নিরিবিলি জীবনপ্রেমী জলের জাদুকর

নিরিবিলি জীবনপ্রেমী জলের জাদুকর

মাথাটা ঝিমঝিম করছে। গ্রীষ্মের আগ্রাসনে নিশ্বাসও বুঝি আগুনের হলকা! আমি চেয়ারে বসে আধমরা হয়ে ভাবছি, তোমাদের জন্য কী লেখা যায়! সারা মাসে যা যা দেখি, লেখার উপাদান হিসেবে তার অধিকাংশই আদর্শ নয়। নানা আঙ্গিক আর বিবেচনায় যথার্থ হলে তবেই তা ছাপা হয়, নচেৎ নয়! তাই বহু আগ্রহ থাকলেও অনেক প্রিয় অ্যানিমে নিয়ে লেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

ফুটবল বিশ্বকাপের মাসও চলছে, চাইলেই ফুটবল নিয়ে লেখা যায়। তবে ফুটবল নিয়ে ঠিকঠাক অ্যানিমে প্রায় নেই বললেই চলে। ইতিপূর্বে তোমাদের অনুরোধে ব্লু-লক নিয়ে বলেছি। চাইলে ইনাজুমা ইলেভেন নিয়েও বলা যায়, কিংবা আও-আশি। কিন্তু ব্লু-লকপ্রেমীদের ওসব পছন্দ না-ও হতে পারে। তাই গরমে ঘামতে ঘামতে সিদ্ধান্ত নিলাম, তোমাদের আজ বলব এক জলের জাদুকরের গল্প।

আজ যে অ্যানিমের গল্প করব, তার জাপানিজ নাম ‘মিজু জকুসেই নো মাহোস্কাই’, অর্থাৎ জলের জাদুকর। অবশ্য ইংরেজি নামটাই অনলাইনে তোমাদের বেশি চোখে পড়বে, ‘দ্য ওয়াটার ম্যাজিশিয়ান’। কে এই জাদুকর, তা জানা যাবে গল্পের শুরুতেই।

আর দশটা ই-সেকাই অ্যানিমের মতো এই গল্পও শুরু হয় গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মিহারা রুয়োর পুনর্জন্ম দিয়ে। রুয়ো। এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে সে হাজির হয় এক দেবদূতের সামনে। দেবদূত জানায় রুয়োকে পরজন্মে পাঠানো হচ্ছে জাদু-সক্রিয় পৃথিবী ফাইতে। সেখানে প্রায় ২০ শতাংশ লোক জাদু করতে পারে। রুয়োকে দেওয়া হয় জলের জাদু করার দক্ষতা। আর যেহেতু সে নিরিবিলি একটা জীবনের জন্য আবদার করে, তাই তাকে পাঠানো হয় রন্ডোর ঘন জঙ্গলে। সেখানে একটা বাড়ি দেওয়া হয় তাকে, যেখানে সরাসরি কোনো জংলি জন্তু বা দানব আক্রমণ করতে পারবে না। আর দেওয়া হয় দুই মাসের খাবার ও কিছু উপযোগী বইপত্র।

বইপত্র পড়ে জাদুর কিছু প্রাথমিক সূত্র আয়ত্ত করে ছেলেটা। কিন্তু একপর্যায়ে বুঝতে পারে প্রথাগত পদ্ধতি ছাড়াও জাদু করা সম্ভব। এ জগতে মূলত নির্দিষ্ট মন্ত্র আওড়ে জাদু করার নিয়ম, আর প্রতিটি জাদুতে প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত মানা অর্থাৎ ম্যাজিক্যাল এনার্জি। কিন্তু রুয়ো বুঝতে পারে, তার অতীত জীবনের পদার্থবিজ্ঞান আর রসায়নশিক্ষার জ্ঞানও এখানে কাজ করে। ফলে জলে অবস্থিত হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন অণুকে উপযুক্ত আঙ্গিকে নেড়েচেড়ে কাজে লাগায় সে। মুহূর্তে জল হয় বরফ, কিংবা বাষ্প।

ক্রমেই নিজের কল্পনা আর জাদু আরও শক্তিশালী করার কাজে মন দেয় সে। মজুত খাবার ফুরিয়ে যাবে অচিরেই, তাই শিকারের চিন্তাও ঘোরে তার মাথায়। মোটামুটি দক্ষতা নিশ্চিত হতে ঘরের নিরাপদ গণ্ডি ছেড়ে জঙ্গলে হানা দেয় রুয়ো। খুঁজে বেড়ায় খুঁটিনাটি। একপর্যায়ে শিকার হয় আক্রমণের। নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে হাসিল করে বিজয়। এভাবেই নিয়মিত অভিযানে আরও শক্তিশালী হয় তার জাদু। নানা অভিজ্ঞতা তাকে করে তোলে আত্মবিশ্বাসী।

একদিন জঙ্গলের এক জলাশয়ে বিচিত্র মুণ্ডুহীন এক বর্মের দেখা পায় রুয়ো। মোটামুটি দেখতে চলাফেরা করা মানুষের মতোই, শুধু মাথাটা নেই। এর পর থেকে প্রায়ই সেখানে যেতে শুরু করে ও, লড়াই করতে। এই লড়াইগুলো কঠিন, রুয়ো জিততে পারে না, তবে হেরেও শেখে অনেক কিছু। এই বিচিত্র প্রাণীর কোনো বর্ণনা তার কাছে থাকা বইগুলোতে নেই। তবে একে নিজের অস্ত্রশিক্ষা গুরু ভাবতে কিছুমাত্র অসুবিধা হয় না তার। পরবর্তীকালে সে জানতে পারে, এ আসলে স্পিরিট কিং, অর্থাৎ আত্মাদের রাজা। গুরু খুশি হয়ে তাকে উপহার দেয় তলোয়ার, পোশাক। সেগুলো অমূল্য সম্পদ হয়ে ওঠে তার জন্য।

এরও কিছুদিন পর জঙ্গলঘেঁষা সমুদ্রতটে এক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পায় ও। কাছে গিয়ে খুঁজে পায় এক জীবিত ছেলেকে। অচেতন ছেলেটার অবস্থা মুমূর্ষু। তাকে কোনোক্রমে বাড়ি নিয়ে আসে ও। সুস্থ করে তোলে। ছেলেটির নাম আবেল। দ্রুতই বন্ধুত্ব হয় দুজনের। আবেল জানায়, সে মূলত লুন শহরে থাকে। এখানে এসে পড়েছে ঘটনাচক্রে। যেহেতু এ তল্লাটের সবকিছুই আবেলের অচেনা, সে রুয়োর সাহায্য চায় শহরে ফিরতে। রুয়ো যদিও জঙ্গলের বাইরে কখনো যায়নি, এ ছাড়া নিরিবিলি জীবনই সে পছন্দ করে। তবু এত দিন একাকী থেকে তারও কিছুটা একঘেয়েমি এসে পড়েছিল। আবেলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় সে। দুজনে নানা প্রতিঘাত সামলে ফেরে শহরে।

শহরের নতুন বাতাবরণে ভালোই লাগে রুয়োর। বন্ধু আবেল তো রয়েছেই, সঙ্গে আরও কিছু বন্ধু জুটে যায় তার। অভিযাত্রী সংঘে যোগ দেয় সে, করে নানা অভিযান। এ ছাড়া এই পৃথিবী আর সমাজকে জানারও অগাধ আগ্রহ তার। সেই আগ্রহে বাতাস দিতে মাঝেমধ্যে সে চলে যায় পাঠাগারে। বই পড়ে পৃথিবীকে জানে, নিয়মকানুন শেখে। পাঠাগারে অবশ্য আরেকজনের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব হয় ওর। মেয়েটির নাম সেরা; সে মূলত এলফ প্রজাতির জাতক। অভিযাত্রী হিসেবে সে রুয়োর তুলনায় বেশ কয়েক ধাপ ওপরে আছে বলে লাইব্রেরির কিছু সংরক্ষিত অঞ্চলে তার প্রবেশাধিকার রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই সেরা আরও বই এনে দেয় রুয়োকে।

এমনই কাটে রুয়োর অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি জীবন। পুরো অ্যানিমেই টুকিটাকি লড়াই আর ঘটনার ফাঁকে ফাঁকে তাকে সাধারণ কাজে মগ্ন থাকতে দেখা যায়। এসব সময় গল্পের অন্য চরিত্রদের দিকে চলে যায় ঘটনার মনোযোগ। আমার কাছে এই ব্যাপার চমৎকার লেগেছে। সাধারণত ই-সেকাই অ্যানিমেতে মূল চরিত্রের বাইরে অন্য চরিত্রদের এতখানি গুরুত্ব থাকে না। তবে দ্য ওয়াটার ম্যাজিশিয়ানে আবেল অনেকটা জুড়েই আছে। প্রয়োজনে কখনোবা রুয়োর বাকি বন্ধুদের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব দৃশ্যে রুয়ো একেবারেই নেই। সে হয়তো ওই একই সময়ে লাইব্রেরির কোনো বইয়ে ডুবে আছে, কিংবা কোনো রেস্তোরাঁয় বসে মনের সুখে খাওয়াদাওয়া করছে।

লেখক তাদাশি কুবোর লেখা লাইট নভেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে এই অ্যানিমে সিরিজ। মূলত এটাই লেখকের সর্বাধিক জনপ্রিয় তথা ধারাবাহিক প্রকাশিত কাজ। গল্পটা শুরুতে অনলাইন ওয়েবসাইট শোসেৎসুকা নি নারোতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে জে-নভেল ক্লাব বইগুলো ইংরেজিতে প্রকাশের লাইসেন্স গ্রহণ করেন এবং শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে কাজটা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নভেলগুলোতে ছবি আঁকার কাজ করেছেন যথাক্রমে আঁকিয়ে নকিতো, মেবারু ও হানা আমানো।

কোনো গল্পে মূল চরিত্রদের মধ্যে একটা জুতসই বন্ধুত্ব থাকলে আমার বড় আনন্দ হয়। এই বইতেও আবেল আর রুয়োর বন্ধুত্ব আমাকে খুশি করেছে। বিভিন্ন সময়ে এদের খুনসুটি করতে দেখা গেছে পরস্পরের সঙ্গে। বিশেষ করে রুয়ো সুযোগ পেলেই আবেলের সঙ্গে মজা নেয়। বাইরে খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দিয়েছে তাকে। আবার বন্ধুর বিপদে দ্রুত ছুটে গেছে সবকিছু ভুলে। আর আবেলও বন্ধুকে নিরাপদ আর নির্ঝঞ্ঝাটে থাকার সুযোগ করে দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে বিভিন্ন সময়ে। যখনই রুয়োর দক্ষতা বা উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলেছে, রুখে দাঁড়িয়েছে আবেল।

সেরার সঙ্গে রুয়োর যোগাযোগের ব্যাপারটাও বেশ মিষ্টি। এ ছাড়া অভিযাত্রী জীবনের শুরুর দিকে ওর তিনজন বন্ধু হয়—এতো, আমন আর নিলস। এরা দক্ষতায় রুয়োর অনেক পিছে থাকায় সে নিজের উদ্যোগে এদের প্রশিক্ষিত করতে চেষ্টা করে। গল্পে এদের কাহিনিও আলাদা করে ডালপালা ছড়িয়েছে।

তবে এতক্ষণ যা বললাম, তাতে কাহিনিটা শুধুই একমুখী আনন্দের আর ঝঞ্ঝাটহীন মনে হতে পারে! যদিও আসলে তা নয়। নানা সময়ে পাতাল থেকে উঠে আসা দানব, কিংবা আচমকা করে হাজির হওয়া ডেমনরা হুমকির কারণ হয়ে ওঠে। প্রথম সিজনে কয়েকটা সময় এমন তীব্র আক্রমণ দেখা গেছে। তার সব কটিতে অবশ্য রুয়ো সরাসরি লড়াই করেনি। তবে ভবিষ্যতে বড় বড় সংঘাতের আশঙ্কা থেকে গেছে। আমি আপাতত সেই অপেক্ষায় আছি। এ ছাড়া কিছু পরিচিত চরিত্রের উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা রাখা হয়েছে। এসব রহস্যও পরবর্তীকালে কোন দিকে যাবে, সেটাও দেখার অপেক্ষায় আছি।

এই সিরিজের পর্বগুলো ভেতরে থাকা সুর ও ইফেক্ট চলনসই। যদিও তোমরা যদি উইচ হ্যাট অ্যাটেলিয়ার, ফ্রেইরেন, দান-দা-দান, জুজুৎসু কাইসেন, ডেমন স্লেয়ার, ফুল মেটাল আলকেমিস্ট ব্রাদারহুডের মতো বড় বড় বাজেটের অ্যানিমে প্রোডাকশন দেখে অভ্যস্ত হয়ে থাকো, তাহলে এই অ্যানিমের সুর, অ্যানিমেশন কোয়ালিটি তোমাদের কিঞ্চিৎ হতাশ করতে পারে। আমার অন্তত দ্য ওয়াটার ম্যাজিশিয়ান দেখে অত বড় বাজেটের অ্যানিমে বলে মনে হয়নি। সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে শুরুর গানটা। অ্যানিমেতে ব্যবহার করা হয়েছে দুটো গান—মেইও দেনসেৎসুর গাওয়া ‘ব্লু মোশন’, আর মিসাকির গাওয়া ‘তায়উতাউ মামা নি’। মিসাকির গানটা অবশ্য বেশ ভালো ছিল।

সবশেষে বলব, বড় বড় নামকরা অ্যানিমের ভিড়ে এসব টুকিটাকি লুকিয়ে থাকা অ্যানিমে মাঝেমধ্যে চেখে দেখতে পারো। পুরোনো স্বাদ হয়তো নতুন করে পাবে। নব্বই বা তার পরবর্তী দশকের শুরুতে অ্যানিমেতে এত সুরের মারপ্যাঁচ ছিল না, এত চমৎকার রং কিংবা মসৃণ দৃশ্যপট ছিল না। তবু তখনো তো অ্যানিমে দেখে দিব্যি আনন্দ পাওয়া যেত। আজও যদি তুমি পুরোনো দিনের ট্রাইগান আর নতুন নির্মিত ট্রাইগান দেখতে বসো, তাহলে দেখবে পুরোনোটাই বেশি আনন্দ দিচ্ছে। সেতো-নো হানায়োমে, আজুমাঙ্গা দায়ো, লাকি স্টার, ফুরিকুরি, জঙ্গল ওয়া ইৎসুমো হালে নচি গু, বাসিলিস্ক, আউট-ল স্টার, রাজেফন, ইনিশিয়াল-ডি, মনস্টার, স্লাম-ডাঙ্ক, কিও কারা ওরে ওয়া, ফুল মেটাল প্যানিক, ভ্যানড্রেড, ফ্লেম অফ রেকা, হিকারু নো গো, আরও কত কত ভালো ভালো অ্যানিমে যা দেখে নিখাদ বিনোদন পেয়েছি, তা আজকে আর প্রায় কেউই দেখে না। বড় আফসোস হয়। ঝা-চকচকে নতুনত্বের ভিড়ে পুরোনোকে ভুলে যাওয়াই হয়তো নিয়ম। তবু মনে হয়, তোমরা কিছু ভালো অ্যানিমে খুঁজে দেখো, আনন্দ পাও। নাহ্‌, দ্য ওয়াটার ম্যাজিশিয়ানকে হয়তো সেই অর্থে কিংবদন্তি অ্যানিমের কাতারে রাখা যাবে না। তবে সেই পুরোনো দিনের অ্যানিমে দেখার একটা আবেশ এতে পাওয়া যাবে। তা–ও কম কী! তোমরা যারা একেবারেই পুরোনো অ্যানিমে দেখতে আগ্রহী নও, তারা অন্তত এই নতুন সিরিজটা দেখে ফেলতে পারবে। আর যত বেশি দর্শক দেখবে, ততই বাড়বে দ্বিতীয় সিজন আসার সম্ভাবনা। আমার লোভ ওইটুকুই। আধুনিক এই লাভের অঙ্ক কষা হিসাবি দুনিয়ায় দু–একটা সাধারণ বিনোদনও বেঁচেবর্তে থাকুক। ক্ষতি কী!