
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের একজন স্টেট সিনেটর। একসময় আমেরিকায় নতুন জীবন গড়তে এসে তাঁর পরিবারকে সরকারি সহায়তায় মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিতে হয়েছিল। দুই দশকের কিছু বেশি সময় পর সেই পরিবারের সন্তানই আজ সাধারণ মানুষের আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়ে আইন প্রণয়ন করছেন। তাঁর নাম সাদ্দাম আজলান সালিম।
সাদ্দামের জন্ম ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলায়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে খরা ও বন্যার কারণে তাঁর পরিবার বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাবা শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০০ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে বাবা-মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে সাদ্দাম পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁদের নতুন ঠিকানা হয় ওয়াশিংটন ডিসি ও ভার্জিনিয়ার আশপাশের এলাকা।
আমেরিকায় পৌঁছানোর পর ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি ভাড়া বাসায় নতুন জীবন শুরু করেছিলেন তাঁরা। পরে ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টির স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নির্ধারিত আবাসন কর্মসূচির সহায়তা পান তাঁরা। তত দিনে বাবা-মা দুজনই ন্যূনতম মজুরির চাকরি শুরু করেছিলেন।
সাদ্দামের বাবা প্রথমে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ নেন। ফলস চার্চের ওয়েস্ট ব্রড স্ট্রিটে অবস্থিত পরিচিত ভারতীয় রেস্তোরাঁ হান্ডিতে তিনি বিশ বছরের বেশি সময় কাজ করেছেন। একটি অভিবাসী পরিবারের সন্তানের কাছে বাবার এই জীবন ছিল পরিশ্রমের প্রত্যক্ষ শিক্ষা। অন্যদিকে তাঁর মাও চাকরি করে সংসারে সাহায্য করতেন।
অভাবের সংসারে সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হতে দেননি বাবা-মা। ফলস চার্চ হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে সাদ্দাম ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও ভালো ছিলেন। স্কুলের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড দলে অংশ নিতেন। সহপাঠীদের আস্থা অর্জন করে একসময় ক্লাস প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হন। ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে পান জন মরিস অ্যাথলেটিক স্কলারশিপ।
২০১০ সালে নর্দার্ন ভার্জিনিয়া কমিউনিটি কলেজ থেকে অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন সাদ্দাম। এরপর জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১২ সালে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে স্নাতক এবং ২০১৫ সালে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সরকারি ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের অর্থব্যবস্থাপনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে সাদ্দাম আর্থিক পরামর্শক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। কাজ করেছেন পেনফেড ক্রেডিট ইউনিয়ন এবং ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসের মতো প্রতিষ্ঠানে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থব্যবস্থাপনা, বাজেট ও আর্থিক পরিকল্পনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতির প্রতিও তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে অভিবাসী পরিবার, তরুণ সমাজ ও সাধারণ চাকরিজীবীদের সমস্যাগুলো তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত করে।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির স্থানীয় সংগঠনে তিনি ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। ফেয়ারফ্যাক্স ইয়ং ডেমোক্র্যাটসের ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রভিডেন্স ডিস্ট্রিক্ট ডেমোক্র্যাটিক কমিটির কো-চেয়ার এবং ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টি ডেমোক্র্যাটিক কমিটির ফাইন্যান্স ভাইস চেয়ার হিসেবে কাজ করেন। দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন। ২০২০ সালে জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারের সময় দক্ষিণ এশীয়দের সংগঠিত করার কার্যক্রমে অংশ নেন।
২০২৩ সালে তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা ভার্জিনিয়ার রাজনীতিতে অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। অঙ্গরাজ্যের ৩৭তম সিনেট আসনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন চাইবেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাপ পিটারসেন তখন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিক। ২০০৭ সাল থেকে ভার্জিনিয়া সিনেটে নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। অর্থ, পরিচিতি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় পিটারসেন ছিলেন অনেক এগিয়ে। তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। তবু সাদ্দাম নির্বাচনী মাঠে নামেন। প্রচারে তুলে ধরেন আবাসন ব্যয়, জননিরাপত্তা, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রয়োজনের কথা।
২০ জুন অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারির ফল ঘোষণার পর দেখা গেল, প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিককে হারিয়ে দিয়েছেন তিনি। সাদ্দাম পেয়েছেন ১০ হাজার ৪৭৭ ভোট, অর্থাৎ ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে চ্যাপ পিটারসেন পেয়েছেন ৮ হাজার ৮৮০ ভোট, অর্থাৎ ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ। পিটারসেন নির্বাচনী প্রচারে সাদ্দামের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেছিলেন। কিন্তু ভোটারদের সিদ্ধান্ত ছিল অন্য রকম। এ বিজয় সাদ্দামকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ করে দেয়।
এরপর আসে ৭ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী কেন রিড। সেখানেও সাদ্দাম বড় ব্যবধানে জয়ী হন। তাঁর পক্ষে ভোট পড়ে ৪০ হাজার ৯৪৭টি, যা মোট ভোটের ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ। কেন রিড পান ১৮ হাজার ৪২৭ ভোট, অর্থাৎ ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি সাদ্দাম ভার্জিনিয়ার স্টেট সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ভার্জিনিয়ার রাজধানী রিচমন্ডে অবস্থিত আইনসভায় এখন সাদ্দাম ৩৭তম সিনেট ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই নির্বাচনী এলাকার মধ্যে রয়েছে ফেয়ারফ্যাক্স সিটি, ফলস চার্চ সিটি, ভিয়েনা শহর এবং ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টির কয়েকটি অংশ। ওয়াশিংটন ডিসির কাছাকাছি অবস্থিত এই অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, অভিবাসী পরিবার, শিক্ষার্থী ও নানা পেশার মানুষের বসবাস। তাঁদের সমস্যা নিয়ে কথা বলা এবং আইন প্রণয়নের কাজে অংশ নেওয়াই এখন তাঁর প্রধান রাজনৈতিক দায়িত্ব।
সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর কাজে আবাসন সংকটের বিষয়টি অন্যতম গুরুত্ব পায়। ভার্জিনিয়ায় বাড়ির মালিকেরা যাতে নির্দিষ্ট শর্তে মূল বাড়ির সঙ্গে ছোট একটি অতিরিক্ত বাসস্থান তৈরি করতে পারেন, সে জন্য তিনি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। এ ধরনের বাসস্থানকে বলা হয় অ্যাকসেসরি ডুয়েলিং ইউনিট বা এডিইউ। এতে বাড়ির মালিকেরা বাড়তি ভাড়ার আয় করতে পারেন, আবার শিক্ষার্থী, প্রবীণ কিংবা ছোট পরিবারের জন্য তুলনামূলক কম খরচে বসবাসের সুযোগ তৈরি হয়। এ-সংক্রান্ত একটি আইন ২০২৬ সালের এপ্রিলে অনুমোদিত হয়। তবে আইনটি কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে।
অভিবাসীদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তিনি সিনেট বিল ৩৫২ উত্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে বিলটি আইনে পরিণত হয়। এতে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া দায়িত্ব পালনকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তাদের পরিচয় গোপনের উদ্দেশ্যে মুখ ঢেকে রাখার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
রাজনীতির ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের সঙ্গে সাদ্দামের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে নির্বাচনী প্রচারের সময় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ফলস চার্চে বাবা-মা, ভাই ও বোনের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে থাকায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া সহজ হয়। সাদ্দামের স্ত্রীর নাম ফাতিমা। অভিবাসী পরিবারে একাধিক প্রজন্মের একসঙ্গে বসবাসের যে পরিচিত সংস্কৃতি রয়েছে, সাদ্দামের পরিবারেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গেও সাদ্দামের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি, ভার্জিনিয়া ও ম্যারিল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন। পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। মুসলমান ও দক্ষিণ এশীয় নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও তিনি সক্রিয়। ২০২৫ সালে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজের নির্বাচনী এলাকার বাইরের মুসলমান ও দক্ষিণ এশীয় বাসিন্দাদেরও সহায়তা করার সুযোগ পেয়েছেন।
সাদ্দামের এই সাফল্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আনন্দের। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকানদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। তিনি দেখিয়েছেন, আমেরিকায় অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা মানে শুধু ভালো চাকরি কিংবা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়, মূলধারার রাজনীতিতে অংশ নিয়ে জনগণের প্রতিনিধিও হওয়া সম্ভব।
এনএন/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬




