ব্রিটেনে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের দায়ে লিটন আহমেদের ১৮ বছরের কারাদণ্ড – DesheBideshe

ব্রিটেনে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের দায়ে লিটন আহমেদের ১৮ বছরের কারাদণ্ড – DesheBideshe


কার্ডিফের বুটটাউন এলাকার লিটন আহমেদ, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধে ১৮ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত
লিটন আহমেদকে ২০২৫ সালের আগস্টে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ইংল্যান্ডের পশ্চিমে ওয়েলস, তার রাজধানী কার্ডিফ। শহরের কেন্দ্র থেকে একটু দক্ষিণে পুরোনো ডকল্যান্ড বুটটাউন। একসময় এলাকাটি সারা দুনিয়ায় পরিচিত ছিল ‘টাইগার বে’ নামে। ১৮৩৯ সালে ওয়েস্ট বুট ডক চালু হওয়ার পর পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নাবিক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা এখানে এসে বসতি গড়তে শুরু করেন। একসময় অন্তত ৫০টি দেশের মানুষের ঠিকানা হয়ে ওঠে এই ছোট্ট এলাকা। আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও ইউরোপের মানুষের মিশ্রণে বুটটাউন গড়ে ওঠে এক বিচিত্র বহুজাতিক জনপদ হিসেবে।

বাংলাদেশিদেরও কার্ডিফে বসবাস নতুন নয়। বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে উন্নত জীবনের সন্ধানে অনেক বাংলাদেশি পরিবার যুক্তরাজ্যে আসেন। ২০০১ সালের আদমশুমারিতেই কার্ডিফে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৪৬। তাঁদের বড় অংশের বসবাস ছিল রিভারসাইড, প্লাসনিউইড, গ্রেঞ্জটাউন ও ক্যান্টন এলাকায়। পরবর্তী দুই দশকে এই কমিউনিটি আরও বিস্তৃত হয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে তাঁদের অধিকাংশই ব্যবসা, চাকরি, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু একটি কমিউনিটির হাজারো সাফল্যের পাশে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যক্তির অপরাধের খবরও এমনভাবে শিরোনাম হয়, যার অস্বস্তি গিয়ে লাগে অনেকের গায়ে। কয়েকজনের কর্মকাণ্ড দিয়ে অবশ্যই একটি জাতি বা কমিউনিটিকে বিচার করা যায় না। তারপরও প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, সহিংসতা কিংবা যৌন অপরাধের মতো ঘটনা যখন সামনে আসে, তখন তা নিয়ে কমিউনিটির ভেতরেও প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়।

এমনই এক ঘটনা আবার সামনে এনেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম Daily Dazzling Dawn। শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের সাতটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১৮ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন বাংলাদেশি লিটন আহমেদ। সংবাদমাধ্যমটি তাঁকে সিলেট থেকে আসা ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। কারাগারে যাওয়ার আগে তিনি কার্ডিফের বুটটাউন এলাকায় বসবাস করতেন। ২০২৫ সালের আগস্টে সাজা ঘোষণার সময় তাঁর বয়স ছিল ৪৭ বছর। সাজা ঘোষণার এক বছর পেরোনোর পর, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, তাঁর মামলাটি নতুন করে তুলে ধরে সংবাদমাধ্যমটি।

লিটনের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ছিল গুরুতর। South Wales Police-এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ ছিল একটি মেয়েশিশুকে যৌন উদ্দেশ্যে স্পর্শ করে নিপীড়নের। আরও একটি অভিযোগ ছিল একইভাবে যৌন নিপীড়নের চেষ্টার। অর্থাৎ একটি অভিযোগ নয়, মোট সাতটি অভিযোগ নিয়ে তাঁকে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

২০২৫ সালের এপ্রিলে Cardiff Crown Court-এ তাঁর বিচার হয়। বিচার শেষে সাতটি অভিযোগেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এরপর সাজা ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হয় আরও কয়েক মাস।

২৬ আগস্ট ২০২৫। বিচারস্থল এবার Cardiff Crown Court নয়, Merthyr Tydfil Crown Court। সেদিন লিটনের সামনে যে সংখ্যাটি উচ্চারিত হয়, সেটি ছিল ১৮ বছর। শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের দায়ে তাঁকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।

অবশ্য এই সাতটি অপরাধের পেছনের পুরো গল্প প্রকাশ্যে আসেনি। লিটন ভুক্তভোগী শিশুদের কীভাবে চিনতেন, তাঁদের কাছে যাওয়ার সুযোগ কীভাবে পেয়েছিলেন, অপরাধগুলো কোথায় ঘটেছিল কিংবা কত সময় ধরে চলেছিল, এসবের বিস্তারিত South Wales Police প্রকাশ করেনি। প্রথম অভিযোগটি কীভাবে পুলিশের কাছে পৌঁছেছিল, সেই তথ্যও পুলিশের বিবৃতিতে নেই। শিশু যৌন নিপীড়নের মামলায় ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে অনেক সময় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয় না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিটেকটিভ কনস্টেবল স্টিভেন টেইলর সাজা ঘোষণার পর বরং সামনে এনেছিলেন ভুক্তভোগীদের সাহসের কথা। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা সামনে এসে ঘটনা জানিয়েছেন এবং তদন্তে সহযোগিতা করেছেন বলেই মামলাটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। পুরো সময়টি ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালতের রায় তাঁদের অন্তত কিছুটা স্বস্তি দেবে।

১৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েই আদালত থেমে থাকেনি। লিটনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য যৌন অপরাধীদের নিবন্ধনে (Sex Offenders Register) রাখা হয়েছে। ব্রিটিশ আইনে এর অর্থ, নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত তথ্য পুলিশকে জানিয়ে রাখাসহ যৌন অপরাধীদের জন্য প্রযোজ্য বিভিন্ন তথ্য জানানোর বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হয়। ৩০ মাস বা তার বেশি কারাদণ্ড পাওয়া প্রাপ্তবয়স্ক যৌন অপরাধীর ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা সাধারণত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যকর থাকে।

একই সঙ্গে লিটনের বিরুদ্ধে যৌন ক্ষতি প্রতিরোধ আদেশ (Sexual Harm Prevention Order) জারি করা হয়েছে। এ ধরনের আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে জনসাধারণ, বিশেষ করে শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে যৌন ক্ষতির আশঙ্কা থেকে সুরক্ষিত রাখা। আদালত প্রয়োজন অনুযায়ী একজন দণ্ডিত ব্যক্তির যোগাযোগ, চলাফেরা বা আচরণের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।

ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় লিটনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ (Restraining Order)-ও রয়েছে, যা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। South Wales Police অবশ্য Sexual Harm Prevention Order বা restraining order-এর পৃথক শর্তগুলো প্রকাশ করেনি।

আদালতের রায়ের পর কয়েক দিনের জন্য সংবাদ শিরোনামে এসেছিলেন লিটন আহমেদ। সময়ের সঙ্গে সেই খবর অন্য অনেক ঘটনার আড়ালে চলে যায়। কিন্তু এক বছর পর আবার লিটন আহমেদের নাম সামনে এসেছে। তাঁর ১৮ বছরের সাজার মাত্র প্রথম বছরটি পার হয়েছে। সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ কারাবাস। আর আদালতের দেওয়া যৌন অপরাধী নিবন্ধন ও অন্যান্য বিধিনিষেধ বলছে, কারাগারের দরজা একদিন খুললেও এই মামলার আইনি ছায়া তাঁর জীবন থেকে সহজে সরছে না।

তথ্যসূত্র: South Wales Police, Daily Dazzling Dawn




FAQ

লিটন আহমেদকে কত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে?

লিটন আহমেদকে ২৬ আগস্ট ২০২৫ Merthyr Tydfil Crown Court-এ ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

তাঁর বিরুদ্ধে কয়টি অভিযোগ ছিল?

তাঁর বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগ ছিল—ছয়টি যৌন নিপীড়ন এবং একটি যৌন নিপীড়নের চেষ্টার অভিযোগ।

লিটন আহমেদ কোথায় দোষী সাব্যস্ত হন?

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে Cardiff Crown Court-এ অনুষ্ঠিত বিচারে তিনি সাতটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হন।

তাঁকে কোথায় সাজা দেওয়া হয়?

সাজার শুনানি হয় Merthyr Tydfil Crown Court-এ ২৬ আগস্ট ২০২৫।

তাঁর বিরুদ্ধে আর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

তাঁকে অনির্দিষ্টকালের জন্য Sex Offenders Register-এ রাখা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে Sexual Harm Prevention Order এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় Restraining Order-ও জারি হয়েছে।

২০২৬ সালে কি নতুন করে তাঁর সাজা হয়েছে?

না। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনটি মূলত ২০২৫ সালের রায় ও তাঁর চলমান ১৮ বছরের কারাবাসকে ফের সামনে এনেছে।