জীবন থেকে জন্ম নেয় নাটক, আবার নাটকের চরিত্রগুলোই যেন জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেই জায়গা থেকেই মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ নির্মিত ‘এটা আমাদেরই গল্প’ আজকের দর্শকের কাছে এতটা আপন হয়ে উঠেছে। চ্যানেল আই ও সিনেমাওয়ালা ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত এই ধারাবাহিকের ৪৭তম পর্ব দেখার পর দর্শক এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পরবর্তী পর্বের জন্য। শোনা যাচ্ছে, আর কয়েক পর্বের মধ্যেই শেষ হতে পারে নাটকটি—তাই দর্শকের মনে এক ধরনের অতৃপ্তি, গল্পটা যেন শেষ না হয়।
‘এটা আমাদেরই গল্প’ মূলত একটি যৌথ পরিবারের গল্প—যা নামের সঙ্গেই চমৎকারভাবে মিলে যায়। এ কারণেই নাটকটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। আসলে এমন অনেক নাটক, উপন্যাস কিংবা সিনেমা আমাদের মনে দাগ কাটে, কারণ সেগুলো আমাদেরই জীবনের প্রতিফলন।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদ-এর কালজয়ী নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’। ৮০’র দশকে বিটিভিতে প্রচারিত এই ধারাবাহিকটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, টেলিভিশন না থাকলেও মানুষ একে অপরের বাড়িতে গিয়ে তা দেখত। দিলারা জামান, বুলবুল আহমেদ, আসাদুজ্জামান নূর, খালেদ খান, লুৎফুর নাহার লতা, ডলি জহুরসহ প্রতিটি শিল্পীর অভিনয় ছিল অনবদ্য। বিশেষ করে নীলু ভাবীর চরিত্রে ডলি জহুর এবং সাহানা চরিত্রে শিল্পী সরকার অপু দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সময়ের পরিক্রমায় সেই সাহানা চরিত্রের অভিনেত্রীই আজ ‘এটা আমাদেরই গল্প’-এ মেহেরিনের মায়ের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছেন—যা যেন এক মধুর নস্টালজিয়া।
একইভাবে মনে পড়ে হুমায়ূন আহমেদ-এর আরেক কালজয়ী সৃষ্টি ‘কোথাও কেউ নেই’। ৯০’র দশকের শুরুতে প্রচারিত এই নাটক ঘিরে যে আবেগ তৈরি হয়েছিল, তা আজও অনন্য। বাকের চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূর-এর ফাঁসি মেনে নিতে পারেনি দর্শক; রাস্তাঘাটে, পাড়া-মহল্লায় মানুষ প্রতিবাদ করেছে। আর মুনা চরিত্রে সুবর্ণা মুস্তফা-র আত্মত্যাগ দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
এই নাটকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল বদী, যে স্ত্রীর প্ররোচনায় নিজের প্রিয় মানুষ বাকেরের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়। সেই স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দীপা খন্দকার—একটি জটিল, মানবিক ও দ্বন্দ্বময় চরিত্র। আর আজকের ‘এটা আমাদেরই গল্প’-এ সেই দীপা খন্দকারই ফাতেমা চরিত্রে, সামিরের ফুপু হিসেবে এক মমতাময়ী নারীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন। দুই ভিন্ন সময়ে, দুই ভিন্ন চরিত্রে তার অভিনয় যেন জীবনের নানা রূপকেই তুলে ধরে।
আসলে নাটক আমাদের শুধু বিনোদন দেয় না, আমাদের ভাবায়, শেখায়, আর আমাদের নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তাই এই গল্পগুলো, এই চরিত্রগুলো—সময় পেরিয়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে।
আশা করা যায়, এমন গল্পগুলো চিরকালই বেঁচে থাকবে—আমাদের জীবনেরই আয়না হয়ে।







