বিশ্বজুড়ে মহা-খাদ্যসংকটের কালো মেঘ! ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের হুঁশিয়ারি – DesheBideshe

বিশ্বজুড়ে মহা-খাদ্যসংকটের কালো মেঘ! ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের হুঁশিয়ারি – DesheBideshe


বিশ্বজুড়ে মহা-খাদ্যসংকটের কালো মেঘ! ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের হুঁশিয়ারি – DesheBideshe

নয়াদিল্লি, ০১ অক্টোবর – একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত— এই দুই সাঁড়াশি চাপের মুখে সমগ্র বিশ্বজুড়ে এক অভাবনীয় ও নজিরবিহীন খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর এক তীব্র সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছেন, আগামীর কয়েক মাসের মধ্যেই সারা বিশ্ব এক বিশাল আকারের খাদ্য ও সারসংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মর্যাদাপূর্ণ এশিয়া সোসাইটি আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) জয়শঙ্কর বলেন, বিশ্বজুড়ে চলমান এই সংঘাতের সবচেয়ে বিধ্বংসী আঘাত এসে পড়ছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ (Global South) অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মতো উন্নয়নশীল এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর।

“জ্বালানি নিয়ে রাজনীতি বন্ধ হোক”: জয়শঙ্করের কড়া হুশিয়ারি

বর্তমান সংকটময় বিশ্ব পরিস্থিতির কয়েকটি স্পর্শকাতর দিক উন্মোচন করে জয়শঙ্কর জানান, বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানি সরবরাহ এমনিতেই মারাত্মক টানাটানির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

দ্বৈত সংকট (Dual Crisis): বর্তমানে জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে জ্বালানি রাজনীতি যুক্ত হয়ে এক বিপজ্জনক ও দ্বৈত সংকট তৈরি করেছে। যেখানে জ্বালানির দর স্থিতিশীল রাখা জরুরি, সেখানে কিছু প্রভাবশালী দেশ বিশ্ববাজার নিয়ে খেলায় মেতে উঠেছে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ছায়া: ইউক্রেন যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলসহ বিশ্বজুড়ে যেমন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে দানা বাঁধা সংঘাত সেই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে।

কৃষ্ণসাগর থেকে সার কারখানা: যেভাবে থমকে যাচ্ছে খাদ্য উৎপাদন

বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও সারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণগুলো পয়েন্ট আকারে তুলে ধরেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী:

শস্য সরবরাহে কৃত্রিম দেয়াল: বিশ্বের অন্যতম প্রধান শস্য রপ্তানিকারক অঞ্চল কৃষ্ণসাগর (Black Sea) অববাহিকায় সংঘাতের কারণে ইউক্রেন ও রাশিয়ার খাদ্যশস্যের বড় চালান বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারছে না।

সার উৎপাদনের ঘাড়ে কোপ: মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার মতো যেসব দেশ বিশ্ববাজারে সারের বড় অংশ সরবরাহ করে, চলমান যুদ্ধের কারণে তাদের কারখানাগুলোর উৎপাদন ভীষণভাবে ব্যাহত হয়েছে।

‘সুপার এল নিনো’র মার: সারের ঘাটতির সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ধাক্কা এবং ‘সুপার এল নিনো’র (Super El Niño) মতো বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয়।

“একদিকে জ্বালানি ও সারের সংকট, অন্যদিকে জলবায়ুর খামখেয়ালিপনা এবং অর্থপ্রবাহের টানাপোড়েন— এসব কারণ একত্রিত হলে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অর্থনীতি আর সামলে ওঠা সম্ভব হবে না।” — ড. এস জয়শঙ্কর, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

পুঁজিবাজার ও অর্থের ‘নিরাপদ আশ্রয়’

সংকটময় পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা কেমন আচরণ করে, তার এক নগ্ন বাস্তবতা তুলে ধরেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, যুদ্ধ বা বড় কোনো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হলেই বড় বড় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ বাজার অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে রাতারাতি মূলধন সরিয়ে নেয়। সেই অর্থ নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিচিত উন্নত দেশগুলোর ‘সেফ হারবার’ (Safe Harbor)-এ জমা হতে থাকে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি, ঋণের দায় এবং বাজেট ঘাটতিতে পিষ্ট হয়ে চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগোয় দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো।

“আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না” বলে দায় এড়ানো যাবে না!

উন্নত বিশ্ব ও পরাশক্তিগুলোর আত্মকেন্দ্রিক নীতি নির্ধারণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন জয়শঙ্কর। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, “কোনো দেশের নীতি বা সিদ্ধান্ত এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হতে পারে না যে, তারা নিজেদের ঘরে বসে যুদ্ধ বা বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নেবে, আর পরে অন্য হাজারো দরিদ্র দেশের মানুষের জীবন তছনছ হয়ে গেলে বলবে— ‘তোমাদের জীবন কঠিন করে তোলা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না’।”

তিনি মনে করিয়ে দেন, পরাশক্তিগুলোর আত্মকেন্দ্রিকতার জায়গায় ন্যূনতম ‘সাধারণ বোধবুদ্ধি’ (Sound Common Sense) প্রয়োগ করা উচিত, যাতে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের মৌলিক বেঁচে থাকার চাহিদা অবহেলিত না হয়।

ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য— বিশ্বজুড়ে সংঘাতের বারুদ যত ছড়াচ্ছে, তার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থনীতির এই চতুর্মুখী সংকট যদি সময় থাকতে প্রতিহত করা না যায়, তবে বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব নতুন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

এনএন/ ০১ অক্টোবর ২০২৬