বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম দিকে যে কয়জন প্রযোজক ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান তাঁদের ভিতর অন্যতম একজন। প্রথম জীবনে তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সহকারী পরিচালক হিসেবে। আমার বাবা ফজলুল হকের সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন। সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের।
প্রথম দিকে তিনি আগ্রহী ছিলেন প্রোডাকশন এবং অনুষ্ঠান প্রযোজনার প্রতি। যার কারণে চলচ্চিত্র থেকে টেলিভিশনে তাঁর যাত্রা শুরু। মোস্তাফিজুর রহমান প্রচণ্ড আড্ডাপ্রেমী ছিলেন। সবার সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে তিনি অনেক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করে ফেলতেন।
এটাই ছিল মোস্তাফিজুর রহমানের গুণ। এমনিভাবে মোস্তাফিজুর রহমান প্রচুর অনুষ্ঠান করেছেন। জনপ্রিয় নাটক তৈরি করেছেন। মনে পড়ে আমজাদ হোসেনের প্রথম নাটক ‘জব্বার আলী’সহ অসংখ্য নাটকের প্রযোজকও ছিলেন তিনি।
রফিকুল হক দাদুভাইয়ের লেখা ‘নিথুয়া পাতার কান্না’ নাটকটিরও প্রযোজনাও করেছিলেন তিনি। তখন আউটডোর শুটিং খুব কঠিন ছিল। প্রথম দিকে কোনো শব্দ যোগ দেওয়া যেত না। ডাবিং করে পরে শব্দ সংযোজন করা হতো। তবে তিনি কষ্ট করে হলেও আউটডোর শুটিংটা করতেন এবং দর্শকদের চমক উপহার দিতেন।
আমার মনে পড়ে আপন প্রিয় অনুষ্ঠানের প্রযোজনা তিনি করেছিলেন। আফজাল হোসেনের উপস্থাপনায় সেটি ছিল প্রথম ধারাবাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাসহ নানান কাজ মোস্তাফিজুর রহমান শুনতেন এবং বলতেন করে দেখ না কি হয়। এই যে করে দেখানোর যে সুযোগটা আফজাল হোসেন নিতে পেরেছিলেন বলেই জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের তালিকায় ‘আপন প্রিয়’ স্থান করে নিয়েছে। আফজাল হোসেনের বহু নাটকের প্রযোজনাও করেছেন তিনি।
এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কথা আমি বলব-তিনি যেসব নাটক প্রযোজনা করতেন খুব নিখুঁতভাবে করতেন। তার শখ ছিল সিনেমা পরিচালনা করা সেটা তিনি পরিচালনা করেছিলেন ‘শঙ্খনীল কারাগার’। তার সহধর্মিণী রওশন আরা মোস্তাফিজ সংগীতশিল্পী ছিলেন। তিনি নজরুল সংগীতের একজন শিল্পী ছাড়াও সাংবাদিকতা করতেন। মোস্তাফিজুর রহমানের দুই ছেলে। বড় ছেলে অভি মোস্তাফিজ নাটকের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আমার যতদূর মনে পড়ে মাহবুব জামিলের উপস্থাপনায় অনুরোধের গানের আসর গীতি শতদল অনুষ্ঠানটি প্রযোজনা করতেন। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এখন যিনি প্রকৃতি নিয়ে কাজ করছেন এবং স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন মুকিত মজুমদার বাবু।
কাজের প্রতি অন্যরকম আন্তরিকতা ছিল মোস্তাফিজুর রহমানের। দর্শকরা যেন ভালো অনুষ্ঠান দেখতে পারেন সেটাই ছিল তাঁর এবং তাঁর সময়ের প্রযোজকদের একমাত্র চিন্তা। তাদের মতো প্রযোজকরা ছিলেন বলেই দেশের বাইরে থেকেও দর্শকরা কষ্ট করে চেষ্টা করতেন বাংলাদেশ টেলিভিশন দেখার জন্য। আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান অনেক আকর্ষণীয় ছিল তখন। আর এটা সম্ভব হয়েছিল সে সময়ের সফল প্রযোজকদের কারণে।





