রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে মহাখালীসহ ঢাকার চারটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রথমে দ্রুত স্থানান্তরের নির্দেশনা এলেও পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপাতত টার্মিনাল সরানো হচ্ছে না; বরং বাসের ডিপো শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—শেষ পর্যন্ত মহাখালী বাস টার্মিনাল কি সত্যিই সরে যাবে, নাকি পরিকল্পনায় আসবে নতুন পরিবর্তন?
সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর যানজট কমাতে মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এবং ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান আন্তজেলা বাস টার্মিনাল পর্যায়ক্রমে শহরের বাইরে স্থানান্তর করা হবে। পরিকল্পনায় মহাখালী বাস টার্মিনালকে প্রথমে পূর্বাচলে এবং পরে টঙ্গীর কাছাকাছি স্থায়ী স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে গাবতলী হেমায়েতপুরে, সায়েদাবাদ কাঁচপুরে এবং ফুলবাড়িয়া কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের প্রস্তাব রয়েছে।
মহাখালীর গ্যাপের বাসের নতুন ঠিকানা পূর্বাচল
মহাখালী বাস টার্মিনালের যানজট কমাতে গ্যাপের (গ্যারেজে অবস্থানকারী) বাসগুলো পূর্বাচলের নবনির্মিত অস্থায়ী ডিপোতে স্থানান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে পূর্বাচলের ৩ নম্বর সেক্টরে রাজউকের প্রায় ১০ একর জমিতে নির্মিত অস্থায়ী ডিপোতে বাস স্থানান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, মহাখালী বাস টার্মিনালে প্রায় ৪০০টি বাস রাখার সক্ষমতা থাকলেও প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার বাসের আসা-যাওয়ায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পূর্বাচলে অস্থায়ী ডিপো নির্মাণ করে গ্যারেজে অবস্থানকারী বাসগুলো সেখানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, এই উদ্যোগের ফলে মহাখালীকেন্দ্রিক যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাস কাউন্টার সরানোর নির্দেশ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বাস কোম্পানির ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা টিকিট কাউন্টার দ্রুত নির্ধারিত ও স্থায়ী স্থানে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, যত্রতত্র কাউন্টার স্থাপন এবং সেখান থেকে যাত্রী ওঠানামার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানজট ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। তাই নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে বাস কাউন্টারগুলোকে পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজধানীতে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত বাসস্টপের সংখ্যা কমবে, সড়কে বাসের অপ্রয়োজনীয় অবস্থান হ্রাস পাবে এবং যাত্রী ওঠানামার জন্য একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
কেন সরানোর পরিকল্পনা?
সরকারের যুক্তি, রাজধানীর কেন্দ্রে বড় বাস টার্মিনাল থাকায় আন্তজেলা বাস শহরের ভেতরে প্রবেশ করে অতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি করছে। যাত্রী ওঠানামা, দীর্ঘ সময় বাস পার্কিং, অবৈধ দখল, সড়কে বাসের সারি এবং টার্মিনালকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে চাপ বাড়াচ্ছে। এ কারণে শহরের প্রান্তে আধুনিক টার্মিনাল ও ডিপো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
তবে পরিকল্পনা ঘোষণার কিছুদিন পরই সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, এখনই বিদ্যমান বাস টার্মিনালগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে না। পরিবর্তে বাসগুলো শহরের বাইরের ডিপোতে রাখা হবে। নির্ধারিত সময়ে বাস টার্মিনালে এসে যাত্রী নিয়ে আবার শহরের বাইরে ফিরে যাবে। এতে রাজধানীর ভেতরে দীর্ঘ সময় বাস অবস্থান করবে না এবং সড়কের ওপর চাপ কমবে বলে মনে করছে সরকার।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন বর্তমানে অনেক বাস টার্মিনাল ডিপো ও ওয়ার্কশপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বন্ধ করা হবে। এ জন্য ৩০০ ফিট এলাকা ও কাঁচপুরে নতুন ডিপো গড়ে তোলা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুরে, ফুলবাড়িয়া কেরানীগঞ্জে, গাবতলী হেমায়েতপুরে এবং মহাখালী উত্তরায় স্থানান্তর করা হবে।
আপাতত নতুন স্থানগুলো ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বাসগুলো সেখান থেকে নির্ধারিত সময়ে বর্তমান টার্মিনালে এসে যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। বর্তমান টার্মিনালগুলো যাত্রী ওঠানামার জন্য থাকলেও ভবিষ্যতে আর ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।
বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নতুন টার্মিনালের জন্য পর্যাপ্ত জমি অধিগ্রহণ, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, গণপরিবহন সমন্বয়, যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা, পার্কিং ও বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত না হলে নতুন টার্মিনাল কার্যকর হবে না। এছাড়া মহাখালীর জন্য পূর্বাচলে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণের আলোচনা থাকলেও বাস্তবায়নের দায়িত্ব ও জমি প্রস্তুতের কাজ এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের আপত্তি
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শুধু টার্মিনাল সরিয়ে দিলেই যানজট কমবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তাদের মতে, রাজধানীর মূল সমস্যা হলো অপরিকল্পিত বাস পরিচালনা, সড়কে অবৈধ পার্কিং, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত গণপরিবহনের অভাব। এসব সমস্যার সমাধান না করে টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে দিলে যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও সংযোগের নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
সামনে কী?
বর্তমান অবস্থায় মহাখালী বাস টার্মিনাল তাৎক্ষণিকভাবে সরছে না। তবে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এটি স্থানান্তরের বিষয়টি বহাল রয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে নতুন অবকাঠামো, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা, যাত্রীসেবা এবং পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, কেবল টার্মিনালের অবস্থান পরিবর্তন নয়; সমন্বিত গণপরিবহন, আধুনিক বাস ব্যবস্থাপনা, কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং নগর পরিকল্পনার সংস্কার একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলেই রাজধানীর যানজট নিরসনে টেকসই সুফল পাওয়া সম্ভব।





