
বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবগুলোর একটি। চার বছর পর পর এই আয়োজনকে ঘিরে একটি দেশ তার সামর্থ্য, সংস্কৃতি, ব্যবস্থাপনা, সৌন্দর্যবোধ এবং নাগরিক প্রস্তুতির পরিচয় তুলে ধরে। মাঠে বাইশজন খেলোয়াড় বল নিয়ে ছুটে বেড়ালেও মাঠের বাইরে আয়োজক দেশের পরিচয়ও তখন সমানভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সেই জায়গায় এবারের বিশ্বকাপে কানাডার ভূমিকা, বিশেষ করে টরন্টোর প্রস্তুতি, অনেকের মনে আনন্দের চেয়ে বেশি অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে।
কানাডা একটি উন্নত দেশ। নাগরিক সুবিধা, নগর পরিকল্পনা, বহুসংস্কৃতির চর্চা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য দেশটির সুনাম রয়েছে। টরন্টোকে বলা হয় “The World in a City”, পৃথিবীর নানা জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মিলননগরী। ফুটবলও এই শহরের অভিবাসী জীবনের এক বড় আবেগ। তাই বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞে টরন্টোর কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। প্রত্যাশা ছিল, কানাডা বিশ্বকে দেখাবে একটি পরিণত, প্রস্তুত, সৌন্দর্যময় ও জনবান্ধব আয়োজন। কিন্তু বাস্তব দৃশ্য সবাইকে হতাশ করেছে।
টরন্টোর BMO Field, বিশ্বকাপের সময়ে যার নাম হয়েছে Toronto Stadium, এবারের আসরে ছয়টি ম্যাচ আয়োজন করছে। কানাডার মাটিতে পুরুষদের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচও হয়েছে এখানেই। এটি নিঃসন্দেহে কানাডার ফুটবল ইতিহাসে বড় ঘটনা। কিন্তু ইতিহাসের এই মুহূর্ত ঘিরে যে ভেন্যুটি সাজানো হলো, সেটি শুরু থেকেই প্রশ্নের মুখে। বিশ্বকাপের জন্য সেখানে ১৭ হাজারের বেশি অস্থায়ী আসন যুক্ত করা হয়েছে। ধারণক্ষমতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ভেন্যুর চেহারায় রয়ে গেছে অস্থায়ী কাঠামো, অসম্পূর্ণতার ছাপ এবং এমন এক দৃশ্য, যা কানাডার মতো দেশের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। স্টেডিয়াম উন্নয়নে ১৫৭.৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরও এই অপূর্ণতার অনুভূতিই সমালোচনাকে আরও জোরালো করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও টরন্টো স্টেডিয়াম নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ পেয়েছে। কেউ কেউ এটিকে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে দুর্বল ভেন্যু বলেও কটাক্ষ করেছে।
বিশ্বকাপের ভেন্যু শুধু একটি মাঠ নয়, এটি একটি দেশের মুখ। দর্শক সেখানে শুধু ম্যাচ দেখতে যান না, একটি অভিজ্ঞতার অংশ হন। তিনি দেখতে চান উৎসব, শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য এবং আয়োজনের মর্যাদা। টরন্টো সেই জায়গায় পূর্ণতা দেখাতে পারেনি।
টিকিট নিয়ে অসন্তোষ আরও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। এবারের বিশ্বকাপে টিকিটের দাম ও প্রক্রিয়া অনেক সাধারণ ফুটবলপ্রেমীর নাগালের বাইরে চলে গেছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, নিজের শহরে বিশ্বকাপ হচ্ছে, অথচ সেই খেলা মাঠে বসে দেখার সুযোগ তাঁদের নেই। কেউ কেউ বলেছেন, ১,০০০ ডলার দিয়েও পছন্দের টিকিট পাওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শহরে স্থানীয় পরিবারের জন্য কম দামের টিকিটের উদ্যোগ দেখা গেলেও টরন্টোতে সেই ধরনের জনবান্ধব উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
আরও বিস্ময়ের বিষয়, টরন্টো শহরের বিশ্বকাপ আয়োজনের সামগ্রিক বাজেট প্রায় ৩৮০ মিলিয়ন ডলার। এমন বড় ব্যয়ের পর সাধারণ মানুষ যদি বলে, “আমরা তো এই উৎসবের অংশই হতে পারলাম না”, তাহলে সেই কথাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ফ্যান ফেস্টিভ্যাল নিয়েও টরন্টোকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। বিশ্বকাপের সৌন্দর্য শুধু স্টেডিয়ামে নয়, শহরের রাস্তায়, পার্কে, চত্বরে, বড় পর্দার সামনে মানুষের মিলনেও। টরন্টোর ফ্যান ফেস্টিভ্যালের জন্য Fort York এবং The Bentway নির্ধারিত হয়েছিল। প্রথমে এটি ফ্রি ও সবার জন্য উন্মুক্ত আয়োজন হিসেবে প্রচারিত হয়। পরে সাধারণ প্রবেশের জন্য ১০ ডলার ফি প্রস্তাব করা হলে সমালোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলে আবার ফ্রি করা হয়।
তার ওপর উদ্বোধনী দিনেই আবহাওয়ার কারণে ফ্যান ফেস্টিভ্যাল বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিরাপত্তার জন্য সিদ্ধান্তটি যুক্তিযুক্ত হতে পারে। কিন্তু টরন্টোর আবহাওয়া তো অজানা ছিল না। এত বড় আয়োজনের আগে বিকল্প পরিকল্পনা আরও শক্ত হওয়া উচিত ছিল।
বিশ্বকাপ আয়োজন শুধু ম্যাচের সময় দরজা খুলে দেওয়ার নাম নয়। একটি শহর কতটা প্রস্তুত, তা বোঝা যায় দর্শকের সামগ্রিক অভিজ্ঞতায়।
তবে মাঠের গল্প আলাদা। Canada বনাম Bosnia and Herzegovina ম্যাচ ঘিরে ঐতিহাসিক উত্তেজনা ছিল। কানাডা ১-১ গোলে ড্র করে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট অর্জন করেছে। খেলোয়াড়দের জন্য এটি গৌরবের মুহূর্ত। দর্শকদের আবেগও ছিল প্রবল। কিন্তু মাঠের বাইরের আয়োজন সেই গৌরবের পাশে এক ধরনের ছায়া ফেলে দিয়েছে।
কানাডার জন্য এই বিশ্বকাপ এখনো শেষ হয়নি। সামনে টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারে আরও ম্যাচ আছে। ভুল সংশোধনের সময়ও আছে। কিন্তু শুরুতেই যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, তা নথিভুক্ত থাকা দরকার। কারণ বিশ্বকাপ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আয়োজক হিসেবে কানাডার অভিজ্ঞতা ইতিহাসে থেকে যাবে।
এই সমালোচনা কানাডাবিরোধী নয়। বরং কানাডার প্রতি ভালোবাসা ও প্রত্যাশা থেকেই এই প্রশ্ন। একটি প্রথম শ্রেণির দেশের কাছে প্রত্যাশাও প্রথম শ্রেণির হয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, টরন্টো বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু বিশ্বকাপের প্রাণকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি।
এনএন/ ১৩ জুন ২০২৬






