দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতি এবং বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কার মধ্যেই ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে ব্যাংকগুলোতে এক কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত রয়েছে এমন হিসাব প্রায় ১২ হাজার বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। এর এক বছর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি। অর্থাৎ এক বছরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৯৬৩টি কোটিপতি হিসাব।
শুধু বার্ষিক নয়, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকেও এ ধরনের হিসাব দ্রুত বেড়েছে। ওই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে কোটি টাকার হিসাব ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০টি। তিন মাসের ব্যবধানে আরও ৫ হাজার ৯৭৪টি যোগ হয়ে ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে।
এ সময় বড় অঙ্কের আমানতের মোট পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এসব হিসাবে জমা ছিল ৮ লাখ ২১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ডিসেম্বর নাগাদ তা ৩৪ হাজার ২১৪ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৫৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকায়।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কোটি টাকার হিসাব থাকলেই যে ওই হিসাবধারী ব্যক্তি কোটিপতি এমনটি সব সময় সত্য নয়। কারণ ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংকে জমা রাখে। পাশাপাশি একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যাংকে একাধিক হিসাবও থাকতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোটিপতি হিসাবের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশে বাড়তে থাকা আয়বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, যখন একদিকে দারিদ্র্য ও ছদ্মবেকারত্ব বাড়ছে, তখন কোটিপতি হিসাব বৃদ্ধি পাওয়া সম্পদের অসম বণ্টনেরই প্রতিফলন।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তার মতে, বিদ্যমান রাজস্বনীতি ও করকাঠামোর বৈষম্যের কারণে ধনীরা আরও বেশি সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, যা সামাজিক বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এই প্রবণতাকে অর্থনীতির স্বাভাবিক সম্প্রসারণের ফল বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, দেশের অর্থনীতি বড় হওয়ার পাশাপাশি মানুষের গড় আয় এবং ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ছে, যার প্রভাবে বড় অঙ্কের আমানতের হিসাবও বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, গত কয়েক বছর ধরেই কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২০ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার ৮৯০টি, সেখানে ধীরে ধীরে বেড়ে বর্তমানে তা ১ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দেশের আর্থিক খাতে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে।






