শঙ্কার জনসংখ্যা দিচ্ছে সম্ভাবনার হাতছানি | সময় স্পেশাল

শঙ্কার জনসংখ্যা দিচ্ছে সম্ভাবনার হাতছানি | সময় স্পেশাল

<![CDATA[

একসময় জনসংখ্যা নিয়ে শঙ্কিত ছিল বাংলাদেশ। বর্তমানে তা এসে দাঁড়িয়েছে বিশাল জনশক্তি হিসেবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে এ জনশক্তি একদিকে যেমনি দিচ্ছে রেমিট্যান্সের জোগান, অন্যদিকে দেশকে গড়ে তুলছে সুপরিকল্পিতভাবে।

বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার উৎস কর্মক্ষম জনশক্তি। বাংলাদেশের বর্তমান জনশক্তির প্রায় ৬৬ শতাংশই কর্মক্ষম যা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশকে কয়েক দশক পরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ মঈনুল হাসান সময় সংবাদকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের যে সংখ্যক মানুষ কর্মক্ষম বয়সের মধ্যে আছে তাদের কাজে লাগাতে পারলে এটিই দেশের জন্য এক ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। কিন্তু এমন না এটা সবসময় থাকবে। ডেমোগ্রাফিক ও অন্যান্য হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বছর দশেক পর বাংলাদেশের জনসংখ্যায় কর্মক্ষম ও তরুণ যারা আছে তাদের সংখ্যা কিছুটা কমে আসবে। সুতরাং এখন থেকেই বাংলাদেশের এই কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে কাজে লাগাতে হবে।

 

রোববার (৯ এপ্রিল) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সভাকক্ষে পিইসি (পোস্ট ইনিউমারেশন চেক) জরিপের আলোকে জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর সমন্বয়কৃত জনসংখ্যা প্রকাশ করে পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

 

বিবিএসের সর্বশেষ হিসাব থেকে দেখা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যাক জনগোষ্ঠীর বয়স ১৫-১৯; যা মোট জনসংখ্যার ১০ দশমিক ১০ শতাংশ। সমন্বয়কৃত জনসংখ্যার হিসাবে ১ কোটি ৭১ লাখ ৬০ হাজার ১৭৫ জন এ বয়সের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া ২০-২৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ; যা সংখ্যার বিচারে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫১ জন। ২৫-২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ৭২২ জন যা মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

 

আরও পড়ুন: দেশে কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি

 

এ ছাড়া যাদের বয়স ৩০-৩৪ তারা মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ, যারা ৩৫-৩৯ তারা ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ, ৪০-৪৪ বছর বয়সের মানুষেরা ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ৪৫-৪৯ বয়সের ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ, ৫০-৫৪ বয়সের ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ৫৫-৫৯ বয়সের ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ ও ৬০-৬৪ বয়সী মানুষ ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

 

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যেও যাদের বয়স ৪০ এর বেশি তাদের অনুপাত তুলণামূলকভাবে কম। অন্যদিকে বেশিরভাগ কর্মক্ষম মানুষই ৪০ বছর বয়সের নিচে। সে হিসাবে দেশের ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯২১ জন মানুষের মধ্যে ৯ কোটি ৩৬ লাখ ১৯ হাজার ৭৪৩ জনই কর্মক্ষম মানুষ। এদের মধ্যে আবার ৭ কোটি ২৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬১ জন যাদের বয়স ৪০ বছরের নিচে। অর্থাৎ এদের কর্মক্ষম থাকার মতো আরও ২৫ বছরের ওপরে হাতে সময় আছে।

 

আরও পড়ুন: দেশে মোট জনসংখ্যা কত, জানা গেল
 

এ ব্যাপারে মাঈনুল হাসান বলেন, একটি দেশের ১৫-৬৪ বছর বয়সের মানুষের কর্মক্ষম হিসাবে ধরা হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশ বেশ ভালো অবস্থানে আছে। এখানে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা দুটিই আছে। বাংলাদেশ যদি এই সংখ্যক জনসংখ্যাকে কর্মক্ষম করে তুলতে পারে, তাদের সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সর্বোপরি ব্যবস্থা নিতে পারে- তাহলে এক সময়ের বোঝা মনে করা জনসংখ্যার সমৃদ্ধির সম্ভাবনা হয়ে দেখা দেবে। কিন্তু যদি এরা অদক্ষ ও অশিক্ষিত থেকে যায়, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার না কমে, বাল্যবিবাহের হার না কমে তাহলে এই বড় জনসংখ্যা নিয়েই বিপদে পড়তে হবে। এটা নির্ভর করছে মূলত আমরা কীভাবে এ বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগাচ্ছি তার ওপরে।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের মোট জিডিপি ছিল ৪৬০ বিলিয়ন ডলার, মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৮৭ ডলার। তবে বিশ্বমানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমীক্ষাগুলো শুধু জিডিপি ও মাথাপিছু মানের হিসাবে একটি দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে পরিমাপ করে না। এসব উপাত্তের পাশাপাশি একটি দেশের লিঙ্গবৈষম্য, মাতৃ মৃত্যুহার, শিশু মৃত্যুহার, সামাজিক নিরাপত্তা সূচক ও শিক্ষার হারের ঊর্ধ্বমুখী আচরণ জরুরি।

 

আরও পড়ুন: ঢাকার জনসংখ্যা সাড়ে ৪ কোটি, অন্য বিভাগের কত? 
 

বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৯০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে শিশু মৃত্যুহার কমেছে ৯০ শতাংশ। অন্যদিকে গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭২ বছর, যেখানে ভারতে মানুষের গড় আয়ু ৬৯ বছর এবং পাকিস্তানে ৬৬ বছর। এ ছাড়া ১৯৯০ সালের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের তুলনা করলে প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়েছে ৯৮ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণের হার বেশি। অন্যদিকে মাধ্যমিকে যেখানে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার ছিল ১৪ শতাংশ, তা বর্তমানে বেড়ে হয়েছে ৮০ শতাংশ।

 

কিছু সংকট ও সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও এ কথা হলফ করে বলা যায়, বাংলাদেশ চাইলে কর্মক্ষম এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তুলতে পারে, যা দেশের জন্য অনেক বড় শক্তিতে পরিণত হবে।

]]>