
টরন্টো শহরটাকে যারা শুধু আজকের কাচের অট্টালিকা, ঝলমলে স্কাইলাইন আর পর্যটকদের ভিড় দেখে চেনেন, তাঁরা হয়তো জানেন না, এই শহরেরও কিছু অন্ধকার অধ্যায় আছে। এমন কিছু ঘটনার কথা বছরের পর বছর মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়, অথচ সেগুলোর প্রতিটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি, আদালতের সিদ্ধান্ত কিংবা সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিশ্চিত বিবরণ পাওয়া যায় না। কেউ বলে সত্যি, কেউ বলে গুজব। আবার কেউ বলে, প্রতিটি শহরেরই এমন কিছু গল্প থাকে, যেগুলো কখনো পুরোপুরি প্রমাণ করা যায় না, আবার অস্বীকারও করা যায় না।
টরন্টোতে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পুলিশকে ঘিরে বাস্তব ঘটনা, অভিযোগ ও জনশ্রুতির এক অস্বস্তিকর মিশ্রণ প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল “Cherry Beach Express” নামে পরিচিত একটি কথিত প্রথা। অভিযোগ ছিল, কিছু পুলিশ সদস্য আটক ব্যক্তিদের শহরের নির্জন চেরি বিচ এলাকায় নিয়ে গিয়ে মারধর করতেন কিংবা সেখানে ফেলে রেখে আসতেন। বহু বছর ধরে এটি টরন্টোর নগর-লোককাহিনির অংশ হয়ে আছে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে টরন্টোর ডাউনটাউন, বিশেষ করে ইয়াং ও ডান্ডাসের মোড়, শেরবোর্ন এবং কুইন স্ট্রিটের কিছু এলাকায় পুলিশের টহল ও নজরদারি আজকের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রাসী ছিল। সেই সময় রাস্তায় দায়িত্বরত কিছু পুলিশ কর্মকর্তা প্রকাশ্য অবাধ্যতা বা অপমানজনক আচরণকে তাঁদের পেশাগত কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতেন। কেউ জনসমক্ষে কিংবা সরাসরি পুলিশকে উদ্দেশ করে অশালীন শব্দ ব্যবহার করলে কোনো ব্যাখ্যার সুযোগ না দিয়েই তাকে “শান্তি ভঙ্গ” বা “অশালীন আচরণের” অভিযোগে হাতকড়া পরিয়ে লকআপে নিয়ে যাওয়া হতে পারত।
সে সময় টরন্টো পুলিশকে ঘিরে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ (excessive force) এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে একাধিক দেওয়ানি মামলা হয়েছে। মামলায় বাদীরা দাবি করেছেন যে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাদের মারধর করেছে বা অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ করেছে।
সেই সময়ে পুলিশ খুব সহজেই ক্রাইমিনাল কোডের ১৭৫ ধারা বা “শান্তি ভঙ্গ” (Causing a Disturbance) আইনের অপব্যবহার করত। অফিসাররা আদালতে গিয়ে শুধু এটুকু বললেই হতো যে, “ওই তরুণের গালির কারণে রাস্তায় মানুষের ভিড় জমে গিয়েছিল বা পরিবেশ উত্তপ্ত হয়েছিল।” বিচারকরাও অনেক সময় পুলিশের এই ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে রায় দিয়ে দিতেন।
১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি বিখ্যাত রায় (R. v. Lohnes) আসে। সেই সময় অনেক আইনজীবী এবং অধিকারকর্মীরা পুলিশের এই ধরনের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে আদালতে শক্ত অবস্থান নিতে শুরু করেন। তারা যুক্তি দেখান যে, পুলিশকে গালি দেওয়া অসভ্যতা হতে পারে, কিন্তু শুধু গালি দেওয়ার কারণে কাউকে ক্রিমিনাল রেকর্ড দিয়ে দেওয়াটা বাড়াবাড়ি। সুপ্রিম কোর্টও তখন এই যুক্তির পক্ষে রায় দেয়। তারপর ১৯৯৫ সালের দিকে চিত্রটি বদলাতে শুরু করে।
আজকের গল্পের শুরু প্রায় তিন দশক আগে।
টরন্টোর শীত তখনও পুরোপুরি নামেনি। শরতের শেষভাগ। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ম্যাপল পাতার লালচে রং স্ট্রিটলাইটের আলোয় আরও গাঢ় দেখাচ্ছিল। অফিস শেষে মানুষ ঘরে ফিরছে। ডাউনটাউনের শেরবোর্ন ও কুইন স্ট্রিটের মোড়ে লাল বাতিতে গাড়ি থামিয়েছিল ১৯ বছরের টগবগে তরুণ আলম। নামটি ছদ্মনাম। মাত্র এক বছর আগে সে কানাডায় এসেছে। ছোটখাটো কাজের পাশাপাশি কলেজে পড়ার চেষ্টা করছে। জীবনের কাছে তার চাওয়াও খুব বেশি ছিল না। একটি স্থায়ী চাকরি, ছোট্ট একটি অ্যাপার্টমেন্ট, আর একদিন বাংলাদেশ থেকে মাকে এনে নিজের কাছে রাখবে। এই ছিল তার স্বপ্ন। কিন্তু মানুষের জীবন সব সময় স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটে না।
বাঙালি তরুণদের অনেকে আমেরিকা বা কানাডায় এসে প্রথম যে নেশাটির সঙ্গে পরিচিত হয়, সেটি বিয়ার; আর ইংরেজিতে প্রথম যে গালিটি শেখে, তার শুরু “F-word” দিয়ে। ইংরেজি ভালোভাবে বলতে না পারলেও কথায় কথায় এই শব্দ ব্যবহারের সময় তারা স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনা করে না। আলমও ছিল তাদেরই একজন। সেদিন তার মন ভালো ছিল না। প্রেমিকা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এর কয়েক মাস আগে চাকরিটিও চলে যায়। প্রেমিকার পেছনে খরচ করতে করতে পকেট শূন্য, দুই মাসের বাড়িভাড়াও বাকি। দিনের পর দিন তার ভেতরে জমেছে এক ধরনের অদৃশ্য ক্ষোভ, যার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। সে অন্য কারও ওপর রাগ করছে, না নিজের ওপর, সেটিও যেন বুঝতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধে সে বারবার হেরে যাচ্ছে। সেদিনও তার মাথার ভেতর ঝড় বইছিল।
ঠিক তখনই একটি পুলিশ ক্রুজার ধীরে ধীরে ইন্টারসেকশন অতিক্রম করছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আলমের মনে হলো, ক্রুজারের ভেতর থেকে পুলিশ কর্মকর্তারা তার দিকে তাকিয়ে আছেন। কেন, কী ভেবে কিংবা কাকে উদ্দেশ করে, আলম নিজেও তা জানে না। হঠাৎ মধ্যমা উঁচিয়ে সে চিৎকার করে উঠল একটি মাত্র শব্দ, “F***!” শব্দটি বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি মিলিয়ে গেল না। অনেক সময় একটি শব্দই একটি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে যথেষ্ট।
পুলিশের গাড়িটি কয়েক গজ সামনে গিয়ে থেমে গেল। দুজন কর্মকর্তা নেমে আলমের গাড়ির দিকে এগিয়ে এলেন। আশপাশের মানুষের চলার গতি যেন একটু ধীর হয়ে গেল। শহরের কোলাহল তখনও ছিল, কিন্তু আলমের কানে সবকিছু ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছিল। একজন কর্মকর্তা গাড়ির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললেন, “ড্রাইভার্স লাইসেন্স, প্লিজ।”
আলম ওয়ালেট বের করতে গিয়ে বুঝতে পারল, তার হাত কাঁপছে। এরপর প্রশ্নের পর প্রশ্ন। শব্দটি কাকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছিল? সে কি পুলিশকে অপমান করেছে? কেন সে চিৎকার করেছিল? আলমের উত্তর ক্রমশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। আশপাশে কয়েকজন পথচারী থেমে তাকিয়ে ছিল। কেউ কিছু বুঝতে পারছিল না, কেউ আবার দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছিল। বড় শহরে মানুষ কৌতূহলী হয়, কিন্তু বেশিক্ষণ থেমে থাকে না। এরপর কী ঘটেছিল, তা নিয়ে পরবর্তীকালে নানা রকম গল্প ছড়িয়ে পড়ে। আলমের শুধু মনে আছে, একজন পুলিশ কর্মকর্তা তার কপালে হাত রেখে জোরে ডলে দিয়েছিলেন। এর পরের ঘটনাগুলো তার স্মৃতিতে অস্পষ্ট। সে আর কিছুই মনে করতে পারে না।
কেউ বলেছিল, সে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বলেছিল, সে নির্দেশ মানেনি। আবার কেউ দাবি করেছিল, পুরো ঘটনাই কয়েক মিনিটের মধ্যে অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়। সত্যিটা আর কখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। শুধু এটুকু জানা যায়, সেদিন সন্ধ্যায় আলম আর নিজের বাসায় ফিরতে পারেনি।
পরদিন সকালে তাকে পুলিশি হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আগের সন্ধ্যায় যাকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সকালে কি সেই একই মানুষ বাইরে ফিরে এসেছিল? আলমের বাসার কাছেই তার প্রিয় একটি কফিশপ ছিল। প্রায়ই সেখানে যেত সে। সেদিন বাসার কাছে ফিরে কফিশপটিতে ঢুকেছিল আলম। কফিশপের এক কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, অন্য দিন দোকানে ঢুকেই সে হাসিমুখে কফি অর্ডার করত। কিন্তু সেদিন কফি নিয়ে অনেকক্ষণ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে ধরা কাপটি ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সে এক চুমুকও খায়নি।
এরপর আলমের আচরণ ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। বন্ধুরা খেয়াল করে, সে আগের মতো কথা বলে না। রাতে ঘুম ভেঙে চমকে ওঠে। কখনও দীর্ঘ সময় একা বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার কখনও কথার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যায়, যেন কোনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করেও পারছে না। পরিচিত মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলতে শুরু করে সে। ছয় মাসের মধ্যে বন্ধুদের কাছে আলম প্রায় অচেনা একজন মানুষে পরিণত হয়।
আলমকে নিয়ে তখন নানা কথা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলল, পুলিশি হেফাজতে তার সঙ্গে ভয়াবহ কিছু ঘটেছিল। কেউ বলল, তার মানসিক সংকট আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল; চাকরি হারানো, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া এবং অর্থকষ্ট তাকে ভেতর থেকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। কোনটি সত্য, আর কোনটির সঙ্গে মানুষের কল্পনা মিশেছে, তা আর নিশ্চিত করা যায়নি। তবে পুলিশের হেফাজত থেকে ফেরার পরই আলম মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল, এই কথাটি একসময় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
তিন দশকেরও বেশি সময় কেটে গেছে। টরন্টো বদলে গেছে। যে মোড় দিয়ে একসময় পুরোনো স্ট্রিটকার কাঁপতে কাঁপতে যেত, সেখানে এখন নতুন প্রজন্মের স্ট্রিটকার চলে। চারপাশে মাথা তুলেছে কন্ডোমিনিয়াম। পুরোনো দোকানের জায়গায় এসেছে চকচকে ক্যাফে। মানুষ বদলেছে, শহর বদলেছে। এই শহরে প্রতিদিন কত গল্পের জন্ম হয়। কিছু প্রকাশিত হয়, কিছু থেকে যায় মানুষের অজানা। অপ্রকাশিত সেই গল্পগুলো একসময় শহরের ইট-কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে যায়। আলমের গল্পটিও তেমনি।
এনএন/ ১৯ জুলাই ২০২৬






