মহেশপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি নবায়নে ঘুষ দাবির অভিযোগ ডা. হেলেনা আক্তার নিপা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে

মহেশপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি নবায়নে ঘুষ দাবির অভিযোগ ডা. হেলেনা আক্তার নিপা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে

চাকরি করতে হলে দিতে হবে ঘুষ! নিয়োগপত্র পেতে গুনতে হবে লাখ টাকার বান্ডিল! আর সেই টাকা দিতে না পারলেই হারাতে হবে বছরের পর বছর ধরে করে আসা চাকরি! ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আউটসোর্সিং কর্মীদের নিয়োগপত্র, পদ পরিবর্তন ও চাকরিতে বহাল রাখা ঘিরে উঠেছে এমনই গুরুতর সব অভিযোগ।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নিপা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আল-ওয়াফা সিকিউরিটি সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মনিরুল ইসলাম। নিয়োগপত্র নবায়ন, পদ পরিবর্তন এবং চাকরিতে বহাল রাখার নামে তাঁদের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে।

ঠিকাদারের ঘুষ দাবি ও কর্মীদের অভিযোগ

অনুসন্ধানের শুরুতেই কথা হয় মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কুক-মশালচি পদে কর্মরত শাকিল আহমেদের সঙ্গে। তাঁর অভিযোগ, আল-ওয়াফা সিকিউরিটি সার্ভিস দায়িত্ব নেয়ার পর নিয়োগপত্র নবায়নের জন্য ঠিকাদার মনিরুল ইসলাম তাঁর কাছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। শুধু তাই নয়, টাকা দিতে না পারলে চাকরি হারানোর ভয়ও দেখানো হয় শাকিলকে। সেইসঙ্গে শাকিল আহমেদ ছাড়াও মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরও অনেক কর্মীর কাছ থেকে লাখ টাকার বেশি ঘুষ দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নিপাকে জানালে, কেউ তাঁদের চাকরি কেড়ে নিতে পারবে না বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। এরপরও ঠিকাদার বিভিন্নভাবে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকলে গত আগস্টে মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে আসা স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের কাছে ঘুষ দাবির অভিযোগ তুলে ধরে ভুক্তভোগীরা। এ সময় তাঁদের পাশে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নিপাও। তবে অভিযোগকারীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের টাকা না নেয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ডা. হেলেনা আক্তার নিপাকে নির্দেশ দেন তিনি।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ

কিন্তু থলের বিড়াল যেন লুকিয়ে ছিল অন্য কোথাও! যাঁর কাছে নিজেদের অভিযোগের কথা জানিয়েছিল ভুক্তভোগীরা, সেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নিপার বিরুদ্ধেই এবার উঠে আসে পুরো ঘটনার নেপথ্যে থাকার অভিযোগ। শাকিলের দাবি, এখন আর ঠিকাদার নন, বরং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নিপাই তাঁদের ঠিকাদারকে টাকা দিতে চাপ প্রয়োগ করেন।

অন্যদিকে, শিমু আক্তার নামের এক টিকিট কিলারের কাছ থেকেও উঠে আসে ঠিকাদারের ঘুষ দাবির অভিযোগ। শিমুর অভিযোগ, ঠিকাদার তাঁর কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করলে তিনি তাঁকে ৪০ হাজার টাকা দেন। পরবর্তীতে শিমু বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নিপাকে জানালে, তিনিই শিমুর কাছে বাকি দেড় লাখ টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন শিমু। এমনকি সেই টাকা দিতে না পারায় তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

টাকার বিনিময়ে পদ পরিবর্তন ও নিয়োগ

অন্যদিকে, কমপ্লেক্সটিতে টাকার বিনিময়ে পদ পরিবর্তন ও নতুন কর্মী নিয়োগ নিয়েও উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। শিমু আক্তারের অভিযোগ, পান্না খাতুন নামের এক আয়া এক লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ডা. হেলেনা আক্তার নিপার মাধ্যমে তাঁর জায়গায় টিকিট কিলার পদে যোগদান করেছেন। এদিকে, বাংলা এডিশনের হাতে আসা একটি অডিও রেকর্ড থেকেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক লাখ ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে পান্নার পদোন্নতির বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায়। এখানেই শেষ নয়! সিভিল সার্জনের নাম ভাঙিয়ে প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে নেয়ার অভিযোগও উঠেছে ডা. হেলেনা আক্তার নিপার বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক, ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে হাসপাতালের আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত ভুক্তভোগীরা।

সিভিল সার্জনের প্রতিক্রিয়া

এদিকে, ঝিনাইদহের সিভিল সার্জনের কাছে তাঁর নাম ভাঙিয়ে ডা. হেলেনা আক্তার নিপার অর্থ গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, তাঁর কিছুই জানা নেই বলে মন্তব্য করেন। সেইসঙ্গে ঠিকাদার মনিরুল ইসলাম ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তারের ঘুষ নেয়ার বিষয়ে বলেন, তাঁদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই। একইসঙ্গে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন সিভিল সার্জন।

পূর্বের অভিযোগ ও অন্যান্য তথ্য

তবে ডা. হেলেনা আক্তার নিপাকে ঘিরে অভিযোগের পরিধি শুধু মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত চার কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া ক্রয় ভাউচারের মাধ্যমে তিনি অনিয়ম করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যক্তিগত-৪ শাখার সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডা. আবু হেনা মোহাম্মদ জামাল শুভর সহযোগিতায় ডা. নিপাকে জবাবদিহির আওতায় আনার পরিবর্তে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়।

এদিকে, ডা. হেলেনা আক্তার নিপার বিরুদ্ধে প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে চিকিৎসক হওয়ার অভিযোগও উঠে আসে বিভিন্ন সূত্রে। জানা যায়, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে, ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন তিনি।

এদিকে, অভিযুক্ত ঠিকাদার মনিরুল ইসলাম এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার নিপার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সব মিলিয়ে ভুক্তভোগীদের এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং দোষ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। তা না হলে, ঘুষের অদৃশ্য শিকলে বন্দি হয়ে থাকবে কর্মীদের অধিকার, আর প্রশ্নবিদ্ধ হবে জনস্বাস্থ্যসেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।