যুক্তরাষ্ট্রের হাই-প্রেস নাকি প্যারাগুয়ের রক্ষণ প্রাচীর, কার দখলে যাবে গ্রুপ-ডি? | চ্যানেল আই অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের হাই-প্রেস নাকি প্যারাগুয়ের রক্ষণ প্রাচীর, কার দখলে যাবে গ্রুপ-ডি? | চ্যানেল আই অনলাইন

৪৮ দলের অংশগ্রহণে গড়াতে চলা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ গড়াতে বাকি এক সপ্তাহেরও কম সময়। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ও মেক্সিকোতে গড়াতে চলা আসরটিতে একটু ভিন্নভাবেই নজর কেড়েছে গ্রুপ-ডি। প্রায় সমশক্তির চারটি দলই লড়বে নকআউটের দৌড়ে। যেখানে ঘরের মাঠের সুবিধা নিয়ে মাঠে নামবে স্বাগতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে স্বস্তিতে থাকার সুযোগ নেই পোচেত্তিনোর শিষ্যদের। ইউরোপের উদীয়মান ডার্ক হর্স তুরস্ক, লাতিন আমেরিকার রক্ষণ প্রাচীর প্যারাগুয়ে আর এশিয়ার চেনা শক্তি অস্ট্রেলিয়ার উপস্থিতিতে এই গ্রুপটি রূপ নিয়েছে এক জমজমাট রণক্ষেত্রে।

কাগজে-কলমে এবং শক্তিমত্তায় এই গ্রুপে কেউ কারো থেকে খুব বেশি এগিয়ে নয়। তবে ঘরের মাঠের সুবিধা ও দ্রুতগতির ফুটবলে গ্রুপসেরার দৌড়ে বেশ এগিয়ে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। সোনালী প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে আসা তুরস্কও অবশ্য এই দৌড়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পিছিয়ে নেই অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়েও। এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশ দুটিও পরবর্তী রাউন্ডের বড় দাবিদার। কারও একক আধিপত্য নিশ্চিত নয় বলে এটিকে এবারের আসরের অন্যতম আন-প্রেডিক্ট গ্রুপ ধরা হচ্ছে। শক্তিমত্তা ও ইতিহাসের বিচারে কে কতটা এগিয়ে, চলুন দেখে নেওয়া যাক চ্যানেল আই অনলাইনের বিশ্লেষণ এক নজরে।

ফিফার সবশেষ প্রকাশিত র‌্যাঙ্কিংয়ে ‘ডি’ গ্রুপে সবার চেয়ে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। ১৬ নম্বরে আছে তারা। এরপরই অবস্থান তুরস্কোর, র‌্যাঙ্কিংয়ে ২২ নম্বরে দেশটি। ২৭ নম্বরে থাকা অস্ট্রেলিয়া আছে তৃতীয় স্থানে। সবার শেষে অবস্থান করা প্যারাগুয়ের ফিফা র‌্যাঙ্কিং ৪০তম।

যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্ব ফুটবলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্য পরাশক্তি বলা চলে না। সেরা সাফল্য ১৯৩০ সালের প্রথম আসরে তৃতীয় স্থান অর্জন করা। আধুনিক ফুটবলে তারা নিয়মিত মুখ হলেও গত তিন আসরেই (২০১০, ২০১৪, ২০২২) শেষ ১৬-তে থেকে বিদায় নিয়েছিল। তবুও ঘরের মাঠ, চেনা কন্ডিশনে দর্শকভর্তি গ্যালারির সমর্থন নিয়ে ভালো কিছুর আশা টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বে অপরাজিত থেকে পরের রাউন্ডে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু শেষ ষোলোয় শক্তিশালী ডাচ দলের কাছে ৩-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় দল। তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মরিসিও পচেত্তিনো দলটির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আক্রমণাত্মক ও প্রেসিং ফুটবলের ওপর জোর দিয়ে এসেছেন। তার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র দল আরও শক্তিশালী এবং আরও বেশি ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাতে বলা চলে বেশ এগিয়েই থাকবে দলটি।

তুরস্ক
সবশেষ ২০০২ সালে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল তারা। সেবার সবাইকে চমকে দিয়ে তৃতীয় হয়েছিল তুরস্ক। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর তারা মূল পর্বে কোয়ালিফাই করতে পারেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে বড় স্বপ্ন নিয়েই বিশ্ব মঞ্চে প্রত্যাবর্তন করেছে দলটি। ইতিহাস বলছে তুরস্ক বিশ্বকাপে আসা মানেই নতুন কোনো রূপকথা লেখা। ১৯৫৪ সালে সাউথ কোরিয়াকে গোলবন্যায় ভাসানো কিংবা ২০০২ সালে সেমিফাইনালে ওঠা- সবই যেন বহন করে তুর্কিদের লড়াকু চরিত্রের পরিচয়।

তুরস্কের এই ফিরে আসার গল্পটি তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার এক দুর্লভ সংমিশ্রণে লেখা। রিয়াল মাদ্রিদের আর্দা গুলের এবং জুভেন্টাসের কেনান ইলদিজ প্রতিপক্ষ যেকোনো দলের রক্ষণভাগের জন্যই বড় আতঙ্ক। বাছাইয়ে দারুণ পারফর্ম করেই বিশ্ব মঞ্চে পা রেখেছে ভিনসেঞ্জো মন্তেলার শিষ্যরা। ইতালিয়ান এই কোচের অধীনে গত আড়াই বছরে ২৪ ম্যাচের ১৬টিতে জয় পেয়েছে তুরস্ক। তাতে বলা চলে, এবারের তুরস্ক দলটি আগের চেয়ে অনেক বেশি লড়াকু। তাছাড়া রক্ষণভাগের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে মন্তেল্লা যে নতুন ছক কষেছেন, তা নর্থ আমেরিকার কন্ডিশনে বড় দলগুলোর জন্য আতঙ্কের কারণ হতে পারে। দুই দশক আগের সেই সোনালি গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষেই নামবে তারা মহারণে।

অস্ট্রেলিয়া
স্বপ্নটা হয়তো খুব বড় নয় ১৯৭৪ সালে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া অস্ট্রেলিয়ার। এবার টানা ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছে দেশটি। বিশ্বকাপে মোট ৮ বার অংশ নেয়া সকারুদের সেরা সাফল্য শেষ ষোলো। ২০০৬ সালে তারা প্রথমবার শেষ ষোলে গিয়েছিল। ২০২২ সালে তারা আবার সেই সাফল্য পেয়েছিল, এমনকি আর্জেন্টিনার সাথে চোখে চোখ রেখে লড়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার লড়াইয়ে। কাতার বিশ্বকাপের মতো এবারও অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য গ্রুপপর্বের বৈতরণি পেরিয়ে পরের রাউন্ডে উন্নীত হওয়া।

এই প্রজন্মের অস্ট্রেলিয়া অনেক বেশি ট্যাকটিক্যালি পরিপক্ব। কোচ টনি পোপোভিচের অধীনে দলটির শক্তির জায়গা রক্ষণ। ঘর সামলে আক্রমণে উঠে আসেন এবং তারা এটা করেন খুবই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। এশিয়া অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্রথম রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়া ৬ ম্যাচের ছয়টিতেই জিতেছে। একটা ম্যাচেও গোল হজম করেনি। ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার দলগুলোর তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও নিজেদের লড়াকু মানসিকতায় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে যেকোনো দলের বিপক্ষে।

প্যারাগুয়ে
২০১০ সালে সাউথ আফ্রিকা বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল প্যারাগুয়ে। বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা সাফল্য অর্জনের পরবর্তী তিনটি আসরেই বাছাইপর্ব পেরোতে পারেনি। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ আসরের পর অবশেষে ১৬ বছর পর বিশ্ব মঞ্চে প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকা দেশটির। এক বছর আগেও লাতিন আমেরিকার ফুটবলে দেশটি ধুঁকছিল, সেই প্যারাগুয়ে এখন ২০২৬ বিশ্বকাপে রঙিন স্বপ্ন বুনছে। তাদের এই ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার গল্পটা কেবল মাঠের কৌশলের নয়, বরং হার না মানা মানসিকতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন।

এর পেছনেও অবশ্য একজন রয়েছেন, যিনি গুস্তাভো আলফারো। ২০২৪ কোপা আমেরিকায় প্যারাগুয়ে তিনটি ম্যাচের তিনটিতেই হেরেছিল। এরপর দায়িত্ব নেন আর্জেন্টাইন কোচ আলফারো। আলফারো। আর বদলে দিলেন সকল সমীকরণ। মাত্র কয়েক মাসে তার অধীনে দলটা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়েকে হারিয়েছে, অপরাজিত থেকেছে টানা ৮ ম্যাচে। তাতেই ধারণা করা যাচ্ছে, চমক দেখাতে চলেছে দলটি।

আলফারোর অধীনে প্যারাগুয়ের সাফল্যের মূল ভিত্তি তাদের জমাট রক্ষণভাগ। বাছাইপর্বে ১৪ গোল করেছে ১৮ ম্যাচে, যা সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত করা দলগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে হজমও করেছে মোটে ১০ গোল, তাতেই পরিষ্কার দলটা কেমন পোক্ত রক্ষণ নিয়ে আসছে এবার। যদিও আক্রমণভাগে বড় কোনো মহাতারকা নেই, কিন্তু দিয়েগো গোমেজ বা হুলিও এনসিসো মতো তরুণ ফুটবলাররা যেকোনো মুহূর্তের জাদুতে বদলে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে হয়তো কোনো নতুন রূপকথা গল্প লেখাই তাদের লক্ষ্য।

ঘরের মাঠ, পরিচিত পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে এই গ্রুপে এগিয়ে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিপক্ষে আছে শক্তিসামর্থ্যে খুব কাছাকাছি আরও তিনটি দল। তুরস্কের তরুণদের আক্রমণাত্মক ফুটবল, প্যারাগুয়ের রক্ষণ এবং অস্ট্রেলিয়ার যেকোনো বড় দলকে চমকে দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে। ফলে গ্রুপ ডি’র প্রতিটি ম্যাচই বেশ রোমাঞ্চের আভাস দিচ্ছে।