপস্থিত হাসনাত প্রদীপ। মহড়া শেষ হতে হতে রাত ১০টা। এরপর গাজীপুরের বাসে চেপে বসতেন তিনি। বাসেই কিছুটা ঘুমিয়ে নিতেন। তারপর কোনাবাড়ি পোঁছাতে কখনো রাত ২টা বেজে যেত। পরদিন সকালে আবার অফিস। তবুও ক্লান্তি নেই। বিরামহীন তার ছুটে চলা। থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নতুন কোনো নাটকের মহড়া কিংবা ঢাকার বাইরে কোনো নাটকের মঞ্চায়ন। সবকিছুতেই সক্রিয় হাসনাত প্রদীপ।

মহড়া কক্ষ বা শিল্পকলায় তাঁকে কখনো ক্লান্ত দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আমরা থিয়েটার নিয়ে কত কত হতাশার কথা বলতাম। প্রদীপদা সব সময় আশাবাদী ছিলেন। কতজনকে দেখেছি- থিয়েটারে এসে কত ত্যাগ স্বীকার করলাম, বিনিময়ে কী পেলাম? সেই হিসাব মেলাতে চাইতেন। কিন্তু প্রদীপদাকে কখনোই সেই হিসাবের খাতা খুলতে দেখিনি। তিনি থিয়েটারকে কেবল দিয়েই গেছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি থিয়েটারে যুক্ত থেকেছেন। কিন্তু এখান থেকে প্রাপ্তি কী, তা মেলাতেন না। বরং মনের আনন্দে থিয়েটারে আরো বেশি নিবিষ্ট থেকেছেন।

থিয়েটার আর্ট ইউনিট প্রযোজিত ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকের দৃশ্য

হাসনাত প্রদীপ চলে গেলেন অনন্তলোকে। আজ বুধবারের সকালটা শুরু হলো তাঁর মৃত্যুসংবাদ জেনে। ঘুম থেকে জেগেই প্রদীপ দার ফেসবুক পোস্টে দেখি তার ছেলে লিখলেন বাবার মৃত্যু খবর। স্তব্ধ হয়ে গেলাম কিছুটা সময়। বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চ থেকে নিভে গেলে হাসনাত নামক প্রদীপটির আলো।

থিয়েটারের জন্য এমন নিবেদিতপ্রাণ মানুষটিকে কি বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন মনে রাখবে? সকাল থেকে এমন নানা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। থিয়েটার ছেড়ে যখন সাংবাদিকতায় সক্রিয় হতে শুরু করেছি, তখন প্রদীপদাকে একাধিকবার বলেছিলাম- আপনাকে নিয়ে একটা নিউজ করবো। থিয়েটারের জন্য আপনার ত্যাগের গল্পটা লিখবো। তিনি হাসিমুখে বলতেন, ‘লিখিস পরে’।

সবকিছুকেই সহজ করে দেখবার একটা অদ্ভূত গুণ ছিল তাঁর। আমাদের চারপাশের নানা জটিল চক্রের মাঝেও তিনি অবিচল থেকেছেন, সহজ থেকেছেন। থিয়েটার জড়িয়ে ছিল তাঁর জীবনের সাথে।

‘কোর্ট মার্শাল’-এ হাসনাত প্রদীপ

থিয়েটার আর্ট ইউনিটের আরেক নাট্যকর্মী সৈয়দ অলক মারা গিয়েছিলেন ২০২১ সালের ৩ জুন। এ মাসের প্রথম সপ্তাহেই ফেসবুকে সৈয়দ অলকের কথা স্মরণ করেছিলেন তিনি। কে জানতো প্রদীপ দা নিজেও এত দ্রুত চলে যাবে সৈয়দ অলকের কাছে।

গত এপ্রিল মাসেও থিয়েটার আর্ট ইউনিট প্রযোজিত ‘বলয়’ নাটকের পোস্টার শেয়ার করে সবাইকে নাটক দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আর এখন তিনি অনেক দূরে। যেখান থেকে আর কেউ ফেরে না। হাসনাত প্রদীপকে কতটা মনে রাখবে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন? তা জানা নেই। হয়তো প্রদীপেরা এমনই নিরবে-নিভৃতে নিজের কাজটা করেন নিবিষ্টমনে। অনন্তলোকে ভালো থাকুন হাসনাত প্রদীপ।