মানুষের দুঃখ থেকেই কিন্তু সৃজনের সৃষ্টি | চ্যানেল আই অনলাইন

মানুষের দুঃখ থেকেই কিন্তু সৃজনের সৃষ্টি | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশের মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত আতাউর রহমান ছিলেন একাধারে নাট্যজন, অভিনেতা, মঞ্চনির্দেশক ও লেখক। ‘মঞ্চসারথি’ উপাধিতে পরিচিত এই বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জন্ম ১৯৪১ সালের ১৮ জুন, নোয়াখালীতে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের নাট্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে অসামান্য অবদান রেখে যাওয়া এই গুণীজন সোমবার (১১ মে) রাত ১১টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের মঞ্চনাটক আন্দোলনকে সুসংগঠিত ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।

বরেণ্য এই নাট্যব্যক্তিত্বের প্রয়াণে তাঁকে স্মরণ করে চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য পুনর্বার প্রকাশ করা হলো সাক্ষাৎকার। ২০২১ সালে নেওয়া এই সাক্ষাৎকারে আতাউর রহমান কথা বলেছিলেন তাঁর নাট্যচিন্তা, শিল্পভাবনা ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন শাহাদাত হোসেন তৌহিদ

‘মঞ্চসারথি’ আপনার উপাধি। নাটক নিয়ে আপনার কারবার। নাটকসংক্রান্ত এ দেশের মানুষের মনোভাব কি এখনো রক্ষণশীল?

পৃথিবীর সব জায়গাতেই রক্ষণশীলতা রয়েছে। সাধারণভাবে এখন অনেক ঔদার্য এসেছে। এখনো অনেক পরিবার মনে করে, নাটক দেখা হয়তো শরিয়তবিরোধী। আবার অনেকে কিন্তু দ্বি-চারিণী। মানে এটাও করে, ওটাও করে। তাসও খেলে, নামাজও পড়ে। এটা নিয়ে অনেকের সঙ্গে আমার ঝগড়াও হয়েছে যে-আপনি নামাজও পড়ছেন আবার তাসও খেলছেন। আপনাকে দুটোর একটা করতে হবে। আর যদি বলেন, নাটক-গান নয় শুধু ধর্মীয় পুস্তক নিয়ে আলোচনা হবে, তবে হোক। সেটাও একধরনের সংস্কৃতি, সবকিছুই সংস্কৃতি। সবকিছু মিলিয়ে কিন্তু পৃথিবীটা তৈরি। ধর্মীয় আলোচনা কিন্তু পৃথিবীর অংশ। ধর্মীয় আলোচনা যিনি করেন, তিনি গানও শোনেন। আমাদের মহানবীর সময় হামদ-নাত হতো। ইনস্ট্রুমেন্ট ছাড়া মিউজিক হতে পারে-মহানবী (সা.) বলতেন।

নাট্যচর্চার পাশাপাশি আপনি রবীন্দ্রচর্চা ও শেকসপিয়র চর্চাতেও বহুদিন ধরে রত আছেন- এ সংক্রান্ত ব্যস্ততা নিয়ে যদি কিছু বলতেন।

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলতে গেলে এটা আমার একধরনের কৌতূহল। কৌতূহল মানুষকে অনেক দূর নিয়ে চলে যায়। আমি চীনে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়েছি। প্রায় ষাট মিনিট বাংলা একাডেমিতে একক বক্তৃতা দিয়েছি। এভাবে বহু জায়গায় দিয়েছি। এক জায়গাতে একজন বলল- তুমি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এত বলছ, নজরুল সম্পর্কে বলতে পারবে? আমি বলেছি, দুই ঘণ্টা বলতে পারব। তারপর জেদ করে বললাম আমি স্টিফেন হকিংয়ের ‘ব্ল্যাক হোল’ নিয়ে এক ঘণ্টা বক্তৃতা দিতে পারব। আমি নিউটন-আইনস্টাইন সম্পর্কে এক ঘণ্টা করে বলতে পারব। কারণ, আমার জীবন সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রচুর। কেতাবি ধর্ম নিয়ে একবার আমি রাত চারটা পর্যন্ত পড়লাম হজরত ইব্রাহিম থেকে শুরু করে দাউদ-মুসা হয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর ‘ইক্বরা বিসমে রাব্বিকাল্লাজি খালাক’ এসে থামলাম। রাত চারটার আমার ছোট ভাই দেখল আমার ইন্টারনেট ওপেন। আমার স্ত্রীকে ফোন করে জাগিয়ে সে বলল, ভাইয়ের বয়স হয়েছে ওনাকে ঘুমিয়ে পড়তে বলো। এই যে আগ্রহ, মুক্তিযুদ্ধের গানও আছে, মহাশ্বেতা দেবীও আছে। কী নেই আমার এখানে, ভারতের গ্রেটেস্ট স্পিচেস আছে। বাড়ি হবে বিদ্যালয়- সেই জায়গাটা এখন আর নেই। এখন সবাই ক্যারিয়ারের পেছনে দৌঁড়াচ্ছে।

সংস্কৃতি বিকাশে আর কী কী করা যেতে পারে?

আমি প্রায়ই বলি, ১৯৫৬ সালে ভাঙা ক্যামেরা দিয়ে সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী, অপুর সংসার, অপরাজিতা’ করেছিলেন সেটাকে আজ পর্যন্ত কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। যে কাজ করছে সে মানুষটিকে সবচেয়ে বড় হতে হয়। টেকনোলজির দরকার আছে, কিন্তু টেকনোলজি সবচেয়ে বড় নয়। সেটা মনে রেখে মানুষ তৈরি করতে হবে। স্কুল-কলেজে বেশি শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি কবিতা পড়াতে হবে। শিল্পমনস্ক করে গড়ে তুলতে হবে। সবার মাঝে দেশপ্রেমকে যদি উজ্জীবিত করা যায় তাহলে শিল্প-সংস্কৃতি এমনিই চলবে। আমাদের কবিতা-সাহিত্য এগিয়ে চলবে। আমাদের মধ্যে আধুনিক যুগে আবদুল্লাহ আল মামুন হয়েছেন, সেলিম আল দীনের মতো নাট্যকার হয়েছেন, সৈয়দ হকের মতো বহুপ্রতিভা লেখক হয়েছেন। সুযোগ পেলেই যে ভালো হবে-এর কোনো অর্থ নেই। কারণ মানুষের দুঃখ থেকেই কিন্তু সৃজনের সৃষ্টি। সৃজনের জন্মই দুঃখ থেকে।

সৃজনের জন্মই দুঃখ থেকে, একটু ব্যাখ্যা করবেন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ট্যাংকের মধ্যে বসে একজন লিখছেন। ঠিক নেই কখন গুলি ও বোমা পড়ে মরে যাবে কিন্তু লিখছেনই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ প্রায় না খেয়ে মারা যান। জীবনানন্দ দাশ ট্রামের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে না খেয়ে মারা গেছেন। দুঃখ-বেদনা থেকে কবিতার জন্ম। বাল্মিকী দস্যু রত্নাকর থেকে বাল্মিকী হলেন সেটা অন্য কাহিনি। তিনি দেখলেন- পঞ্চপাখি প্রেম করছে বা কাছাকাছি যেমন কবুতররা করে, তখন তাদের একটিকে মেরে ফেলার পর ওই পাখিরা উড়ে। একটা মরলে কাকও উড়ে। উড়ে মানে কাঁদতে থাকে। কা কা করে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। তখনই বাল্মিকীর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল পৃথিবীর প্রথম শ্লোক বা কবিতা—‘‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্।’’ রবীন্দ্রনাথ বলছেন- ‘এতেই কি বলিয়া মনি সাপ দিলো তারে, সেই সাপে এক শ্লোক নিঃস্বরিলো বুকে।’ সেই শোক হইতে শ্লোকের হইল উপাদান। দুঃখ থেকে কবিতার জন্ম।

তাপর একদা বিশ্বকর্মাকে পাঠিয়ে ব্রহ্মা বললো-তুমি এই নবরত্ন ছন্দ দিয়ে কী করবে? বিশ্বকর্মা বললো, আমি তো জানি না। বলে, রামের জীবনী লিখব। রাম সম্পর্কেও জানে না। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, তুমি রচিবে যাহা তাহাই সত্য বটে কবির কলমে। এখন শোনা যায় যে, জন্মই হয়নি রামের কিন্তু রামায়ণ লেখা হয়ে গেছে। কাজেই দুঃখ ও বেদনা ছাড়া শিল্প সৃজন হয় না। খুব সুখী মানুষকে দিয়ে শিল্প সৃজন হয় না।

আপনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যমের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

গণমাধ্যমে সংবাদের পাশাপাশি নাচ-গানও থাকতে হবে। ক্ল্যাসিক্যাল ডান্স হতে পারে, মণিপুরি নৃত্য হতে পারে, ভাওয়াইয়া, আধুনিক গান হতে পারে। কবিতা আবৃত্তির একটা সেশন হতে পারে। একটা বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্কের সেশন করতে হবে। কারণ সবকিছু মিলিয়ে সংস্কৃতি। কোনটা আমি নেব আর কোনটা নেব না, সেটা আমার বিষয়। মানুষের সামনে তো অনেক খাবার থাকে। মানুষ কি সবকিছু খায়? বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেন এসব পৌঁছে যায়, তাহলে আমার মনে হয় লোকে মজা পাবে।