ভোট চুরির অভিযোগে তোলপাড় ভারত: নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রাহুলের ১০ বিস্ফোরক দাবি – DesheBideshe

ভোট চুরির অভিযোগে তোলপাড় ভারত: নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রাহুলের ১০ বিস্ফোরক দাবি – DesheBideshe


ভোট চুরির অভিযোগে তোলপাড় ভারত: নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রাহুলের ১০ বিস্ফোরক দাবি – DesheBideshe

নয়াদিল্লি, ১২ অক্টোবর – ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) নিরপেক্ষতা, কাজের স্বচ্ছতা এবং বিশেষ করে ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি নাগরিকের নাম রহস্যজনকভাবে বাদ পড়ার প্রতিবাদে দেশটির রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন উত্তেজনা। নির্বাচন কমিশনের নীতি ও কর্মকাণ্ডকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সরাসরি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঐতিহাসিক রিট আবেদন জমা দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের শীর্ষ ১১ জন নেতা।

সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানী দিল্লির রাজপথে বিরোধী শিবিরের হাজার হাজার নেতাকর্মীর সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত বিশাল বিক্ষোভ মিছিল শেষে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে রওনা হন শীর্ষ নেতারা। মিছিলে রাহুল গান্ধীর পাশে ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবসহ বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে মামলাটি ‘রাহুল গান্ধী ও অন্যান্য বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন’ (Rahul Gandhi and Ors. v. Election Commission of India) নামাঙ্কিত হয়ে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই রিটে বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) প্রক্রিয়া স্থগিত এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগেরও দাবি তোলা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া রাহুল গান্ধীর ১০ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি

ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ভোটার অধিকার হরণ এবং ইভিএম ও ভোটার ডেটাবেজে জালিয়াতি ঠেকাতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে যে ১০টি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রতিকার চাওয়া হয়েছে:

১. এসআইআর-সংক্রান্ত নথি তলব: ২০২৫ সালের ২৪ জুন থেকে শুরু হওয়া বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) কার্যক্রম সম্পর্কিত সব সিদ্ধান্ত, বৈঠকের কার্যবিবরণী, নথি এবং ইসিনেট (ECINET) ও ইরোনেট (ERONET) ব্যবস্থার প্রবেশের যাবতীয় তথ্য আদালতে দাখিল করা।

২. সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা: এসআইআর প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইনের ১৮ নম্বর ধারা মেনে নেওয়া হয়েছে কি না, তা বিচারবিভাগীয় নিরীক্ষার আওতায় আনা।

৩. দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তি: ভোটার তালিকা তৈরিতে সংবিধান ও বিদ্যমান আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ইসি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিভাগীয় ও ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

৪. স্বচ্ছ ও লিখিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া: এসআইআর সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের গৃহীত প্রতিটি আবেদনের ওপর আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কমিশন বৈঠকের লিখিত ও সুনির্দিষ্ট রেকর্ড নিশ্চিত করা।

৫. অনলাইন ফর্ম-৬ এর সমতা রক্ষা: ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালার বাইরে গিয়ে বেআইনিভাবে অনলাইন ফর্মে আনা পরিবর্তন অবিলম্বে বাতিল করা এবং বিধিমালা সংশোধন ছাড়া কোনো পরিবর্তন না আনা।

৬. অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন কমিটি: সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির অধীনে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে স্বাধীন তদন্ত ও নিরীক্ষা কমিটি গঠন করা। এই কমিটি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া এবং ইভিএম-এর (EVM) প্রযুক্তিগত কাঠামো নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখবে।

৭. বাদ পড়া ভোটারদের প্রকাশ্য তালিকা: বুথভিত্তিক নাম, বয়স, লিঙ্গ ও নাম কাটার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে বাদ পড়া ভোটারদের তথ্য জনসম্মুখে উন্মুক্ত করা এবং যোগ্য ব্যক্তিদের পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা।

৮. নোটিশ ও শুনানি ছাড়া নাম বাদ নিষেধ: কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে সুনির্দিষ্ট নোটিশ প্রদান ও ব্যক্তিগত শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা।

৯. চলমান এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা: মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সমগ্র দেশে চলমান ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) কার্যক্রমের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করা।

১০. ভোটাধিকার সুরক্ষায় আদালতের বিশেষ আদেশ: দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের পরিবেশ ফেরাতে এবং নাগরিক ভোটাধিকার সুরক্ষায় আদালত উপযুক্ত মনে করলে যে কোনো জরুরি নির্দেশনা প্রদান করা।

প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক উত্তাপ

রিট আবেদন জমা দেওয়ার আগের দিন ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্য কান্ত বিরোধী সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসতে অসম্মতি জানান, কারণ বিষয়টি ইতিপূর্বে আদালতে বিচারাধীন ছিল। সোমবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাহুল গান্ধী সশরীরে আদালতের অভ্যন্তরে না পৌঁছাতে পারায় তাঁর পক্ষে আইনি প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড এস প্রসন্ন আবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন।

আসন্ন রাজ্য নির্বাচনগুলোর মুখে ভারতের প্রধান বিরোধী জোটের এই সর্বাত্মক আইনি লড়াই দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থার ঐতিহাসিক সংকটকে প্রকাশ্যে এনেছে। ‘ইভিএমের কারিগরি ফাইল’ এবং কোটি কোটি যোগ্য ভোটারের নাম কাটার অভিযোগ নিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের শীর্ষ আদালতের রায় কী হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে পুরো বিশ্ব।

এনএন/ ১২ অক্টোবর ২০২৬