রোহিঙ্গা সংকটে কৌশল বদলের আহ্বান, বাস্তবভিত্তিক নীতির ওপর জোর | চ্যানেল আই অনলাইন

রোহিঙ্গা সংকটে কৌশল বদলের আহ্বান, বাস্তবভিত্তিক নীতির ওপর জোর | চ্যানেল আই অনলাইন

প্রায় এক দশক ধরে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে এখনও সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবতা হলো, সেই সম্ভাবনা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরকারের উচিত প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ধরে রেখে আরও বাস্তবসম্মত অন্তর্বর্তীকালীন কৌশল গ্রহণ করা।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের বিস্তার এবং রাখাইন রাজ্যের বড় অংশে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোতে মানবিক পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে।

ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সামনে অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতাসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুকে উপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, শিবিরগুলোর পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শুধু রোহিঙ্গারাই নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপের মুখে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে শুধু কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি হলেও একজন রোহিঙ্গাও স্বেচ্ছায় ফিরে যায়নি। কারণ, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া অধিকাংশ রোহিঙ্গা রাখাইনে ফিরতে রাজি হয়নি।

এদিকে শরণার্থীশিবিরে চলাচল, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধ রোহিঙ্গাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ সীমিত করেছে। ফলে তারা বিদেশি সহায়তার ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের উচিত শিবিরে নিরাপত্তা ও সুশাসন জোরদার করা, রোহিঙ্গাদের সীমিত পরিসরে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ দেওয়া এবং গ্রহণযোগ্য বেসামরিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করা। এতে একদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তহবিল সংকট বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। একসময় যেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তায় প্রতিজন শরণার্থী নিয়মিত খাদ্য সহায়তা পেতেন, সেখানে অর্থের অভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি সংকুচিত করা হচ্ছে। এর ফলে শিবিরে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে।

রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন, কারণ বর্তমানে রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এই যোগাযোগ হতে হবে সতর্ক ও কৌশলগত, যাতে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তড়িঘড়ি কোনো প্রত্যাবাসন উদ্যোগের পরিবর্তে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের ভিত্তি তৈরিতে এখনই কাজ শুরু করা জরুরি। একই সঙ্গে শরণার্থীশিবিরে কার্যকর নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সংকটের নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মধ্যে সহজ কোনো সমাধান নেই। তবে বাস্তবসম্মত সংস্কার, শিবির ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক কূটনীতিকে সক্রিয় করার মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাও জিইয়ে রাখতে সক্ষম হবে।