নেপালে ভয়াবহ ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখনো আট শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতেও নিখোঁজের সংখ্যা ৫৫০ ছাড়িয়েছে। তবে দুই অঞ্চলের নিখোঁজের তালিকায় একই ব্যক্তির নাম রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এর আগে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ করে সৃষ্ট এই বন্যা কেন হয়, এর বৈশিষ্ট্য কী এবং আগে থেকে এর পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
আকস্মিক বন্যা কী?
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সংজ্ঞা অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যা হলো অল্প সময়ের মধ্যে হঠাৎ তৈরি হওয়া পানির প্রবল স্রোত, যা সাধারণত গিরিখাত, সংকীর্ণ উপত্যকা বা নিচু এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণ বন্যার ক্ষেত্রে কয়েক দিন বা এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিপাতের পর ধীরে ধীরে নদীর পানি বাড়ে। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে নদীর পানি অল্প সময়ের মধ্যে শুকনো অবস্থা থেকে কূল ছাপিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
সাধারণত বজ্রঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ে তুষার ও বরফ দ্রুত গলে যাওয়া কিংবা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে আকস্মিক বন্যা হতে পারে।
এ ধরনের বন্যা সাধারণত কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে কমে যায়। তবে এর আকস্মিকতা ও পানির প্রবল স্রোত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। সড়ক, সেতু ও স্থাপনা ধ্বংসের পাশাপাশি গাছপালা উপড়ে ফেলতে পারে প্রবল পানির স্রোত।
কেন হয় আকস্মিক বন্যা?
আকস্মিক বন্যার প্রধান কারণ অতিবৃষ্টি। তবে বৃষ্টির পরিমাণের পাশাপাশি বৃষ্টির তীব্রতা, কোথায় এবং কতটা এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে, এসব বিষয়ও এর মাত্রা নির্ধারণ করে।
ভূপ্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাহাড় বা খাড়াই ঢালযুক্ত এলাকায় পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। একইভাবে পাথর, পাকা সড়ক, ছাদ ও শক্ত মাটির মতো পানি শোষণ করতে না পারা পৃষ্ঠ বেশি থাকলেও পানি দ্রুত প্রবাহিত হয়ে নিচু এলাকা প্লাবিত করতে পারে।
দাবানলে উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকাতেও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিপরীতে মৃদু ঢাল, ঘন উদ্ভিদ এবং পানি শোষণ করতে সক্ষম মাটি থাকলে পানি তুলনামূলক ধীরে প্রবাহিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনও ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। বায়ুর তাপমাত্রা বাড়লে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প ধারণের ক্ষমতা বাড়ে। প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা প্রায় ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। এর ফলে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়লে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যায় জলবায়ু পরিবর্তন কতটা ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগাম পূর্বাভাস কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকস্মিক বন্যারও পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো হাতে থাকা সময়ের স্বল্পতা।
সরদার উদয় রায়হানের মতে, বড় নদীর অববাহিকায় তথ্য সংগ্রহ তুলনামূলক সহজ হওয়ায় আগাম সতর্কতার জন্য বেশি সময় পাওয়া যায়। কিন্তু আকস্মিক বন্যা সাধারণত পাহাড়ি অববাহিকায় হওয়ায় পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া কঠিন।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাইড্রোলজিক্যাল ও মেটারোলজিক্যাল স্টেশনের সংখ্যা কম থাকায় দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণও জটিল হয়ে পড়ে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার আগাম পূর্বাভাসকে নির্ভরযোগ্য ‘লিড টাইম’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে এই সময় পাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না।
তবে রাডার, স্যাটেলাইট ও স্বয়ংক্রিয় সেন্সরের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ ঠাকুরি বলেন, এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়।
তিনি জানান, হিমবাহ ও এর আশপাশে স্থাপন করা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা হ্রদের পানির স্তর এবং বাঁধের অবস্থা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে পারে। এসব তথ্য সময়মতো পাওয়া গেলে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সীমান্ত এলাকায় বাড়াতে হবে নজরদারি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত পেরিয়ে আসা দুর্যোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় আরও জোরদার করা জরুরি।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলচক ক্যাম্পাসের ডিজাস্টার স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক বসন্ত অধিকারীর মতে, নেপাল থেকে কোনো দুর্যোগের সূত্রপাত হলে তা দেশটির ভেতর থেকেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু সীমান্তের ওপারে সৃষ্টি হওয়া এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তথ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, যেসব দুর্গম এলাকায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সেখানে মানুষের মাধ্যমে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ কঠিন। তাই স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপন করে নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের কিছু নদী অববাহিকায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু থাকলেও হিমালয় অঞ্চলে এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
সুদীপ ঠাকুরি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নদীর তীরবর্তী জনবসতি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তার মতে, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে জনবসতি না গড়ে তোলা।

