
ছবি: রূপপুরের বালিশ-কাণ্ডে দুর্নীতি (কোলাজ)।
সরকারি কেনাকাটায় একই পণ্যের দরে কতটা পার্থক্য হতে পারে, তার একটি উদাহরণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের বালিশ কেনা। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ৬ হাজার ৯৫৭ টাকা থেকে শুরু করে ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত দামে বালিশ কেনা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহারের জন্য একটি বালিশের দর প্রস্তাব করা হয় ২৭ হাজার ৭২০ টাকা।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাবে একেকটি গগলসের দাম ধরা হয় ৫ হাজার টাকা, হ্যান্ড গ্লাভস ৩৫ হাজার টাকা এবং রক্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষুদ্রাকার একটি টিউবের দাম ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। সরকারি কেনাকাটায় পণ্যের এমন অস্বাভাবিক দর নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। কিছু ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাও চলছে।
সরকারি কেনাকাটায় পণ্য ও উপকরণের দরের ফারাক কমাতে চায় সরকার। উদ্দেশ্য, অনিয়ম ঠেকানো। এ জন্য সব সরকারি প্রকৌশল সংস্থার জন্য একটি অভিন্ন দরতালিকা (রেট শিডিউল) করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব সরকারি সংস্থার নিজস্ব দরতালিকা নেই, তাদেরও নতুন তালিকা অনুসরণ করে পণ্য ও উপকরণ কেনাকাটা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারি প্রকৌশল সংস্থাগুলোর জন্য একক দরতালিকা প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি। এতে একই ধরনের নির্মাণকাজে দপ্তরভেদে আলাদা দর নির্ধারণের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন কমিটির সদস্যরা।
একক দরতালিকা মানে দেশের সব এলাকায় একই দরে কাজ করতে হবে, এমন নয়। দেশের দুর্গম, পাহাড়ি, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যয় বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক (জোনাল) দর রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মূল দরকাঠামো এক হবে, তবে বিশেষ এলাকার অতিরিক্ত ব্যয় আলাদাভাবে বিবেচনায় আসতে পারে। যেসব সংস্থার একেবারে নিজস্ব কাজ থাকবে, সে জন্য আলাদা বিশেষ দরতালিকা নির্ধারণ করা থাকবে।
গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সরকারি নির্মাণকাজের দর তফসিল মূল্যায়ন করে পুনর্নির্ধারণ করতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে আহ্বায়ক করে ওই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, সব সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। কমিটি বেশ কয়েকটি সভা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারদর, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, ভ্যাট ও করহার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দরতালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা যেতে পারে। দরতালিকায় অন্তর্ভুক্ত সব নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিয়মিত সংগ্রহ করে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে।
প্রতিটি সংস্থার ব্যবহৃত পণ্য ও উপকরণসামগ্রীর একক মূল্য বিবিএসের ওয়েবসাইটে থাকবে। সংস্থা তাদের নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী ওই একক দর ব্যবহার করে তাদের প্রকল্পের প্রাক্কলন করবে।
কমিটির সদস্যসচিব পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কবির আহামদ বলেন, সরকারি কেনাকাটায় ইট, রড, সিমেন্ট বালুর মতো যেসব পণ্য ও উপকরণ সব প্রকৌশল সংস্থা সাধারণত ব্যবহার করে থাকে, সেগুলোর একক তালিকা থাকবে। আবার কিছু সংস্থার নিজস্ব কিছু কাজ থাকে, যেটা অন্য কারও থাকে না, তাদের জন্য আলাদা বিশেষ দরতালিকা নির্ধারণ করা থাকবে। তিনি বলেন, একক রেট শিডিউলের কাজ প্রায় শেষ। তারা শিগগিরই প্রতিবেদনটি একনেক সভায় তুলে ধরবেন।
একই পণ্যের ভিন্ন দর
রেট শিডিউল হলো সরকারি নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য উপকরণ, শ্রম ও কাজের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত দরতালিকা। বর্তমানে কয়েকটি সরকারি সংস্থার নিজস্ব দরতালিকা রয়েছে। যেমন গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। যদিও এক সংস্থার সঙ্গে আরেক সংস্থার দরতালিকার কোনো মিল বা সমন্বয় নেই। আবার সরকারের অনেক সংস্থার নিজস্ব কোনো দরতালিকা নেই। যেমন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, সেতু বিভাগ। কমিটি মনে করেছে, একটি অভিন্ন দরতালিকা থাকলে এ ধরনের বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রেট শিডিউলকে স্থির কোনো দরতালিকা হিসেবে না রেখে বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা।
কমিটি প্রতিবেদনে বলেছে, নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয়, কর, আয়কর এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনায় দর নির্ধারণ করা হবে।
কমিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্মাণ ব্যয়ের ওপর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়েছে। প্রতিবেদনে ২০২০ সালে প্রতি ডলারের গড় মূল্য ৮৪ টাকা থেকে ২০২৬ সালের চলতি সময়ে ১২২ টাকায় ওঠার হিসাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একইভাবে নির্মাণশ্রমিকদের মজুরি ও শ্রমের মূল্যও বেড়েছে বলে কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটি নির্মাণকাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর বাজার পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করেছে। পাথরের ক্ষেত্রে দেশে বার্ষিক চাহিদা, আমদানি, পরিবহন এবং বিভিন্ন উৎসের দামের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একইভাবে বালুর স্থানীয় বাজারদর, পরিবহন ব্যয় ও ব্যবসায়ীদের মুনাফা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিটুমিনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি মূল্য, শুল্ক, পরিবহন ব্যয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের মূল্য বিবেচনা করে দর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটি এমন একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরির সুপারিশ করেছে, যেখানে সব ব্যবহারকারী প্রবেশ করতে পারবে এবং সময়ের সঙ্গে দর পরিবর্তনের তথ্য হালনাগাদ করা যাবে।
‘সমস্যার শিকড়ে যেতে হবে’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো কোনো সংস্থা কখনো নিজেরা কমিটি গঠন করে বাজারমূল্য দেখে পণ্য ও উপকরণের দাম নির্ধারণ করে। আবার কখনো কখনো আগের বছরের পণ্যের দাম তুলনা করে মূল্যস্ফীতি দেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে থাকে। এ কারণে একেক সংস্থার পণ্যের দাম ভিন্ন ভিন্ন হচ্ছে। যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আইসিটি বিভাগের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের দাম নির্ধারণে কোনো দরতালিকা নেই।
তবে পণ্য কেনাকাটায় একক ও অভিন্ন দাম নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন না বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, সমস্যার শিকড়ে যেতে হবে। সরকারি নির্মাণকাজের অনিয়ম ঠেকাতে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও ক্রয় বিধি (পিপিআর) পুরোপুরি অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) মাধ্যমে পুরো কেনাকাটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। মূলত সেখানে সংস্কার আনতে হবে। তাহলে পণ্য কেনাকাটায় অনিয়ম কমবে।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
