বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স–এর বিশালাকৃতির রকেটযান ‘স্টারশিপ’ পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শেষে শুক্রবার (২২ মে) ভারত মহাসাগরে নিয়ন্ত্রিত অবতরণের সময় বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এটিকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল পরীক্ষা হিসেবে দেখছে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
স্পেসএক্সের সর্বশেষ সংস্করণের স্টারশিপ মহাকাশযান স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার কিছু পরে উৎক্ষেপণ করা হয়। যাত্রাপথে কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিলেও পরীক্ষামূলক ফ্লাইট শেষে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা লাইভস্ট্রিমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এ পরীক্ষা এমন এক সময়ে হলো, যখন ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি সম্ভাব্য রেকর্ডধারী প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার (আইপিও) প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্পেসএক্স জানিয়েছে, এই পরীক্ষায় রকেটের বুস্টার বা উপরের ধাপ (আপার স্টেজ) পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা ছিল না। পরিকল্পনা অনুযায়ী চূড়ান্ত অবতরণটি আগুনময় হলেও নিয়ন্ত্রিত ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, স্প্ল্যাশডাউন নিশ্চিত!
এই পরীক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল স্টারশিপের নতুন নকশাগত পরিবর্তনগুলো বাস্তবে কেমন কাজ করে তা প্রদর্শন করা। তৃতীয় প্রজন্মের স্টারশিপ উড্ডয়নের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল সম্পন্ন করে মহাকাশে নিজেকে সোজা অবস্থানে ফিরিয়ে আনা এবং একটি ইঞ্জিন অকার্যকর থাকা সত্ত্বেও ইঞ্জিন পুনরায় চালু করে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
এছাড়া মহাকাশযানটি ২২টি কৃত্রিম উপগ্রহও বহন করে, যার মধ্যে দুটি স্টারশিপের তাপ-প্রতিরোধী ঢালের (হিট শিল্ড) ছবি তোলার চেষ্টা চালায়, যাতে পরবর্তী বিশ্লেষণ করা যায়।
তবে সবকিছু পরিকল্পনামাফিক হয়নি। একটি ইঞ্জিনের ত্রুটির কারণে স্টারশিপ নির্ধারিত কক্ষপথে পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারেনি। স্পেসএক্সের মুখপাত্র ড্যান হুট বলেন, এটিকে আমি আদর্শ কক্ষপথে প্রবেশ বলব না, তবে এটি পূর্বনির্ধারিত বিশ্লেষণকৃত গতিপথের সীমার মধ্যেই ছিল।
অন্যদিকে, সুপার হেভি বুস্টার আপার স্টেজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর নির্ধারিত বুস্ট-ব্যাক বার্ন সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে বুস্টারটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দ্রুত পৃথিবীতে ফিরে এসে মেক্সিকো উপসাগরে পতিত হয়। যদিও এটি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা স্পেসএক্সের ছিল না, তবু প্রতিষ্ঠানটি নির্ভুলভাবে ফিরে আসার আশা করেছিল।
পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শেষে ইলন মাস্ক এক্সে তার দলকে অভিনন্দন জানিয়ে ফ্লাইটটিকে এপিক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তোমরা মানবজাতির জন্য একটি গোল করেছো।
শুক্রবারের এই ফ্লাইটের আগের দিনও একটি পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে শেষ মুহূর্তে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে তা বাতিল করা হয়। কাউন্টডাউন কয়েকবার থামানো ও পুনরায় শুরু হলেও সময়মতো সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি।
পরে ইলন মাস্ক এক্সে জানান, উৎক্ষেপণ টাওয়ারের বাহু ধরে রাখা হাইড্রোলিক পিন সঠিকভাবে সরে যায়নি। পরে রাতারাতি সেই সমস্যা সমাধান করা হয় বলে জানায় স্পেসএক্স।
এটি ছিল স্টারশিপের মোট ১২তম উড্ডয়ন এবং গত সাত মাসের মধ্যে প্রথম পরীক্ষা। নতুন নকশার স্টারশিপ আগের সংস্করণের তুলনায় বড়, পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় যার উচ্চতা প্রায় ৪০৭ ফুট (১২৪ মিটার)।
স্টারশিপের অগ্রগতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। কারণ, নাসার সঙ্গে চুক্তির আওতায় স্পেসএক্স চাঁদে অবতরণের উপযোগী স্টারশিপের একটি বিশেষ সংস্করণ তৈরি করছে। নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রাম কর্মসূচির লক্ষ্য মানুষকে আবার চাঁদে পাঠানো, যেখানে চীনও ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম মানববাহী চন্দ্র মিশনের পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে।
মহাকাশ বিশ্লেষক ক্লেটন সোপ বলেন, উন্নত সংস্করণের স্টারশিপ উৎক্ষেপণের সময় স্পেসএক্স যেসব লক্ষ্য অর্জনের আশা করেছিল, তার বেশিরভাগই পূরণ হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পরবর্তী আর্টেমিস মিশনের জন্য স্টারশিপ প্রস্তুত হতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে এবং আরও বহু পরীক্ষামূলক ফ্লাইট প্রয়োজন।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান উৎক্ষেপণের আগে বলেন, এটি উড়তে দেখা নিয়ে আমরা আশাবাদী, কারণ খুব দূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর কক্ষপথে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারব।






